চুয়াল্লিশ বছরের নেহার বেগম। স্বামী মারা যাওয়ার পর ২০ বছর ধরে দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। দিনমজুরি করে সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের দিয়েছেন পড়ালেখার খরচ। চার মেয়ের মধ্যে তিনজনকে বিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে ছেলের লেখাপড়ার খরচ দিচ্ছেন। ছোট মেয়ে এইচএসসি পাস করেছে। কঠোর পরিশ্রমের পরও হাসিমুখে নিজেকে এই মা একজন অপরাজিতা হিসেবেই মনে করেন। নেহার বেগমের জীবনের গল্পটা ঠিক যেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহভরা কোলে তব-মাগো, বলো কবে শীতল হব কত দূর আর কত দূর বল মা’ বিখ্যাত গানটি যেন বলে দেয় নেহার বেগমের জীবনের গল্পটা।

প্রায় ৩০ বছর আগে উত্তরবঙ্গের নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায়ের খাটুরিয়া গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রহিম উদ্দিনের সঙ্গে বিয়ে হয় নেহার বেগমের। এরপর কোলে আসে আরও চার কন্যা সন্তান ও এক ছেলে সন্তান। ২০০৫ সালে স্বামী রহিম উদ্দিন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চার মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানকে নিয়ে শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। তিন বেলার খাবার জোগাড় করতে বেছে নেন দিনমজুরির কাজ। প্রায় ২০ বছর ধরে দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।

দিনমজুরি করে সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের দিয়েছেন পড়ালেখার খরচ। নিজেদের কোনো জমিজমা না থাকায় তাদেরকে দুই শতক জমি দান করেন রহিম উদ্দিনের ছোট ভাই জসিম উদ্দিন। সেই জমিতে একটি ঘর করে দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের ঘরে এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন নেহার বেগম। তার ছোট ছেলে নাহিদ ইসলাম ২০২৩ সালে খাটুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে সৈয়দপুর সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক ১ম বর্ষে পড়ছে আর মেয়ে রুনা আক্তার স্থানীয় একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর টাকার অভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারেনি।

সম্প্রতি নেহার বেগমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বর্তমানে সরকারের ইজিপিপি প্রকল্পের আওতায় ৪০ দিনের কর্মসূচিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, আমার স্বামী যখন মারা গেল তখন থেকে আমি মানুষের বাসায় কাজ করে সংসারের খরচ ও সন্তানদের লেখাপড়া চালাইছি। আমার আশা আছে যে, আল্লাহ আমাকে একটা ছেলে দিয়েছে তাকে যেন কোনো কষ্ট করতে না হয়। যতই কষ্ট হোক, কাজকর্ম করে ছেলেটাকে পড়ালেখা শেখাব। প্রধানমন্ত্রী আমাকে একটা ঘর দিয়েছেন, সেই ঘরে সন্তানদের নিয়ে আমি থাকি। এখন আমার মনে অনেক আশা। আমার জীবন যা কষ্ট গেছে, জীবন নষ্ট হইছে, কোনো কষ্ট যাতে আমার সন্তানের জীবনে না আসে। আশা করছি, আমার ছেলে লেখাপড়া করে একটা চাকরি পাবেই। নেহার বেগম বলেন, জায়গা-জমি আমার কিছুই নাই। দেবররা জমি দিয়ে সরকারের ঘরটা বসায় দিছে। সরকারের বিধবা কার্ডের টাকা পাই। ওই টাকাটাও সন্তানদেরকেই দেই। কাপড়চোপড় লাগলেও ওটা করি। আর না নিলে বাচ্চাটাকে দেই। আমার কষ্ট হোক, তবু ছেলেটা লেখাপড়া শিখুক।

নেহার বেগমের মেয়ে রুনা আক্তার বলেন, আমার মায়ের দিকে তাকালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গাওয়া ‘পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব-মাগো, বলো কবে শীতল হব, কত দূর আর কত দূর বলো মা’ গানটি কানে বাজে। মা আমাকে কষ্ট করে লেখাপড়া করাইছে। আমার ভাইও লেখাপড়া করতেছে। আমি টাকার জন্য দুই বছর ধরে ডিগ্রিতে ভর্তি হতে পারিনি। আমরা পাঁচ ভাইবোন তার মধ্যে তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। আমার মা আমাকে কষ্ট করে এইচএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করাইছে। সরকারের কাছে আবেদন করছি, আমার ভাইকে তারা যেন সহযোগিতা করে। তাকে যেন মানুষের মতো মানুষ করতে পারে আমার মা। সে যদি লেখাপড়া করে একটা চাকরি করতে পারে, তাহলে আমার মায়ের কষ্টটা সার্থক হবে।

খাটুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোফাজ্জল হোসেন শাহ বলেন, গত বছর আমাদের বিদ্যালয় থেকে ২৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার মধ্যে নাহিদ একজন। সে হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান, সে সৈয়দপুর সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করছে। তার মা লেখাপড়া জানে না, কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি অনেক শ্রদ্ধাশীল। সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করবে- এই আশা নিয়ে সন্তানের জন্য কষ্ট করে যাচ্ছেন।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews