আন্তর্জাতিক নদীর পানিকে ভারত তার আধিপত্যবাদী পররাষ্ট্রনীতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। বর্তমান বিশ্বে পানি সংক্রান্ত যতগুলো আঞ্চলিক বিরোধ রয়েছে তার মধ্যে উপমহাদেশ সবচেয়ে জটিল ও গুরুতর অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। ভারতের পানি আগ্রাসন এ অঞ্চলে কোটি কোটি মানুষের জনপদকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিলেও ভারতের পানি আগ্রাসন সম্পর্কে কেউ তেমন কিছু বলছে না। বিশেষত: বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে চলা ৫৪টি অভিন্ন নদীর উপর বাঁধ দিয়ে ও পানি প্রত্যাহার করে বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে পানিশুন্য ও মরুভূমিতে পরিনত করার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে ভারত। গত কয়েক দশকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় এ নিয়ে অনেক কিছু প্রকাশিত হলেও বাংলাদেশ সরকারের নিস্ক্রিয়তা ছিল বিষ্ময়কর। অথচ পাকিস্তান আমলে প্রথম যখন পদ্মার উজানে ফারাক্কায় বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তখন তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ফারাক্কা চালুর প্রশ্নে তাদের আপত্তি জানিয়েছিল এবং ফারাক্কার বিকল্প পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছিল। ফারাক্কা প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পাকিস্তান সরকার হয়তো কখনোই একতরফাভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালু করতে দেবে না। ফারাক্কা প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় ক্ষেপণের এটিও একটি কারণ হতে পারে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোনো পানি চুক্তি ছাড়াই ফারাক্কা বাঁধ চালু করতে ভারতের কোনো প্রশ্ন বা শর্তের সম্মুখীন হতে হয়নি। ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে ৪০ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে চালুর কথা বলে ফারাক্কা চালু হলেও সেদিন থেকেই ভারত ইচ্ছামাফিক গঙ্গার পানির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রথম গ্যারান্টি ক্লজসহ গঙ্গার পানি চুক্তিতে উপনীত হতে ভারতকে বাধ্য করতে সক্ষম হলেও জিয়ার শাহাদাতের পর এরশাদ সে চুক্তি নবায়নের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এরপর খালেদা জিয়ার আমলে ভারতের অনীহা ও অসহযোগিতার কারণে গঙ্গার পানিচুক্তির নবায়ন সম্ভব হয়নি। তবে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর গ্যারান্টি কøজছাড়া নাম-কাওয়াস্তে করা একটি পানিচুক্তি করলেও চুক্তি অনুসারে কখনোই পানি পায়নি বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে পদ্মার অসংখ্য শাখানদী মরানদীতে পরিনত হয়েছে। পদ্মার বুকে অসংখ্য চর জেগে এর নাব্যতা ও পানি ধারণ ক্ষমতা অনেকটা কমে গেছে। এহেন বাস্তবতায় মাঝে মধ্যেই ফারাক্কা ব্যারেজের স্লুইস গেটগুলো খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে আকস্মিক বন্যাসহ ব্যাপক ফসলহানির দিকে ঠেলে দেয়। একেই বলে ওয়েপোনাইজেশন অব ওয়াটার। ভারত তা প্রতিবেশি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই পানি অস্ত্র ব্যবহার করে চলেছে। শেখ হাসিনাকে ভারতের ম্যানেজ করার কিছুই নেই। তিনি বাংলাদেশে আসার আগে দীর্ঘদিন ভারতের বিশেষ খেদমত ও প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেয়া শেখ হাসিনা নাকি ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা অজিত কুমার দোভালের তত্তাবধানে আছেন। জানা যায়, ১৯৮১ সালে দেশে আসার আগেও এই দোভালই শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধান করেছিলেন। শেখ হাসিনা বরাবরই ভারতের এজেন্ট এবং এ্যাসেট হিসেবে কাজ করেছেন, এখনো করছেন। শেখ মুজিবের আমলে কোনো পানি চুক্তি ছাড়াই ভারত যেভাবে ফারাক্কা ব্যারেজ চালু করেছিল, একইভাবে ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনার আমলে কোনো চুক্তি ছাড়া তিস্তা ব্যারাজ চালু করে দেয় ভারত। এর ফলে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের ১৯টি জেলার কোটি কোটি মানুষ মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীণ হয়।

উজানে বাঁধ দিয়ে, পানি প্রত্যাহার করে এবং বর্ষার সময় বাঁধের পানি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশকে শুকিয়ে ও ডুবিয়ে মারার সব রকম আয়োজনে ভারত ব্যস্ত থাকলেও ওরা আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। বিএসএফ’র গুলিতে সীমান্তের কাঁটাতারে কিশোরী ফেলানির লাশ ঝুলে থাকার পরও কোনো প্রতিবাদ-প্রতিকার না চেয়ে শেখ হাসিনার ১৬ বছর এমন একতরফা বন্ধুত্বের ডংকা বাজাতে দেখেছি। অভিন্ন বা আন্তর্জাতিক নদীর পানির অধিকারের প্রশ্নে দেশের সরকারের নিরবতার মত আত্মঘাতী পাপ আর হতে পারেনা। অভিন্ন নদীর পানিকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ধারাবাহিক তৎপরতাকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মূল ব্যারোমিটার হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ভারতের শর্তহীন বন্ধু শেখ পরিবার ও আওয়ামীলীগ আমলে বাংলাদেশকে তিনদিক থেকে শুকিয়ে মারার জন্য তিনটি প্রধান নদীর উপর অবৈধ বাঁধ নির্মাণের সময়কাল হিসেবে বেঁছে নেয় ভারত। শেখ মুজিবের আমলে ফারাক্কা, শেখ হাসিনার আমলে গজলডোবা এবং হাসিনার শেষ আমলে বরাক উপত্যকায় টিপাইমুখ বাঁধ নির্মানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উপর পানি আগ্রাসণের শোলকলা পূর্ণ করে ভারত। টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার কারণে শেখ হাসিনার নির্দেশে সিলেটের বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুম ও হত্যা করা হয় বলে এতদিন যে অভিযোগ করা হতো, এখন তা সত্য বলে প্রমানিত হচ্ছে। সম্প্রতি সাবেক প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা পরিদফতরের(ডিজিএফআই) মহাপরিচালক লে.জেনারেল(অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, টিপাইমুখ বাঁধ ও ভারতের সাথে ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্বের কারণেই বিএনটি নেতা ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়। শেখ হাসিনার নির্দেশেই ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয় বলে শেখ মামুন জানিয়েছেন। ভারতীয় আধিপত্য ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন নেতৃত্বের কারণে বেগম খালেদা জিয়াকে শেখ হাসিনার নির্মম নিপীড়নের শিকার হয়ে মত্যু বরণ করতে হয়েছে। বাংলাদেশের নন্দিত নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পিতা জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসুরি হিসেবে নতুন আঞ্চলিক ও বিশ্ববাস্তবতায় বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় অবস্থান নিশ্চিত করতে তার কাছে প্রত্যাশিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ভারতের পানি আগ্রাসনের বিপরীতে প্রায় সাত দশকের পরিকল্পিত মেগা প্রকল্প নিয়ে তিনি চীনের সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনার সোপানে হাজির হয়েছেন। এরশাদ ও হাসিনার শাসনে ধামাচাপা থাকা দেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা ও নদনদীর পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সম্ভাবনা নিশ্চিত করা সম্ভব। বিপুল ভোটে নিবার্চিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাসের মধ্যেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা, পদ্মা ব্যারেজ এবং চীন-পাকিস্তানের সাথে কৌশলগত প্রতিরক্ষা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তিনি প্রমান করেছেন তিনি ১৭ বছর পর দেশের মাটিতে পা রেখে যে ‘প্ল্যান’র কথা বলেছিলেন, চীনের সহযোগিতায় পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণেরর উদ্যোগ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়নে চীন-পাকিস্তানের সাথে কৌশল গত সম্পর্কোন্নয়নের যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, এ মুহূর্তে তা বাংলাদেশের জন্য এক অনিবার্য বাস্তবতা।

বাংলাদেশের সামরিক পরিকল্পনা সব সময়ই আত্মরক্ষামূলক। এমনকি নদীর পানি ব্যবস্থাপনার জন্য গৃহিত প্রকল্পগুলোও আত্মরক্ষামূলক। ভারতের আগ্রাসি পদক্ষেপই বাংলাদেশকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভারতের আগ্রাসী রাজনৈতিক-সামরিক প্রকল্প যেভাবে পাকিস্তানকে পারমানবিক শক্তিতে পরিনত হতে বাধ্য করেছে। বাংলাদেশ ভারতের অন্যতম বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও যেভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা, উস্কানি ও হুমকি দেয়া হচ্ছে, তাতে চীন-পাকিস্তানের সাথে সামরিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করা ছাড়া বাংলাদেশের হাতে কোনো বিকল্প নেই। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নিজস্ব নিরাপত্তা কৌশল ও সক্ষমতাকে পারমানবিক শক্তিধর ভারতের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। ভারতের বিশাল সাবমেরিন বহরের বিপরীতে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে দুটি মিং ক্লাস সাবমেরিন পাওয়ার পর ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল শত্রুর মত। ভারতের সাথে আমাদের অভিন্ন নৌ ও স্থল সীমান্ত রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে হাজার হাজার কিলোমিটার সমুদ্রসীমায় থাকা সমুদ্র সম্পদের পাহারা বা নজরদারির জন্য নৌবাহিনীর জাহাজের পাশাপাশি ডুবোজাহাজের বহর থাকাও জরুরি। শুভেন্দু-হিমন্তদের উস্কানি ও বাংলাদেশ দখলের হুমকি বাংলাদেশকে তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে বাধ্য করছে। এটা নিশ্চিত যে, ভারত বা যে কোনো আঞ্চলিক শক্তির উস্কানি কিংবা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীসহ ২০ কোটি মানুষ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। বিশ্বের এক নম্বর সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়েও মাত্র চারকোটি মুসলমানের দরিদ্র দেশ আফগানিস্তানকে ট্রিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেট খরচ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরেও পরাস্ত করতে পারেনি। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা রাতের অন্ধকারে সবকিছু ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর আগেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক বাহিনীও আফগানিস্তান থেকে পরাজিত হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। সেই পরাজয়ের কারণেই সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছিল। খৃষ্টীয় চর্তুদশ শতকে সোনার গাঁর শাসক ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ এবং শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের সাহসী অদম্য বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে ব্যর্থ হয়ে বাংলার স্বাধীনতা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল দিল্লির সালতানাত। গত বছর বিপুল গর্জনে অপারেশন সিঁদুর নাম দিয়ে পাকিস্তানে বিমান হামলা করতে গিয়ে ভারতীয় বিমান বাহিনীর গর্ব রাফাল বিমান ও এস ফোর হান্ড্রেড বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস ও চরমভাবে পরাজিত হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বিরতি করতে বাধ্য হয়েছিল নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার। সেই পরাজয়ের গ্লানি ভুলতে না পেরে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান উপেন্দ্র দ্বিবেদী সম্প্রতি তথাকথিত সন্ত্রাসবাদে মদত দেয়ার অভিযোগ তুলে পাকিস্তানকে ইতিহাসে পাঠিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের আন্ত:বাহিনী গণসংযোগ(আইএসপিআর) পরিদপ্তর ভারতের এসব বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং উসকানিমূলক বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল ইরানে আগ্রাসন চালিয়ে চরম মার খেয়ে সামরিক-অর্থনৈতিক আধিপত্য হারাতে বসেছে। ইসলামোফোবিক এজেন্ডায় একই পদাঙ্ক অনুসরণে পাকিস্তানে হামলা করে ভারতও তার আঞ্চলিক আধিপত্য হারাতে বসেছে।

পৃথিবীতে সর্বশক্তিমান আল্লাহর আধিপত্য ও সার্বভৌমত্ব বিরাজমান। সাময়িক জয়-রাজয়ের মধ্য দিয়ে ইতিহাস তার চুড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে যায়। মিথ্যাচারী, অহংকারি, অন্যায়কারী ও বৈষম্যসৃষ্টিকারীদের পতন অনিবার্য। পারমানবিক বোমা মেরে যুদ্ধ জয় করে বিশ্বে পরাশক্তি বনে যাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দুই মেয়াদে জাতিসংঘের ৩১টি সংস্থা এবং জাতিসংঘ বহির্ভুত অন্তত ৩৪টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। জেরুজালেমের উপর ইসরাইলের অন্যায় দাবি প্রত্যাখ্যান করায় ইউনেস্কোর মত সংস্থা থেকে ইসরাইল নিজের সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নেয়ার পর আমেরিকাও একই কাজ করেছিল। এভাবেই আধিপত্যবাদী শক্তি বিশ্ব থেকে ক্রমে বিচ্ছিন্ন ও ঘৃণিত হয়ে পড়ছে। এই মুহূর্তে ইসরাইল বিশ্বের সবচেয়ে ঘৃণিত রাষ্ট্র এবং এর শাসকরা সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। একইভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণিত ও প্রত্যাখ্যাত প্রেসিডেন্ট হিসেবে গণ্য হচ্ছেন। এই দুই পক্ষের প্রধান কৌশলগত মিত্র ইসরাইলিদের ফাদারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিকভাবে একই পরিনতির দিকে ধাবমান। কোনো দেশ সাম্প্রদায়িক এজেন্ডায় নিজের আভ্যন্তরীণ সংহতি নস্যাতের মত আত্মঘাতী তৎপরতার মধ্য দিয়ে নিজের অখন্ডতা টিকিয়ে রাখতে পারেনা। কাশ্মির, পাঞ্জাব, পশ্চিমবাংলা, মণিপুর ও আসামে যেভাবে বৈষম্য ও অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সাথে আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের পথ বেছে নেয়া হচ্ছে, হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে তার কোনো সমাধান নেই। ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার ও কূটনীতিক বীনা সিক্রি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ভারতের বর্তমান শাসকদলকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতকে বাস্তববাদী হতে পাকিস্তানের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আস্থায় দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থা(সার্ক) এগিয়ে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি পাকিস্তানকে সম্মান জানানোর কথা বললেও বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সমস্যা ও সম্পর্কের বিষয়ে কিছু বলেননি। এ থেকে বোঝা যায়, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভারসাম্যের জন্য বাংলাদেশের সামরিক-অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মেরুদন্ড সোজা রাখা জরুরি।

গত বছর (২০২৫) পাকিস্তানের সাথে অপারেশন সিঁদুরের সময় ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত সিন্ধুর পানি চুক্তি স্থগিত ঘোষণা করে ভারত। যদিও আন্তর্জাতিক নদী গঙ্গা-তিস্তার মত সিন্ধুর মূল প্রবাহের উপর ভারত কোনো বাঁধ নির্মাণ করেনি। তবে সিন্ধু অববাহিকায় সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাবের গতিপথে শত শত ড্যাম ও ফিডার ক্যানেলের মাধ্যমে সিন্ধু থেকে পানি প্রত্যাহার করে নেয় ভারত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের পানি প্রত্যাহার ও ফসলের মওসুমে আকষ্মিক পানি ছাড়ার কারণে পাকিস্তানে উত্তর ও মধ্যাঞ্চল বিশেষত পাঞ্জাবে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। পানি প্রত্যাহারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্যই ১৯৬০ সালে জওহেরলাল নেহেরু ও আইয়ুব খানের মধ্যে ইন্ডাসভ্যালি ওয়াটার ট্রিটি সম্পাদিত হয়। বিভিন্ন সময় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ হলেও এই চুক্তির উপর কোনো প্রভাব পড়েনি। এবার ভারত তা স্থগিত করার পর পাকিস্তান আন্তজার্তিক সালিশ আদালতের স্মরণাপন্ন হলে আদালত পাকিস্তানের পক্ষে রায় দেয়। গত ১৬ মে দেয়া রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ভারত রায় প্রত্যাখ্যান করে আদালতের এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। তবে বার বার ভারতের পানি আগ্রাসনের সম্মুখীন হয়ে প্রতিবছর লাখ লাখ টন কৃষি উৎপাদন ক্ষতি ও কোটি মানুষের দুর্ভোগ সত্ত্বেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ না হয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ভারতীয় টোপ গিলে ঘুমিয়ে ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভারত ত্রিপুরার ডম্বুর বাঁধের গেট খুলে দিয়ে তিন দশকের মধ্যে ফেনী, নোয়াখালি, লক্ষীপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, হবিগঞ্জসহ বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১টি জেলার মানুষ নজিরবিহীন বন্যার শিকার হয়। ভারতের ছেড়ে দেয়া পানিতে চলতি মওসুমে দেশের হাওরাঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর ধান তলিয়ে গেছে। ভারতের পানি আগ্রাসনে সৃষ্ট বন্যায় ফসল হারিয়ে প্রায় প্রতিবছর হাজার হাজার কৃষক নি:স্ব হয়ে যাচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে ভারতের পানি আগ্রাসনের মাত্রা বাড়তে থাকবে। আন্তর্জাতিক নদীর উপর ভারতের এমন ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন চলতে দেয়া যায় না। সিন্ধু, গঙ্গা, যমুনাসহ বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর বড় অংশের উৎস চীন এবং তিব্বতের পর্বত শৃঙ্গ ও মালভূমিতে। চীন যদি উজানে পানি প্রত্যাহার কনে নেয় তাহলে ভাটির দেশ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ চরম পানি সংকটের সম্মুখীন হবে। এ কারণেই ভারতীয় উপমহাদেশের পানি সংকট সমাধানে চীনের অংশগ্রহণে অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক নদী আইন মেনে অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় ভারতকে অবশ্যই ইতিবাচক মন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ভারত যদি সিন্ধু ও গঙ্গার ভাটিতে পাকিস্তান-বাংলাদেশের উপর পানি আগ্রসনের পথ বেছে নেয়, এরপর চীন যদি ইয়ারলং সাংবো প্রকল্প সম্প্রসারণ করে সিন্ধু-ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রত্যাহার করে নেয়, এর বিরুদ্ধে ভারতের কথা বলার কোনো মুখ থাকবে না। এখান থেকে পানি প্রত্যাহার করে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শুস্ক চরমভাবাপন্ন তাকলামাকান মরুভূমিতে সবুজায়নের পরিকল্পনা রয়েছে চীনের।

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews