বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের উপস্থিতি শুধু সাহিত্যে সীমাবদ্ধ নয়; তারা একটি সময়ের মানসিকতা, বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠেন। কবি আল মাহমুদ তেমনি একজন কবি। তার কবিতা যেমন ভাষা ও মাটির ঘ্রাণে ভরপুর, তেমনি তার ব্যক্তিত্বেও ছিল একধরনের গভীর বিশ্বাস ও মানবিকতার দীপ্তি।

১৯৮০ সালের একটি স্মৃতি আজও আমার মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নবাগত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবি আল মাহমুদকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানের জন্য আমি তার মানপত্রের খসড়া লিখেছিলাম। তখনকার ছাত্রজীবনের উত্তেজনা, সাহিত্যিক আবেগ এবং একজন প্রিয় কবিকে স্বাগত জানানোর আনন্দ— সব মিলিয়ে ঘটনাটি আমার কাছে এক বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়ে আছে।

ঘটনাটি আজও মনে পড়ে। আমি এক সহপাঠীকে বলেছিলাম, ‘কবি আল মাহমুদ আসছেন’। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কবি আল মাহমুদ কে?’ প্রশ্নটি শুনে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। কারণ, সে সাহিত্যের ছাত্র। আমাদের শিক্ষক হারুন-অর-রশিদ সাহেব ‘The Three poets’ নামে একটি গ্রন্থে কবি শাহেদ কাজী, কবি শামসুর রাহমান ও কবি রফিক আজাদের কবিতা অনুবাদ করেছিলেন— যার পাঠক ছিল আমার সেই সহপাঠী। অথচ আল মাহমুদের নাম সে সত্যিই শোনেনি। আমি তখন তাকে বলেছিলাম, ‘আল মাহমুদকে চিন না? তিনি আমাদের সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি।’

অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিতে আমরা ব্যস্ত ছিলাম। আমার সহযোদ্ধা এস এম আমিন উল্লাহ— যিনি কক্সবাজারের রামুর বাসিন্দা, মাইকে কবি আল মাহমুদের আগমনের সংবাদ প্রচার করছিলেন। তিনি পরবর্তীকালে ইসলামী ব্যাংকে চাকরি করেন এবং ২০০৬ সালে ইন্তেকাল করেন। আমরা চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরা এলাকার একটি প্রেস থেকে কবির মানপত্র ছাপিয়েছিলাম। সেই প্রেসে রাত জেগে কাজ করতে হয়েছিল। তখন আমি চট্টগ্রাম কলেজের হোস্টেলে থাকতাম। প্রেসের ম্যানেজারের বাড়ি ছিল ফেনীতে। ছাত্রজীবনের সেই পরিশ্রম আজও মনে হলে মনে হয়— সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসাই আমাদের এতটা উদ্দীপ্ত করেছিল।

কবি আল মাহমুদ যখন অনুষ্ঠানে এলেন, পুরো ক্যাম্পাসে এক ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। তখন তিনি যুবসমাজের কাছে সত্যিই এক আকর্ষণীয় নাম। লাইব্রেরি মাঠে অনুষ্ঠান হয়েছিল। ইংরেজি বিভাগের নিচে ছিল সেই মাঠ। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ও ছাত্ররাও তাদের বিভাগ থেকে কবির বক্তৃতা শুনেছিলেন।

আমি যখন মানপত্র পাঠ করছিলাম, তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে তা শুনেছিলেন। পরে তিনি আমার নোটবুকে নিজের হাতে একটি বাক্য লিখে দিয়েছিলেন— মানুষকে ভালোবাসার কথা। তার হাতের লেখা ছিল ছোট ছোট অক্ষরে, কিন্তু অত্যন্ত সুন্দর। আজও সেই নোটবুক আমার কাছে আছে; সেই কয়েকটি শব্দ যেন আজও কবির মানবিকতার স্মারক হয়ে আছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলে তিনি তখন কিছু সময় অবস্থানও করেছিলেন। তার কাজে সহায়তা করেছিলেন চাকসুর এজিএস মহিউদ্দিন ফারুক, যিনি পরে কুমিল্লার একটি কলেজের প্রিন্সিপাল হন।

আল মাহমুদের নাম আমি প্রথম শুনেছিলাম আরো আগে, যখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি। তখন চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত শিশু-কিশোর মাসিক পত্রিকা ‘টাপুর টুপুর’ পড়তাম। সেই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ মোহাম্মদ শফি। পত্রিকাটি ফিরিঙ্গি বাজারের আর্ট প্রেস থেকে বের হতো। সেই সময় সেখানে আল মাহমুদের কবিতা ছাপা হতো। তখন আমার মনে হয়েছিল— তিনি হয়তো আমাদের বয়সী একজন লেখক। পরে বুঝলাম, তিনি তখনই প্রতিষ্ঠিত এক কবি।

আল মাহমুদের জীবন ছিল সাহিত্য ও সাংবাদিকতার সাথে গভীরভাবে জড়িত। ১৯৩৬ সালে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। স্টেশনের কাছেই ছিল তাদের বাড়ি। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন গন্ধ বণিক। এই পরিচয়কে ঘিরেই তিনি লিখেছিলেন বিখ্যাত গল্প গ্রন্থ ‘গন্ধ বণিক’। তার নানাবাড়ি ছিল নবীনগর থানার বীরগাঁও গ্রামে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তখন তিনি দশম শ্রেণীর ছাত্র। ভাষা আন্দোলনের সেই অভিজ্ঞতা তিনি তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’তে লিখেছেন।

পরবর্তীকালে তিনি সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। রঙিন একটি টিনের স্যুটকেস নিয়ে তিনি ঢাকায় এসে দৈনিক ইত্তেফাকের মফস্বল বিভাগে যোগ দেন। ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক মিয়া তার চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন। ইত্তেফাক বন্ধ হয়ে গেলে ১৯৬৬ সালে তিনি চট্টগ্রামে চলে যান এবং আর্ট প্রেসে কাজ শুরু করেন। সেখান থেকে প্রকাশিত হতো মাসিক টাপুর টুপুর।

ইত্তেফাক পুনরায় প্রকাশিত হলে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। ইত্তেফাক থেকে পরে দৈনিক গণকণ্ঠে সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক পদ থেকে অবসর নেয়ার পর চট্টগ্রামের দৈনিক কর্ণফুলীর সম্পাদক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। পাশাপাশি দৈনিক সংগ্রামে নিয়মিত কলাম লিখতেন।

কাব্যজগতে তার অবদান বিশাল। তার কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে কালের কলস, সোনালী কাবিন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি লিখেছেন ‘মায়াবী পর্দা দুলে উঠ’ নামে কবিতা, যা ঢাকা ডাইজেস্টে প্রকাশিত হয়েছিল। নতুন ঢাকা ডাইজেস্টে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হয় তার আলোচিত উপন্যাস ‘উপমহাদেশ’। পাক্ষিক পালাবদলে তিনি ধারাবাহিকভাবে লিখেছেন ‘নাবিলের বোন’ এবং ‘যে পারো ভুলিয়ে দাও’ নামে উপন্যাস।

ঢাকায় দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার অফিসে বিকেলে প্রায়ই তার আড্ডা বসত। একদিন কবি হাসান হাফিজ আমাকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন, যা আমি আল মাহমুদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলাম। এ ধরনের ছোট ছোট স্মৃতি আজও মনে করিয়ে দেয়— তিনি শুধু একজন বড় কবি ছিলেন না, ছিলেন সহজ-সরল এক মানুষ।

কবি আল মাহমুদ একবার পটুয়াখালী-২ আসনের এমপি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের গ্রামের বাড়িতেও গিয়েছিলেন। তার স্মৃতিকথায় সেই ঘটনার উল্লেখ আছে।

বাংলাদেশের কবিতায় আল মাহমুদ এক অনন্য স্বর। তার কবিতায় গ্রামীণ জীবনের গন্ধ, নদী-মাটি-মানুষের ভাষা এবং গভীর আধ্যাত্মিকতার ছাপ একসাথে মিলেমিশে আছে। তিনি শুধু শব্দের কারিগর ছিলেন না; ছিলেন বিশ্বাসের কবি।

আজ যখন তার কথা স্মরণ করি, তখন মনে হয়— একজন কবির আসল শক্তি শুধু তার কবিতায় নয়, তার জীবনেও। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, নিজের বিশ্বাসের প্রতি আস্থা এবং ভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা— এই তিনটি গুণ আল মাহমুদকে আমাদের সাহিত্য ভুবনে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

বাংলা কবিতার ইতিহাসে তাই আল মাহমুদ শুধু একজন কবির নাম নয়; তিনি একটি সময়ের প্রতীক, একটি বিশ্বাসের আলো। তার কবিতা যতদিন বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে, ততদিন আমাদের সাহিত্য-আকাশে দীপশিখার মতো জ্বলতে থাকবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews