দেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এমন সময় এসেছে, যখন দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিÑ দুই ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন চলমান। গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের জন্য এটি শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং একটি নতুন অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা, দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান করাই এই বাজেটের মূল উদ্দেশ্য।

কিন্তু বাজেট ঘোষণার কয়েক মাস পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, অর্থনীতি কি সত্যিই ঘুরে দাঁড়ানোর পথে, নাকি সাময়িক কিছু ইতিবাচক লক্ষণের আড়ালে পুরনো সমস্যাগুলোই নতুনভাবে ফিরে আসছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বিকাশ হার, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, রাজস্ব, ব্যাংকিং খাত, বৈদেশিক লেনদেন এবং কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্র একসাথে দেখতে হবে।

মূল্যস্ফীতি : কমছে, কিন্তু ঝুঁকি কাটেনি
গত দুই বছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সঙ্কট ছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্কোচনমূলক মুদ্রানীতি, নীতি সুদের হার বৃদ্ধি এবং সরকারের ব্যয়সঙ্কোচনের ফলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। তবে এটিকে এখনই স্থায়ী সাফল্য বলা যাবে না।

কারণ চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এখনো রয়ে গেছে। ফলে বাজারে দামের ওপর চাপ পুরোপুরি কমেনি। এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।

প্রথমত, রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের প্রভাব পুরোপুরি কমেনি। আগে যাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল, তাদের জায়গায় অন্যরা এসেছে, কিন্তু ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। ফলে কৃষকের বিক্রয়মূল্য ও ভোক্তার ক্রয়মূল্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত, সরকার অনেক পণ্যে শুল্ক কমালেও সেই সুবিধা সবসময় ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। কারণ বাজার তদারকির ক্ষেত্রে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, জেলা প্রশাসন এবং অন্যান্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এখনো দুর্বল।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বা লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। তখন আমদানি করা পণ্যের দাম আবারও বাড়তে পারে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ : গতি ফিরছে না
একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল উচ্চ প্রবৃদ্ধি। কিন্তু এখন তা অনেকটাই মন্থর। এর মূল কারণ ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রাক্কলন বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে দেশের অর্থনীতির গতি ধীরে ধীরে কমেছে। প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৯৬ শতাংশ। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কমে ৩.০৩ শতাংশে এবং তৃতীয় প্রান্তিকে আরো কমে ২.২২ শতাংশে নেমে এসেছে।

খাতভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়, কৃষি খাত মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও শিল্প খাতে বড় ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে উৎপাদনশীল শিল্প (ম্যানুফ্যাকচারিং), খনি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস খাতের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। ফলে সামগ্রিক শিল্প খাত তৃতীয় প্রান্তিকে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে চলে গেছে। অন্য দিকে সেবা খাত এখনো ইতিবাচক থাকলেও আগের তুলনায় এর প্রবৃদ্ধিও কমেছে।

সবমিলিয়ে বলা যায়, চলতি অর্থবছরের শুরুতে অর্থনীতি কিছুটা ভালো অবস্থায় থাকলেও সময়ের সাথে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। বিশেষ করে শিল্প খাতের দুর্বল পারফরম্যান্সই সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

এ দিকে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এর পেছনে বড় কারণ উচ্চ সুদের হার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ঋণের সুদের হার বাজারভিত্তিক হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তা ১২ থেকে ১৪ শতাংশ বা তারও বেশি। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন বা ব্যবসা সম্প্রসারণের খরচ অনেক বেড়েছে।

এর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এখনো অনিশ্চিত। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হতে পারছে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্তও পিছিয়ে যাচ্ছে।

আরেকটি বড় কারণ, নীতিগত অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর করনীতি, আইন এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে কী পরিবর্তন আসবে, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মনোভাব কাজ করছে।

বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও শুধু উন্নত অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীরা এখন বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

রাজস্ব : সবচেয়ে বড় দুর্বলতা
এই বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আহরণ। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সর্বনিম্ন। ফলে বাজেটে যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন সহজ হবে না। এর কারণও দীর্ঘদিনের। করদাতার সংখ্যা এখনো সীমিত। ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকির সংস্কৃতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। দেশের করদাতাদের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় থাকায় তাদের কাছ থেকে কর আদায় সম্ভব হচ্ছে না। একই সাথে সম্পদভিত্তিক কর চালুর মতো রাজনৈতিকভাবে কঠিন সিদ্ধান্তও এখনো নেয়া হয়নি। যদি সরকার প্রত্যাশিত রাজস্ব সংগ্রহ করতে না পারে, তাহলে দু’টি পথ খোলা থাকবে।

একটি হলো ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়া। এতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমবে এবং বিনিয়োগ আরো বাধাগ্রস্ত হবে। অন্যটি হলো উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে দেয়া। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর পড়বে।

ব্যাংকিং খাত : সংস্কার এখনো অসম্পূর্ণ
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখনো ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার ব্যাংকিং খাত সংস্কারের কথা বলেছে, কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি এখনো সীমিত।

বহু বছর ধরে ঋণ পুনঃতফসিল ও ঋণ অবলোপনের মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল করা হয়েছে। এই সংস্কৃতি ভাঙতে হলে স্বাধীন ও শক্তিশালী ব্যাংকিং কমিশনের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো, স্বার্থের সঙ্ঘাত দূর করা এবং বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। তা না হলে আমানতকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরবে না এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থের প্রবাহও স্বাভাবিক হবে না।

বৈদেশিক খাত ও কর্মসংস্থান
সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে। তৈরী পোশাক রফতানিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে আবার শক্ত অবস্থান ফিরে পাচ্ছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। তবে সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

প্রথমত, অতীতে নেয়া বড় বড় বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় এখন শুরু হচ্ছে। এতে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। দ্বিতীয়ত, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপসহ বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে যাবে। এতে বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা কিংবা বিশ্ববাণিজ্যে নতুন ধরনের সুরক্ষাবাদী নীতি চালু হলে বাংলাদেশের রফতানি ও আমদানিÑ দুই ক্ষেত্রেই নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। কিন্তু বর্তমান বাজেটের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো কর্মসংস্থান ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব।

প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু শিল্প ও সেবা খাতে তাদের জন্য পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক চাকরি তৈরি হচ্ছে না। তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতে কিছু উদ্যোগ থাকলেও তা মোট বেকার জনগোষ্ঠীর তুলনায় খুবই সীমিত। শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্য খাতে আরো বেশি বিনিয়োগ না করলে দেশের জনমিতিক সুবিধা ভবিষ্যতে বড় বোঝায় পরিণত হতে পারে।

আগামী এক বছরের তিনটি সম্ভাবনা
আগামী এক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি তিনটি সম্ভাব্য পথে এগোতে পারে।

প্রথম সম্ভাবনা হলো টেকসই পুনরুদ্ধার। যদি রাজস্ব সংস্কার কার্যকর হয়, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সরকার আর্থিক ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখতে পারে, তাহলে মূল্যস্ফীতি আরো কমবে, রিজার্ভ শক্তিশালী হবে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হবে।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো নিম্ন প্রবৃদ্ধির ফাঁদ। সংস্কারের গতি ধীর হলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে না। ফলে অর্থনীতি কম প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ বেকারত্বের চক্রে আটকে যেতে পারে।

তৃতীয় সম্ভাবনা সবচেয়ে উদ্বেগজনক। যদি আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন জ্বালানি সঙ্কট দেখা দেয় এবং একই সাথে রাজস্ব আহরণ ব্যর্থ হয়, তাহলে সরকারকে অতিরিক্ত ঋণ বা নতুন অর্থ সৃষ্টির পথ বেছে নিতে হতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি আবারো দ্রুত বাড়তে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নতুন সঙ্কটে পড়তে পারে।

অঙ্ক নয়, মূল প্রশ্ন সংস্কার
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। এটি একটি নীতিগত রূপরেখা, যার সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অর্থনীতিকে স্থায়ীভাবে শক্তিশালী করতে হলে কর প্রশাসন আধুনিক করতে হবে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং মানবসম্পদ ও কর্মসংস্থানে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। আজ বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ধরনের ভঙ্গুর স্থিতিশীলতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। আগামী বারো মাসই বলে দেবে, দেশ কি সত্যিই টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে এগোবে, নাকি পুরনো কাঠামোগত দুর্বলতার চক্রে আবারো আটকে যাবে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews