খরার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জমিনে এক ফোঁটাও বৃষ্টি পড়েনি। আবহাওয়া বিভাগের হিসাবে গত প্রায় তিন মাস শতভাগ অনাবৃষ্টিতে পার হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়া হিসাবে ইতোমধ্যে ফল-ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। খালবিল শুকিয়ে গেছে। নদনদীতে পানি কমে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। কোথাও কোথাও নলকূপে পানি উঠছে না। এহেন পরিস্থিতি আমাদের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের বার্তা দিচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এখন ধানের বড় মৌসুম ইরি-বোরোর শুরুর সময়। এ সময় যদি দেশ অনাবৃষ্টির শিকার হয়, তবে ইরি-বোরোর আবাদ ব্যাহত হতে বাধ্য, যা খাদ্য-উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে অবধারিতভাবে। অনাবৃষ্টির পাশাপাশি গরম বা উত্তাপও ক্রমাগত বাড়ছে। ভারতের আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমের প্রথম ভাগে (মার্চ থেকে মে) খরতপ্ত আবহাওয়া বিরাজ করবে। উত্তর-পূর্ব ভারতে অর্থাৎ বাংলাদেশ সংলাগ্ন এলাকায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের বেশি থাকবে। তার মানে, বাংলাদেশেও একই অবস্থা বিরাজ করবে। ওদিকে ভারত ও প্রশস্ত মহাসাগরীর অঞ্চল ও আশপাশের ‘লা নিনা’ দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ফলে বৃষ্টিপাতে অসঙ্গতি, অনাবৃষ্টি ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির আবহ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সংলগ্ন ভারতীয় এলাকায় তাপমাত্রা এখন স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। বাংলাদেশের আবহাওয়া বিভাগের মতে, চলতি মার্চে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকলেও দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু ও মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। আবহাওয়া বিভাগের ত্রৈমাসিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এপ্রিল-মে মাসে বঙ্গোপসাগরে ২/৩টি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এতে বৃষ্টি হতে পারে। তবে ঘূর্ণিঝড়ের আশংকাও বিদ্যমান। আমাদের দেশকে ষড়ঋতুর দেশ বলা হলেও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ষড়ঋতুর মধ্যে যে বৈচিত্র্য, বৈশিষ্ট্য ও পার্থক্য, তা আর থাকছে না। বর্ষার সময় বৃষ্টি না হয়ে খরা হওয়া, শীতের সময় শীত কমে যাওয়া, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস হওয়া, ঘন ঘন ভূমিকম্প হওয়া ইত্যাদি তার প্রমাণ বহন করে। মনে রাখা দরকার, ষড়ঋতুর ধারা-বৈশিষ্ট্য অনুসারেই আমাদের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এই ধারা-বৈশিষ্ট্যের যদি ব্যত্যায় বা লংঘন ঘটে, তবে উৎপাদন ব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দেয়া স্বাভাবিক।
অনাবৃষ্টি বা খরার পদধ্বনিতে আমরা একটি আশংকিত বিপর্যয়ের অভিমুখে দাঁড়িয়ে আছি। এখন সময়টাও খুব অনুকূল নয়। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বের জ্বালানি ও খাদ্যপরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি অবনত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যেই বিশ্বের প্রায় সর্বত্র জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বলা হচ্ছে, জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলারে গিয়ে দাঁড়াতে পারে। তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদি ছাড়া উৎপাদন, পরিবহন, উন্নয়ন, জীবনযাত্রাÑ কোনো কিছুই স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না। জ্বালানির দাম বাড়লে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র ও পর্যায়ে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে। উল্লেখ অনাবশ্যক, জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা প্রায় শতভাগ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তেল তো বটেই, গ্যাসও এখন আমাদের আমদানি করতে হচ্ছে। দেশীয় উৎস থেকে কিছু গ্যাস পাওয়া যায় বটে, তবে তাও ক্রমহ্রাস পাচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসাবে তেল ও গ্যাসের ব্যবহার আমাদের দেশেও আছে। তেল ও গ্যাসনির্ভর বেশ কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশে রয়েছে। জ্বালানির সংকট হলে এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র আর উৎপাদনে থাকতে পারবে না। তখন বিদ্যুৎ সংকটও প্রকট হয়ে দেখা দেবে। ইউরিয়া কারখানার একমাত্র কাঁচামাল গ্যাস। গ্যাসের সংকট হলে সার কারখানাও আর সচল থাকবে না। এর মধ্যেই গ্যাসসংকটে কৃষির অপরিহার্য উপকরণ সারের কারখানা বন্ধ করে দেয়ার চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, জ্বালানি নিরাপত্তা সব দেশে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেলেও আমাদের দেশের বিগত সরকারগুলো এদিকে নজর দেয়নি। স্বৈরাচারের সাড়ে ১৫ বছরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত লুটপাটের মৃগয়া ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। দায়-দেনা ও লোকসানে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত প্রায় ধ্বাংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার স্বাভাবিক ও সঙ্গতকারণেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের প্রতি নজর দেবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারও এক্ষেত্রে চরম অবহেলা প্রদর্শন করেছে। নিরাপত্তামূলক জ্বালানি সংগ্রহ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকার কিছুই করেনি। এক খবরে জানা গেছে, বর্তমানে এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম জ্বালানি মজুত আছে বাংলাদেশে। আল্লাহ না করুক, দেশ যদি দীর্ঘমেয়াদে অনাবৃষ্টি ও খরার কবলে পড়ে এবং ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় তবে আমাদের কৃষি উৎপাদন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ইরি-বোরোর আবাদ ধানের সবচেয়ে বড় আবাদ। খরার মোকাবিলায় যদি এ আবাদ নিরাপদ রাখতে হয়, তাহলে পর্যাপ্ত সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। সেচ নিশ্চিত করতে হলে সেচযন্ত্র চালানোর জন্য তেল ও বিদ্যুতের প্রয়োজনীয় সংস্থান করতে হবে। বাস্তবতা হলো, জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ নেই, বিদ্যুতের প্রাপ্তিও যথেষ্ট নয়। এর ফলাফল ইরি-বোরোর উৎপাদনে মার খাওয়া, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
বাস্তবতার এই প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সরকারকে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। যথোপযুক্ত পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিতে হবে। জ্বালানিব্যবস্থাপনা বলতে যা বুঝায়, তার কিছুই দেশে নেই। থাকলে কদিনে জ্বালানি নিয়ে যে তুলকালাম কা- হচ্ছে, তা হতে পারতো না। সরকারিভাবে বলা হচ্ছে তেল-গ্যাসের যথেষ্ট মজুত আছে। অথচ, পেনিক বায়িং ভয়াবহ আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন সরকারের জরুরি কর্তব্য হলো, যে কোনো উপায়ে বা মূল্যে তেল-গ্যাসের সংগ্রহ বাড়ানো, যাতে অন্তত আগামী ৬ মাস অভাব না হয়। কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হবে। রাখতে হলে তেল-গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করতে হবে। খাদ্যপণ্য সংস্থানের জন্য কৃষি উৎপাদন যেমন সচল রাখতে হবে, তেমনি শিল্প-উৎপাদন ও রফতানি বহাল রাখতে হবে। রেমিট্যান্স এবং কৃষি-শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর দেশের সার্বিক অর্থনীতি দ-ায়মান। অর্থনীতির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে এ মুহূর্তে যা আশু করণীয়, সরকারকে তা করতে হবে। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, জ্বালানি, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ, দফতর-অধিদফতরের মিলিত একটি কার্যপরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।