বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে অতিরিক্ত ভিড় ও অনভিজ্ঞ আরোহীদের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এভারেস্টে রেকর্ডসংখ্যক আরোহনের মধ্যেই দুই ভারতীয় পর্বতারোহীর মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ শেরপারা সতর্ক করেছেন, নিয়ন্ত্রণহীন ভিড় ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
বিশ্বের সর্বোচ্চ ১০টি পর্বতের মধ্যে আটটির আবাসস্থল নেপাল। প্রতি বছর বসন্ত মৌসুমে দেশটিতে শত শত অভিযাত্রী ভিড় জমান এভারেস্ট জয়ের লক্ষ্যে। তবে চলতি মৌসুমে মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে। রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এভারেস্ট মৌসুমে অন্তত পাঁচজন আরোহীর মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন দুই ভারতীয় ও তিন নেপালি। এছাড়া চলতি মাসের শুরুতে মাকালু পর্বতে এক মার্কিন ও এক চেক পর্বতারোহীর মৃত্যু হয়।
অভিযান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পাইওনিয়ার অ্যাডভেঞ্চার্সের পরিচালক নিবেশ কার্কি জানান, সর্বশেষ নিহত দুই ভারতীয় হলেন সন্দীপ আরে ও অরুণ কুমার তিওয়ারি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সন্দীপ আরে ২০ মে এবং অরুণ কুমার তিওয়ারি ২১ মে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান। তবে নামার সময় উচ্চতাজনিত শারীরিক জটিলতায় তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত মারা যান।
কার্কি বলেন, “উচ্চতাজনিত অসুস্থতার কারণে তারা নামার পথে সমস্যায় পড়েন। এখন মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।”
এদিকে চলতি মাসেই এভারেস্টে রেকর্ড ৩২তম আরোহনের কৃতিত্ব গড়া নেপালি পর্বতারোহী কামি রিতা শেরপা শুক্রবার রাজধানী কাঠমান্ডুতে ফিরে এসে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
‘এভারেস্ট ম্যান’ নামে পরিচিত এই কিংবদন্তি শেরপা বলেন, এবারের অভিযান ছিল ‘অতিরিক্ত ভিড়ে ঠাসা’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ছবিতে দেখা গেছে, বরফাচ্ছন্ন ও অক্সিজেনস্বল্প উচ্চাঞ্চলে নির্দিষ্ট রশি ধরে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করছেন আরোহীরা।
তিনি বলেন, “সরকারের উচিত বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা। কেবল দক্ষ ও যোগ্য পর্বতারোহীদের অনুমতি দেওয়া উচিত। একটি সীমা থাকা প্রয়োজন।”
একদিনেই রেকর্ডসংখ্যক আরোহন
নেপালের পর্যটন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার দেশটির দিক থেকে একদিনে প্রাথমিকভাবে ২৭৫ জন আরোহী এভারেস্টের ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার উচ্চতার চূড়ায় পৌঁছেছেন। যাচাই শেষে এই সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
এভারেস্টে আরোহনের দুটি প্রধান পথ রয়েছে-নেপালের দক্ষিণ দিক এবং তিব্বতের উত্তর দিক। তবে চলতি বছর চীন তিব্বত অংশের পথ বন্ধ রাখায় প্রায় সব আরোহীকেই নেপালের দিক ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে দক্ষিণ দিকের রুটে চাপ আরও বেড়েছে।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী, একদিনে সবচেয়ে বেশি ৩৫৪ জন আরোহী এভারেস্ট জয় করেছিলেন ২০১৯ সালের মে মাসে।
নেপালের পর্যটন বিভাগ জানিয়েছে, আরোহনের চূড়ান্ত সংখ্যা নিশ্চিত করতে অভিযাত্রীদের ছবি, গাইড ও অভিযাত্রী প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই করা হবে।
ব্রিটিশ গাইডের নতুন মাইলফলক
শুক্রবার সফল আরোহীদের মধ্যে ছিলেন ব্রিটিশ পর্বতারোহী ও গাইড কেন্টন কুল। তিনি ২০তম বারের মতো এভারেস্ট জয় করে নতুন রেকর্ড গড়েছেন। নেপালি নন- এমন পর্বতারোহীদের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চসংখ্যক এভারেস্ট আরোহনের রেকর্ড।
অতিরিক্ত ভিড়ে বাড়ছে ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভারেস্টে অতিরিক্ত ভিড় আবারও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে আবহাওয়া খারাপ হলে বা আরোহনের সময়সীমা কমে গেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
চলতি মৌসুমে বিদেশিদের জন্য রেকর্ড ৪৯২টি এভারেস্ট পারমিট দিয়েছে নেপাল সরকার। এর ফলে পর্বতের পাদদেশে গড়ে উঠেছে বিশাল তাঁবুর নগরী, যেখানে অবস্থান করছেন আরোহী, গাইড ও সহায়ক কর্মীরা।
এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া চলতি বসন্তকালীন আরোহন মৌসুমে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রায় ৬০০ জন গাইডসহ- এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছেন। সূত্র: আল-জাজিরা
বিডি প্রতিদিন/একেএ