নির্বাচন এলেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ— ‘অর্থনীতি’। দ্রব্যমূল্য কমানো, চাকরি বাড়ানো, দুর্নীতি দমন, ব্যাংক সংস্কার, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার, এমন নানা প্রতিশ্রুতিতে ভরে ওঠে দলগুলোর ইশতেহার। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীও এর ব্যতিক্রম নয়। তারা অর্থনীতিকে তুলে ধরছে ‘পুনরুদ্ধার’, ‘ন্যায্যতা’ ও ‘মানবিক রাষ্ট্র’র ভাষায়। কিন্তু অর্থনীতি কেবল স্লোগানে চলে না; চলে সংখ্যার কঠিন হিসাব, কাঠামোগত সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতায়। তাই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মাঝখানের দূরত্বটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

প্রথমেই বিএনপির প্রতিশ্রুতির দিকে তাকাই। দলটি বলছে, ক্ষমতায় এলে নিত্যপণ্যের দাম কমাবে, বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙবে, আমদানি শুল্ক কমাবে এবং দ্রুত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনবে। এই প্রতিশ্রুতি নিঃসন্দেহে জনমুখী। কারণ গত কয়েক বছরে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট— দ্রব্যমূল্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো— বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির বড় অংশ আমদানিনির্ভর। জ্বালানি, ভোজ্যতেল, ডাল, গম— সবই বৈশ্বিক বাজারের দামের সাথে যুক্ত। ডলার সঙ্কট, রিজার্ভের চাপ, আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচ— এসবের ওপর সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সীমিত। ফলে প্রশাসনিক অভিযান বা সিন্ডিকেটবিরোধী বক্তব্য দিয়ে কিছু সময়ের জন্য দাম ঠেকানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে বশ মানানো কঠিন। অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে শক্তিশালী।

চাকরির প্রতিশ্রুতি বিএনপির আরেকটি বড় অঙ্গীকার। বছরে ১০ থেকে ১৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলা হচ্ছে। সংখ্যাটি শুনতে আকর্ষণীয়; কিন্তু হিসাব করলে দেখা যায়— এত কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে বড় আকারের শিল্পায়ন, বিপুল বিনিয়োগ ও রফতানি সম্প্রসারণ দরকার। বাংলাদেশে বর্তমানে যে পরিমাণ বেসরকারি বিনিয়োগ হচ্ছে, তা দিয়ে এই লক্ষ্য অর্জন প্রায় অসম্ভব। বিদেশী বিনিয়োগ আনতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, দ্রুত বিচারব্যবস্থা, নীতির ধারাবাহিকতা— এই তিনটি শর্ত অপরিহার্য। অথচ দেশের রাজনীতি যদি অবরোধ, সঙ্ঘাত ও অনিশ্চয়তায় আটকে থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে চাইবে না। তাই শুধু ‘চাকরি দেবো’ বললেই চাকরি আসে না; আসে বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করতে পারলে।

ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও বিএনপির অ্যাজেন্ডায় আছে। খেলাপি ঋণ কমানো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, আর্থিক সুশাসন— এসব কথা অর্থনীতিবিদরা বহুদিন ধরে বলে আসছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো— ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতার বড় কারণ রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতি। দলীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা গোষ্ঠীগুলো যদি ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়, তাহলে আইন প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ব্যাংক সংস্কার আসলে রাজনৈতিক সংস্কারের সাথে জড়িত। সদিচ্ছা থাকলেও ক্ষমতার রাজনীতির হিসাব বদলানো ছাড়া এটি বাস্তবায়ন করা সহজ নয়।

রাজনৈতিক আনুকূল্য নিয়ে যারা বিগত দেড় দশকের বেশি সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে ব্যাংকের মালিকানা দখল করে নামে-বেনামে ফান্ড হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করেছে, তারা প্রায় সবাই বিএনপির সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের কাছ থেকে পাচার করা অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টায় বাধা তৈরি করেছে বিএনপির প্রভাবশালী নেতারা। প্রায় চার লাখ কোটি টাকা ব্যাংক তহবিল হাতিয়ে নেয়ার জন্য অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপের পক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে তদবির এসেছে এই দলের পক্ষ থেকে। এস আলম মাসুদ তার ঘনিষ্ঠ জনদের বলেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরপরই তিনি দেশে ফিরবেন এবং ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবেন। বাস্তবে তার দাবি সঠিক কি-না সেটি বলা মুশকিল। তবে নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থীর আর্থিক দায়িত্ব তিনি নিয়েছেন এমন প্রমাণাদি পাওয়া যায়। এটি যদি বাস্তবতা হয় তাহলে কোনোভাবেই ব্যাংকে সুশাসন আনার শর্তের সাথে তা মেলে না।

এবার জামায়াতে ইসলামীর প্রসঙ্গ। জামায়াতের অর্থনৈতিক দর্শন তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। তারা বলছে— সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংকিং জোরদার করা হবে, জাকাত ও ওয়াক্ফভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা গড়ে তোলা হবে, নৈতিক বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ ধারণাগুলোর মধ্যে একটি নৈতিক আবেদন আছে, দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায্য অর্থনীতির বক্তব্য আছে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো— একটি আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পুরোপুরি সুদমুক্ত ব্যাংকিং স্বল্প মেয়াদে কতটা সম্ভব? দখল হওয়ার আগ পর্যন্ত জামায়াতের নেতারা ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা করে একটি মডেল তৈরির চেষ্টা করে বেশ খানিকটা সফল হয়েছেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদের আনুকূল্যপ্রাপ্ত এই ব্যাংক থেকে লক্ষাধিক কোটি টাকা বের করে নিয়েছে। সেই অর্থ কিভাবে ব্যাংকে ফেরাবে? এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক ঋণ, বন্ড মার্কেট— সবই সুদভিত্তিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। হঠাৎ করে পুরো অর্থনীতিকে ভিন্ন পথে নিলে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংযোগে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। তাই ইসলামী ব্যাংকিংকে বিকল্প বা সমান্তরাল ব্যবস্থা হিসেবে রাখা সম্ভব হলেও পুরো অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করানো কঠিন।

জামায়াত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর জোর দিচ্ছে। এটি ইতিবাচক দিক। কারণ বাংলাদেশের বড় জনগোষ্ঠী এখনো গ্রামভিত্তিক। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) কর্মসংস্থানের বড় উৎস হতে পারে। কিন্তু শুধু ক্ষুদ্র উদ্যোগ দিয়ে একটি দেশের জিডিপি দ্রুত বাড়ানো যায় না। বড় শিল্প, রফতানি খাত, প্রযুক্তি বিনিয়োগ— এসব ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। ফলে জামায়াতের পরিকল্পনা অর্থনীতির সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে; কিন্তু একে শিল্পায়নের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না।

দুই দলের প্রতিশ্রুতির মধ্যে একটি মিল আছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। কিন্তু বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, দুর্নীতি কেবল নৈতিক সমস্যাই নয়; এটি কাঠামোগত সমস্যা। প্রশাসন, ব্যাংক, রাজনীতি ও ব্যবসার মধ্যে যে অদৃশ্য যোগসাজশ তৈরি হয়েছে, তা ভাঙা অত্যন্ত কঠিন। এ ধরনের যোগসাজশ নির্বাচনের আগেই কোনো কোনো দলের সাথে লক্ষণীয়ভাবে দৃশ্যমান। তাই দুর্নীতি দমন কমিশন শক্তিশালী করা বা অভিযান চালানোর কথা বলা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা। এই জায়গায় কোনো দলই স্পষ্ট রোডম্যাপ দিচ্ছে না।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এ সময়ের বড় একটি সমস্যা হলো রাজস্ব আহরণে স্থবিরতা। এই স্থবিরতা একদিকে উন্নয়নকে বিদেশী সহায়তা নির্ভর করে তুলছে অন্যদিকে অগ্রগতির মাত্রাকে রাশ টেনে ধরছে। বিএনপির এক্ষেত্রে বাস্তবমুখী কোনো পদক্ষেপ নেই। জামায়াত দুর্নীতি দূর এবং ভ্যাট আয়করের হার নিম্নমুখী ও স্বয়ংক্রিয় করার মধ্য দিয়ে রাজস্ব ফাঁকি রোধ ও রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। এই পদক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে শুরু করে মধ্যমেয়াদে বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে হার নিম্নমুখী করার সাথে সাথে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বাস্তবমুখী আরো কিছু সুস্পষ্ট ব্যবস্থা দরকার হবে।

আসলে বিএনপি ও জামায়াত— দুই দলই জনপ্রিয় প্রতিশ্রুতি বেশি দিচ্ছে, কঠিন সিদ্ধান্তের কথা কম বলছে। মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে ভর্তুকি কমানো বা কর বাড়ানোর মতো অজনপ্রিয় পদক্ষেপও নিতে হতে পারে। শুধু বিদ্যুৎ খাতে আওয়ামী আমলে বেহিসাবি লুটপাটের মতো ব্যবস্থার কারণে এক বছরের ব্যবধানে ভর্তুকি পাঁচ হাজার কোটি টাকা থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এর অনেক চুক্তির মেয়াদ ২০-২৫ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত। সরকার চাইলেই এসব রাতারাতি বাতিল করতে পারবে না চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে। আর অযৌক্তিক ভর্তুকি কমানো ছাড়া যৌক্তিক ক্ষেত্রে ভর্তুকির জন্য অর্থের সংস্থান করা কঠিন।

আর্থিক খাতের অবস্থা এ সময়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক ঠিক করতে হলে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিনিয়োগ আনতে হলে রাজনৈতিক সঙ্ঘাত কমাতে হবে। কিন্তু এসব কঠিন কথার বদলে ইশতেহারে থাকে সহজ সমাধানের আশ্বাস। ফলে ইচ্ছা বড়, বাস্তবতা সীমিত। ব্যাংক খাত সংস্কারের কথাও বিএনপি বলছে। খেলাপি ঋণ কমানো ও আর্থিক সুশাসন নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু ইতিহাস বলে, ব্যাংকিং সঙ্কটের বড় কারণ রাজনৈতিক প্রভাব। দলীয় ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত না নিলে এই সংস্কার কার্যকর হবে না। তাই এই প্রতিশ্রুতিও রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরীক্ষায় টিকে থাকতে হবে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী অর্থনীতিকে দেখছে নৈতিকতা ও কল্যাণের কাঠামোয়। সুদমুক্ত ব্যাংকিং, জাকাত-ওয়াক্ফভিত্তিক নিরাপত্তা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর জোর— এসব তাদের প্রধান অঙ্গীকার। এতে সামাজিক ন্যায়বোধের আবেদন আছে। তবে আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পুরোপুরি সুদমুক্ত ব্যাংকিং বাস্তবসম্মত নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ঋণব্যবস্থা সুদভিত্তিক হওয়ায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়বে। তাই ইসলামী ব্যাংকিং বিকল্প হিসেবে থাকতে পারে; কিন্তু মূল কাঠামো হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

জামায়াতের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর জোর ইতিবাচক। তবে শুধু ক্ষুদ্র খাত দিয়ে বড় কর্মসংস্থান বা উচ্চ প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। বড় শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের সমান্তরাল উন্নয়ন দরকার। অর্থাৎ তাদের দর্শন সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে; কিন্তু শিল্পায়নের বিকল্প নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে যে বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো— কার্ডভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি : ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, এসব কর্মসূচি অর্থনৈতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে। ফ্যামিলি কার্ড মূলত নিম্ন আয়ের পরিবারকে ভর্তুকিমূল্যে নিত্যপণ্য দেয়ার একটি ব্যবস্থা। এর উদ্দেশ্য ভালো— দ্রব্যমূল্যের চাপ থেকে গরিব পরিবারকে রক্ষা করা। স্বল্প আয়ের মানুষকে টার্গেটেড সহায়তা দেয়া অর্থনীতির দিক থেকেও যৌক্তিক, কারণ এটি সর্বজনীন ভর্তুকির চেয়ে কম ব্যয়বহুল। কিন্তু বাস্তব চ্যালেঞ্জ হলো— তালিকা প্রণয়ন, রাজনৈতিক প্রভাব, কার্ড বণ্টনে অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগী। সঠিক টার্গেটিং না হলে প্রকৃত দরিদ্র বাদ পড়ে, আর সুবিধা পায় প্রভাবশালী গোষ্ঠী। ফলে কল্যাণমূলক কর্মসূচি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার যন্ত্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিএনপি বা জামায়াত— যে দলই এই কর্মসূচি চালু বা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিক, তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ডিজিটাল ডাটাবেস ও স্বচ্ছ যাচাই-ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

কৃষক কার্ড, কৃষি খাতে ভর্তুকি, ঋণ ও প্রণোদনা সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছানোর একটি উদ্যোগ। মধ্যস্বত্বভোগী কমানো এবং প্রকৃত কৃষকের কাছে সহায়তা পৌঁছানো— এই লক্ষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃষিই এখনো গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি। কিন্তু কৃষক কার্ড কার্যকর করতে হলে জমির মালিকানা, প্রকৃত চাষির পরিচয় ও তথ্যভিত্তিক নিবন্ধন দরকার। অনেক ক্ষেত্রে বর্গাচাষি বা ভাগচাষিরা বাদ পড়ে যায়। আবার কৃষিঋণ বিতরণেও ব্যাংকিং জটিলতা থাকে। ফলে শুধু কার্ড দিলে হবে না; দরকার কৃষি বিপণন, সংরক্ষণ ও মূল্য নিশ্চয়তার সমন্বিত নীতি। না হলে কৃষক কার্ড কাগুজে সুবিধায় সীমাবদ্ধ থাকবে।

সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড— বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী সহায়তা, দরিদ্র ভর্তুকি— এসব সুবিধা একত্রে ব্যবস্থাপনার ধারণা। এটি আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের দিকে একটি পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বাজেট। সামাজিক নিরাপত্তা বিস্তৃত করতে গেলে সরকারি ব্যয় বাড়বে। অর্থের উৎস কোথায়? কর আদায় বাড়ানো, অপচয় কমানো ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া টেকসই অর্থায়ন সম্ভব নয়। শুধু নতুন কার্ড চালু করলে জনপ্রিয়তা বাড়তে পারে; কিন্তু অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বাস্তবে এই তিন ধরনের কার্ডই রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি কৌশল— ‘টার্গেটেড ওয়েলফেয়ার’। এতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সরাসরি সহায়তা পায়, যা তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেয়। কিন্তু এটি দারিদ্র্যের স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধান আসে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়লে। অর্থাৎ, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রবৃদ্ধি— দুটোর ভারসাম্যই দরকার। জামায়াত কল্যাণমূলক সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়েছে। কিভাবে এই কর্মসংস্থান করবে তার একটি রূপরেখাও দিয়েছে। বিএনপির কর্মসংস্থান পরিকল্পনার চেয়ে জামায়াতের পরিকল্পনা অধিকতর বাস্তবমুখী। তবে এতেও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। সুশাসন এক্ষেত্রে একটি শর্ত পূরণ করবে, একই সাথে বৈদেশিক সম্পর্কেও কৌশলও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিএনপি ও জামায়াতের সামনে বড় পরীক্ষা হবে তারা কি শুধু জনপ্রিয় ভর্তুকি ও কার্ডের রাজনীতি করবে, নাকি কাঠামোগত সংস্কার করবে? ব্যাংক খাত ঠিক করবে? বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়বে? প্রশাসনে জবাবদিহিতা আনবে? কারণ উৎপাদন না বাড়িয়ে শুধু ভর্তুকি বাড়ালে বাজেট ঘাটতি বাড়ে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, আর শেষ পর্যন্ত সেই চাপ আবার সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে। অর্থনীতির বাস্তব পাঠ হলো— ফ্যামিলি কার্ড মানুষকে বাঁচায়, কৃষক কার্ড কৃষিকে টিকিয়ে রাখে, সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড দুর্বলদের সুরক্ষা দেয়; কিন্তু চাকরি ও শিল্পায়নই অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়। এই চারটি স্তম্ভের সমন্বয় ছাড়া কোনো দলই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবে না।

নির্বাচনী রাজনীতির আবেগের বাইরে গিয়ে তাই আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত— কে বেশি কার্ড দেবে, তা নয়; কে বেশি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়বে। কারণ শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন কাগজের ইশতেহারে নয়, মানুষের আয়ে ও জীবনে দৃশ্যমান হতে হয়। প্রতিশ্রুতি নয়, ফলাফলই হবে আসল বিচার।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন যে বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো আছে— ডলার সঙ্কট, ঋণের চাপ, রফতানির একমুখিতা, ব্যাংক দুর্বলতা, বেকার তরুণ— এসবের সমাধান কোনো একক উদ্যোগ বা আদর্শ দিয়ে সম্ভব নয়। বাজারমুখী প্রবৃদ্ধি দরকার, আবার সামাজিক সুরক্ষাও দরকার। শিল্পায়ন দরকার, আবার গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নও জরুরি। অর্থাৎ একটি মিশ্র মডেলই বাস্তবসম্মত পথ। বিএনপির বিনিয়োগকেন্দ্রিক পরিকল্পনা এবং জামায়াতের সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি— দুটোর ইতিবাচক দিক মিলিয়ে নিলে হয়তো কার্যকর সমাধান আসতে পারে।

শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি কোনো দলীয় স্লোগানের বিষয় নয়; এটি আস্থার বিষয়। বিনিয়োগকারী আস্থা, নাগরিক আস্থা, নীতির ধারাবাহিকতা— এই তিনটি ছাড়া উন্নয়ন হয় না। তাই যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করা। কারণ স্থিতিশীলতা ছাড়া বিনিয়োগ আসে না, বিনিয়োগ ছাড়া চাকরি হয় না, আর চাকরি ছাড়া অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি কাগজেই থেকে যায়।

নির্বাচনী মঞ্চে প্রতিশ্রুতি শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু ভোটার হিসেবে আমাদেরও উচিত প্রশ্ন করা দরকার— এই প্রতিশ্রুতির হিসাব কী? এর অর্থ কোথা থেকে আসবে? বাস্তবায়নের সময়সীমা কত? জবাবদিহিতা কিভাবে নিশ্চিত হবে? এই প্রশ্নগুলো যত জোরালো হবে, ততই রাজনীতি বাস্তবতার দিকে ফিরবে। অর্থনীতির ভাষায় বললে, উন্নয়ন মানে শুধু স্বপ্ন নয়; শৃঙ্খলা, পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতা। বিএনপি বা জামায়াত— যে দলই হোক, তাদের সাফল্য নির্ভর করবে কত বড় প্রতিশ্রুতি দিলো তার ওপর নয়; বরং কত কঠিন সংস্কার বাস্তবে করতে পারল তার ওপর। কারণ শেষ পর্যন্ত ভোটার স্বপ্ন নয়, ফলাফল দেখে বিচার করে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক নয়া দিগন্ত

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews