বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হলো বহু প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দু’একটি ছোটখাটো অপ্রীতিকর ঘটনা বাদ দিলে নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিবন্ধকতাহীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরে সাধারণ ভোটারগণ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। প্রতিটি নির্বাচন কেন্দ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। ফলে বাইরে থেকে কেউ এসে নির্বাচন কেন্দ্র গন্ডগোল সৃষ্টি করতে পারেনি। প্রাপ্ত সর্বশেষ চূড়ান্ত বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল (বিএনপি)এককভাবে ২০৯টি এবং জোটগতভাবে ২১২টি আসনে জয়লাভ করে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। প্রধান প্রতিদ্বন্দি জামায়াত জোট ৭৭টি আসনে জয়ী হয়েছে। ৮টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ নির্বাচন স্বচ্ছ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হিসেবে পরিগণিত হবে। ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ৫০টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীসহ মোট ২ হাজার ২৮জন প্রার্থী অংশ গ্রহণ করেন। ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩জন ভোটারের মধ্যে ৬০ দশমিক ৬৮ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এবার সংসদীয় নির্বাচনের গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামীতে দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্যই মূলত গণভোটের আয়োজন করা হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে সমর্থন পাওয়া গেছে ৬৮ দশমিক ০৫ শতাংশ আর ‘না’ এর পক্ষে মতামত দিয়েছে ৩১ দশমিক ৯৫ শতাংশ।

জামায়াত জোট মোট ৭৭টি আসনে জয়লাভ করে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় আসন অলঙ্কৃত করতে চলেছে। দেশব্যাপী জামায়াত রাজনৈতিক দল হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এটা কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। নির্বাচনের প্রাক্কালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়েছে। একে সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত হয়েছে। জামায়াত নির্বাচন উপলক্ষে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা বাস্তবায়নযোগ্য এবং বাস্তবধর্মী। এর বিপরীতে অন্যান্য রাজনৈতিক যেসব অঙ্গীকার করেছে তার অধিকাংশই বাস্তবের সঙ্গে কোন মিল নেই। কোন কোন অঙ্গীকার শুনতে ভালো লাগলেও তা কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভভ হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিজয়ী দল বিএনপি তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে বলেছে,তারা নির্বাচিত হতে পারলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গ্রস ডেমিস্টক প্রোডাক্ট (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের উন্নীত করা হবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে বিকাশমান একটি দেশ। এক সময় বাংলাদেশকে এশিয়ান রাইজিং টাইগার বলা হতো। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে, নানা ধরনের বিভ্রান্তিমূলক তথ্য-উপাত্ত যোগান দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জনকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছিল। বাংলাদেশের জিডিপি’র আকার যদি আগামী ৮ বছরের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা যায় তাহলে সেটা এক বিরাট সাফল্য হিসেবে পরিগণিত হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাস্তবেই কি এটা করা সম্ভব?

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক(এডিবি) তাদের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্জিত অর্থনৈতিক সাফল্যের চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে ২০২৪ সালকে ভিত্তি বছর হিসেবে ধরে জানিয়েছে, বাংলাদেশ হচ্ছে এশিয়ার নবম বৃহত্তম অর্থনীতি। আর দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ হচ্ছে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি। জিডিপি’র আকারের বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে ভারতের পরেই। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের জিডিপি’র আয়তন ছিল ৪৫০ দশমিক ০৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর ভারতের জিডিপি’র আকার হচ্ছে ৩ দশমিক ৯১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ যদি ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপি অর্জন করতে চায় তাহলে বর্ণিত সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ২০৩৪ সাল নাগাদ জিডিপি’র আকার ৫৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাড়াতে হবে। ২০২৪ সালে চীনের জিডিপি’র আকার ছিল ১৮ দশমিক ৯৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার জিডিপি’র আকার ছিল ১দশমিক ৮৭ টিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে রয়েছে তাতে এ সাফল্য অর্জন করা খুবই কঠিন হবে।

অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির যে আকার এবং শক্তি তাতে উন্নয়নের গতিধারা বেগবান করা এবং টেকসইভাবে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করতে হবে। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মাত্রায় বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। কারণ বিনিয়োগের উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। যেমন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি গতিশীল হয়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উপর নির্ভর করে একটি দেশ দারিদ্র্য বিমোচনের কতটা সাফল্য অর্জন করবে। এমনকি রপ্তানি বৃদ্ধির জন্যও ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য ব্যক্তি খাতে কি পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন তা নিয়ে ভিন্ন মত থাকতে পারে। তবে সাধারণভাবে অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশ যদি কাক্সিক্ষত মাত্রায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে চায় তাহলে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগের হার জিডিপি’র অন্তত ৪০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। কিন্তু অনেক দিন ধরেই ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ মন্থর হয়ে আছে। জিডিপি’র পরিমাণ বাড়ছে। কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার বাড়ছে না। প্রায় দু’দশক ধরে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ জিডিপি’র ২২/২৩ শতাংশে উঠা নামা করছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বিজিপি’র ২৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানকালে বাংলাদেশের জিডিপি’তে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার ছিল সাড়ে ৯ শতাংশ। পরবর্তী বছর তা সোয়া ১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। ২০১৯ সালে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার ছিল সোয়া ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশের ইতিহাস এটাই ব্যক্তি খাতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ।

ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের সমস্যার প্রসঙ্গ এলেই আমরা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কথা বলে থাকি। কিন্তু বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক সমস্যা সঙ্কুল দেশেও তো বিনিয়োগ হচ্ছে। তাহালে আমাদের দেশে কেন বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মাত্রায় হচ্ছে ন্? বাংলাদেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব। এমন কোন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ না করা হলে সেবা পাওয়া যায়। বাংলাদেশে শিল্প-কারখানা স্থাপন করেছেন অথচ কোন পর্যায়েই ঘুস প্রদান করেননি এমন নজীর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ আয়তনের দিক থেকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি দেশ। কিন্তু এখানে বাস করে ১৮ কোটি মানুষ। আমাদের দেশে শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য উপযোগি স্থান খুঁজে পাওয়া মুস্কিল। বেশ কয়েক বছর আগে জাপানের দু’জন উদ্যোক্তা বাংলাদেশে শিল্প স্থাপনের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন কিন্তু নানাভাবে চেষ্টা করেও তারা শিল্প স্থাপনের মতো উপযোগি কোন স্থান নির্বাচন করতে পারেননি। ফলে তারা দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হন। তিন পার্বত্য জেলা হতে পারে বাংলাদেশে শিল্প স্থাপনের চমৎকার একটি স্থান। মোট ১৩ হাজার ১৯১ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত তিন পার্বত্য জেলা বাংলাদেশের মোট আয়তনের ১১দশমিক ১৯ শতাংশ দখল করে আছে। পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘ মেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এখানে বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব। বিগত সরকারগুলোর আমলে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে পার্বত্য জেলাসমূহের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু তা সফল হয়নি। যারা পার্বত্য জনপদের ইতিহাস জানেন তারা মনে করেন সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে পার্বত্য জেলাগুলোর সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান এবং কৌশলগত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সামরিক শক্তি দিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে না।

এজন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। তিন পার্বত্য জেলাকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে এখানে ব্যাপক মাত্রায় শিল্প-কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। পার্বত্য জেলগুলোর মূল সমস্যা হচ্ছে এখানকার কিশোরদের চোখে কোন স্বপ্ন নেই। তারা জানেনা শিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে তারা কী করবে? তারা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সব সময়ই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। পার্বত্য জেলাগুলোকে যদি ব্যাপক ভিত্তিক শিল্পায়নের আওতায় আনা যায় তাহলে এই অঞ্চলের কিশোররা স্বপ্ন দেখার সুযোগ পাবে। আজকে যারা সন্ত্রাসের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছে তারা কর্মসংস্থানের সুযোগ পারে। যারা শিল্প-কারখানায় চাকরি করবে তারা নিজেদের স্বার্থেই শিল্প-কারখানা রক্ষার ব্যবস্থা নেবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর পরিমাণ খাস জমি রয়েছে যা নানাভাবে দখল হয়ে গেছে। এসব জমি উদ্ধার করে তা শিল্পায়নের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের উন্নীত করার যে পরিকল্পনা করেছে তা অত্যন্ত কঠিন হলেও বাস্তবায়ন অযোগ্য নয়। চেষ্টা করলে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব। এজন্য দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সাথে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সহনশীলতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। পতিত সরকার আমলে যেভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করা হয়েছে তার কোন পুনরাবৃত্তি করা চলবে না। বর্তমানে দেশ এক নতুন যুগে পদার্পন করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার আলোকে দেশকে পরিচালিত করতে হবে। আগামীতে কোন ব্যক্তি বা মহল যাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠন করতে না পারে তা সম্মিলিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে। দেশে স্থানীয় এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য কার্যকর এবং অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। কাক্সিক্ষত মাত্রায় বিনিয়োগ আকর্ষণ ব্যতীত স্থিতিশীল এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়।

লেখক : সাবেক ব্যাংকার।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews