পাকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামলেই যেন বদলে যান নাহিদ রানা। গতি, আগ্রাসন আর ভয়ংকর বাউন্সারে পাকিস্তানি ব্যাটারদের বারবার কাঁপিয়ে দিচ্ছেন বাংলাদেশের এই তরুণ পেসার। পরিসংখ্যানও বলছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত অন্য যেকোনো দলের চেয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষেই সবচেয়ে কার্যকর নাহিদ। মঙ্গলবার মিরপুর টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ১০৪ রানের ঐতিহাসিক জয়ের নায়ক ছিলেন এই ডানহাতি গতিতারকা। ২৬৮ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংসে গুটিয়ে যায় মাত্র ১৬৩ রানে। সেখানে ৪০ রানে ৫ উইকেট নিয়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ ধসিয়ে দেন নাহিদ। এটি তার টেস্ট ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ফাইফার এবং ক্যারিয়ারসেরা বোলিং।

তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে নাহিদের আধিপত্য শুধু টেস্টে নয়। ২০২৬ সালের মার্চে মিরপুরে ওয়ানডে সিরিজেও তিনি ছিলেন পাকিস্তানের আতঙ্ক। এক ম্যাচে নিজের প্রথম পাঁচ ওভারের মধ্যেই তুলে নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। তার আগুনঝরা স্পেলে পাকিস্তান অলআউট হয়েছিল মাত্র ১১৪ রানে। সেই ম্যাচে তার গতি প্রায় নিয়মিতই ১৫০ কিলোমিটারের বেশি ছিল, শর্ট বল ও বাউন্সারে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন পাকিস্তানি ব্যাটাররা। সেই ম্যাচের পর পাকিস্তানের কোচ মাইক হেসন বলেছিলেন, ‘নাহিদ রানাই ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিয়েছে।’ স্কোরকার্ডের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘নাহিদ রানা বোলিংয়ে আসার আগে আমরা মোটামুটি ভালো অবস্থায়ই ছিলাম। কিন্তু সে আসার পর থেকেই আমরা ক্রমে পিছিয়ে পড়েছি।’ সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দেয় তার ১৫২ কিলোমিটার গতির ডেলিভারি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনো বাংলাদেশি পেসারের করা এটিই দ্রুততম বল। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি পেস বোলিং নিয়ে যে সীমাবদ্ধতার কথা বলা হতো, নাহিদ যেন সেটিরই মোক্ষম জবাব।পাকিস্তানের বিপক্ষে তার পরিসংখ্যানও দাপটের সাক্ষ্য দেয়। টেস্ট ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত ১০ ম্যাচে নাহিদের উইকেট ২৭টি। এর মধ্যে পাকিস্তানের বিপক্ষেই ৩ ম্যাচে নিয়েছেন ১২ উইকেট। তার সামগ্রিক বোলিং গড় ৪১.৬৬ হলেও পাকিস্তানের বিপক্ষে তা নেমে এসেছে ৩১.৭৫-এ। টেস্টে তার দুইটি পাঁচ উইকেটের একটি এসেছে পাকিস্তানের বিপক্ষেই।

ওয়ানডেতে চিত্রটা আরও ভয়ংকর। ১১ ম্যাচে ২১ উইকেট নেয়া নাহিদের ক্যারিয়ারসেরা বোলিং ২৪ রানে ৫ উইকেট, সেটিও পাকিস্তানের বিপক্ষে। এই দলটির বিপক্ষে তার গড় মাত্র ১৮.১২, যা অন্য যেকোনো প্রতিপক্ষের চেয়ে ভালো। অর্থাৎ পাকিস্তানের বিপক্ষে নামলেই যেন আরও ধারালো হয়ে ওঠেন তিনি। শুধু জাতীয় দল নয়, পাকিস্তানের মাটিতেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন নাহিদ। ২০২৬ পিএসএলে পেশোয়ার জালমির হয়ে খেলতে গিয়ে গতির আগুনে কাঁপিয়েছেন বিশ্বের নামী ব্যাটারদের। এক ম্যাচে ৪ ওভারে মাত্র ৭ রান দিয়ে নিয়েছিলেন ৩ উইকেট। ফাইনালেও ২২ রানে ২ উইকেট নিয়ে দলের আস্থার প্রতিদান দেন। পুরো আসরে ৫ ম্যাচে তার শিকার ছিল ৯ উইকেট, গড় মাত্র ১০.৮৮। পাকিস্তানের সাবেক-বর্তমান অনেক ক্রিকেটারই নাহিদের বোলিংয়ের প্রশংসা করেছেন বা তার বোলিং ঘিরে আলাদা পরিকল্পনার কথা বলেছেন। মিরপুর টেস্টের আগেও সংবাদ সম্মেলনে এসে পাকিস্তানের টপ অর্ডার ব্যাটার ইমাম-উল-হক বলেছেন, আমরা জানতাম কী আসছে। আমরা এগুলো নিয়ে আলাপ করেছি। আমরা জানতাম নাহিদ এভাবেই বল করবে, মিটিংয়ে আমাদের এসব আলোচনা হয়েছে।' যদিও তাদের সেই পরিকল্পনা কাজে আসেনি। পিএসএলের সময় নাহিদের বোলিংয়ের উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন কিংবদন্তি পাকিস্তানি পেসার ওয়াসিম আকরাম। তার গতির পাশাপাশি বুদ্ধিরও প্রশংসা করেছেন তিনি।নাহিদ রানাকে নিয়ে পাকিস্তানের বোলার শাহিন আফ্রিদি বলেছিলেন, ‘আমি ওয়ানডে সিরিজের আগে শন টেইটের সাথে কথা বলেছিলাম। আমার মনে হয় নাহিদ রানা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য অনেক বড় সম্পদ হতে পারে। আশা করি বাংলাদেশ তাকে (নাহিদ রানা) ভালোভাবে কাজে লাগাবে।’

নাহিদের বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তার গতি। ১৪৫ থেকে ১৫২ কিলোমিটার গতিতে নিয়মিত বল করার পাশাপাশি শর্ট বল ব্যবহারে তিনি ইতোমধ্যেই আলাদা পরিচিতি পেয়েছেন। আধুনিক ক্রিকেটে যেখানে এক্সপ্রেস পেসারদের গুরুত্ব বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশের ক্রিকেটে নাহিদ রানাকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছেন সমর্থকেরা। পাকিস্তানের বিপক্ষে নিজেকে আরও একবার প্রমাণ করে সমর্থকদের আস্থার প্রতিদান দিলেন তিনি। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম পেসার হিসেবে টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে ৫ বার তার বেশি উইকেট নিলেন ডানহাতি পেসার নাহিদ রানা। এর আগে চতুর্থ ইনিংসে ফাইফার নেওয়া ৫জনই ছিলেন স্পিনার, তাইজুল ইসলাম, এনামুল হক জুনিয়র, মেহেদী হাসান মিরাজ, সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। সবচেয়ে বেশি ৪ বার চতুর্থ ইনিংসে ফাইফার নিয়েছেন মিরাজ।

তাইজুল ইসলাম ২০১৮ সালের ২২ নভেম্বর চট্টগ্রামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১১.২ ওভার বল করে ৩৩ রানে ৬ উইকেট নেন। একইভাবে ২০২৩ সালের ২৮ নভেম্বর সিলেটে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও তিনি ৩১.১ ওভারে ৭৫ রানে ৬ উইকেট শিকার করেন। এনামুল হক জুনিয়র ২০০৫ সালের ৬ জানুয়ারি চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২২.২ ওভারে মাত্র ৪৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন। অন্যদিকে মেহেদী হাসান মিরাজ ২০১৬ সালের ২৮ অক্টোবর মিরপুরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২১.৩ ওভারে ৭৭ রান খরচায় ৬ উইকেট তুলে নেন।

২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর মিরপুরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৮.১ ওভারে ৩৮ রানে ৫ উইকেট, ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২২.১ ওভারে ৫০ রানে ৫ উইকেট এবং ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর মিরপুরে ভারতের বিপক্ষে ১৯ ওভারে ৬৩ রানে ৫ উইকেট নেন তিনি। এছাড়া সাকিব আল হাসান ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর খুলনায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৮ ওভারে ৪৪ রানে ৫ উইকেট নেন। পরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও তিনি ২৮ ওভারে ৮৫ রান দিয়ে ৫ উইকেট শিকার করেছিলেন। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাইজুল ইসলাম ১৭ ওভারে ৫০ রানে ৫ উইকেট নেন। মাহমুদউল্লাহ ২০০৯ সালের ৯ জুলাই কিংস্টাউনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৫ ওভারে ৫১ রান দিয়ে ৫ উইকেট তুলে নিয়েছিলেন।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews