কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করতে ইরান ও ওমানের মধ্যকার চলমান আলোচনায় ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে কাতার। গতকাল দোহায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ড. মাজেদ আল-আনসারি এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে যুদ্ধপরবর্তী ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত তেহরান ও ওয়াশিংটনের পাল্টাপাল্টি দাবির কারণে পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা বিলম্বিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কাতারি মুখপাত্র জানান, ‘গত কয়েকদিনে উভয় দেশের (মাস্কাট ও তেহরান) পক্ষ থেকেই আমরা ইতিবাচক বক্তব্য শুনেছি। বিষয়টিকে কাতার অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে নজর রাখছে।’ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওমান ও ইরান ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের প্রস্তাবিত নতুন রুটের ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক (কোঅর্ডিনেট) চূড়ান্ত করার কারিগরি ধাপে পৌঁছেছে। প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থা অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলো ইরানের জলসীমা সংলগ্ন উত্তর রুট এবং উপসাগর থেকে বেরিয়ে যাওয়া জাহাজগুলো ওমানের জলসীমা সংলগ্ন দক্ষিণ রুট ব্যবহার করবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে চুক্তি বাস্তবায়ন এখন ‘খুবই কাছাকাছি’। তবে পুরো প্রণালীটি সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক হুমকি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে তেহরান। উল্লেখ্য, যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই খনিজ তেল ও গ্যাস সরবরাহ পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। যুদ্ধপূর্ব সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১৩০ থেকে ১৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ এই প্রণালী অতিক্রম করলেও বর্তমানে তা অতি নগণ্য পর্যায়ে নেমে এসেছে।
এদিকে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘœ করার বিষয়ে সমঝোতা হলে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপ করা অবরোধ তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নিরাপদ ও নির্বিঘœ পথ চালুর বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে চলছে। এ বিষয়ে সমঝোতা চূড়ান্ত হয়ে তা কার্যকর হলে ইরানের বন্দর অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সূত্র। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ পুরোপুরি ইরানের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করবে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নির্বিঘœ রাখতে ইরানকে যে প্রতিশ্রুতি দেবে, তা বাস্তবায়ন করছে কি না, সেটিও যুক্তরাষ্ট্র পর্যবেক্ষণ করবে।
সেনাবাহিনীতে বড় রদবদল আনলেন খামেনি : যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল এনেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), সশস্ত্র বাহিনী ও বাসিজ রেসিস্ট্যান্স ফোর্সের শীর্ষ কমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে সোমবার একাধিক আদেশ জারি করেন তিনি। উপসাগরীয় সংবাদমাধ্যম ‘গালফ নিউজ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় নিহত হওয়ার পর মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর সামরিক বাহিনীতে এটাই তার প্রথম বড় রদবদল।
গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদায়নগুলো হলো: আলি আব্দুল্লাহি: সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ। কিয়উমার্স হায়দারি: সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ। আহমদ ওয়াহিদি: মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতিসহ আইআরজিসির (ওজএঈ) প্রধান কমান্ডার। মোস্তফা ইজাদি: আইআরজিসির ডেপুটি প্রধান কমান্ডার। আলি আজমাই: আইআরজিসির নৌবাহিনীর প্রধান। হোসেইন তায়েব: বাসিজ রেসিস্ট্যান্স ফোর্সের প্রধান। এর আগে, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে (এসএনএসসি) মোহসেন রেজাইকে তার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত মার্চে সাবেক প্রতিনিধি আলী লারিজানি মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় নিহত হওয়ার পর পদটি খালি ছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যায়নি। গুঞ্জন রয়েছে, যে হামলায় তার বাবা নিহত হয়েছিলেন, সেখানে তিনিও আহত হন। তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই এই বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এলো। তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ নেতা সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং তাদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
পালটা ক্ষতিপূরণ দাবি ট্রাম্পের : ইরানের সঙ্গে আলোচনায় সেনা নিহতের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চাইবেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে তেহরান যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করার পর পালটা এ দাবি করেন ট্রাম্প। সোমবার (১১ আগস্ট) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, গত পাঁচ মাসের সামরিক সংঘাতে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য দেশটির পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হচ্ছে। আমিও ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করছি।’ ট্রাম্প জানান, শুধু বর্তমান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য নয়, ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর গত দুই দশকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলায় নিহত মার্কিন সেনাদের জন্যও ক্ষতিপূরণ চান তিনি। ট্রাম্পের পোস্টে ইউএসএস কোল যুদ্ধজাহাজে ২০০০ সালের হামলার কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ওই হামলার জন্য ইরান নয়, আল-কায়েদাকে দায়ী করেছে। এ ছাড়া, চলতি বছরের শুরুতে বিক্ষোভ দমনের সময় নিহত ইরানি নাগরিকদের পরিবারকেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ট্রাম্প। তেহরানে বিক্ষোভ দমনের ঘটনাকে তিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় তেহরান : সউদী আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়ে উদ্বিগ্ন নয় ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেছেন, চুক্তিটি ইরানকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে বলে মনে করার কোনো কারণ তারা দেখছেন না। গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) পবিত্র নগরী মক্কায় সউদী আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির বিষয়ে সোমবার (১০ আগস্ট) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র। ইসমাইল বাঘেই বলেন, চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আঞ্চলিক দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা বিষয়ে নতুন ধরনের আঞ্চলিক কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার মতে, এর মাধ্যমে বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতার পরিবর্তে নিজেদের সক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভর করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভিত্তিতে তৈরি এমন যেকোনো পরিকল্পনা, যেখানে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে এবং সম্ভাব্য হুমকিগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হবে, তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারে সহায়ক হতে পারে।
ইরাকে ‘কোমলা পার্টি’র সদর দপ্তরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে বিরোধী দল ‘কোমলা পার্টি’র সদর দপ্তর লক্ষ্য করে আবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। গতকাল বিকেলে উত্তর এরবিলের দুলি আলান এলাকায় এ হামলা চালানো হয় বলে দলটির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে কোমলা পার্টির মুখপাত্র আমজাদ পানাহি জানান, ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি তাদের সদর দপ্তরে আঘাত হানলেও আগাম সতর্কতা ও কার্যকর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার কারণে দলের সদস্যরা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন। ‘কোমলা পার্টি’ বা ‘কুর্দিশ টয়লার্স পার্টি’ মূলত ইরানে বসবাসকারী কুর্দি জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে সোচ্চার একটি বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠন। দলটির কার্যক্রম এবং অবস্থানকে কেন্দ্র করে ইরান প্রায়শই ওই অঞ্চলে অভিযান ও হামলা চালিয়ে আসছে।
লোহিত সাগরে সউদী জাহাজে হুথিদের হামলা : লোহিত সাগরের কৌশলগত বাব আল-মানদে প্রণালীতে সউদী আরবের একটি পণ্যবাহী জাহাজে সশস্ত্র হামলায় তিন নাবিক নিহত হয়েছেন। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা গতকাল এই হামলা চালিয়েছে বলে ইয়েমেনি কোস্ট গার্ড এবং সামরিক সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। কূটনৈতিক ও সামরিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তানজানিয়ার পতাকাবাহী ‘তিহামাহ্’ নামের একটি ছোট ডেক কার্গো জাহাজে এ হামলা চালানো হয়। এটি ওমানের সালালাহ বন্দর থেকে জিবুতি হয়ে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিল। হামলায় প্রাণ হারানো তিন নাবিকের মধ্যে দুজন পাকিস্তানি এবং একজন ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়ানোর পর হুথি হামলায় জাহাজে নাবিক নিহতের ঘটনা এটিই প্রথম।
বিশ^বাজারে ফের তেলের দামে উর্ধ্বগতি : আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও বাড়ছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। লন্ডনের আইসিই এক্সচেঞ্জে আগামী অক্টোবরে সরবরাহের জন্য চুক্তি হওয়া ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম প্রতি ব্যারেল ৮৮ মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। গত ৩১ জুলাইয়ের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম এই প্রথম এমন উচ্চতায় পৌঁছাল। ট্রেডিং উপাত্তের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনিচ মান সময় (জিমএমটি) রাত ১:৪২ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ০.৪১ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮৮.০৮ ডলারে বিক্রি হয়। অবশ্য এর কিছুক্ষণ পর (রাত ১:৪৭ মিনিট) দর কিছুটা সামলে নিয়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮.০১ ডলারে অবস্থান করে। অপরদিকে, মার্কিন অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামেও উর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ০.৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৮২.৪৮ মার্কিন ডলারে কেনাবেচা হচ্ছে। বাজার সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে সরবরাহ পরিস্থিতির চাপ এবং আন্তর্জাতিক চাহিদার পরিবর্তনের কারণেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে এমন উর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। সূত্র : আল-জাজিরা, গালফ নিউজ, মিডল ইস্ট আই, রয়টার্স।