বিশ্বকাপের মাঠে যখন ইংল্যান্ড নামে, গ্যালারিতে ওঠে সেন্ট জর্জের পতাকা। আবার কিছুদিন পর একই মঞ্চে নামে স্কটল্যান্ড, তাদের হাতে সেন্ট অ্যান্ড্রুর নীল-সাদা পতাকা। দর্শকের মনে তখন স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে, দুটিই তো যুক্তরাজ্যের অংশ। তাহলে বিশ্বকাপে এক দেশের দুই দল কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ফুটবলের নিয়মবই খুললেই হবে না। ফিরতে হবে আধুনিক ফুটবলের জন্মকালে।
যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক আইনে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড আলাদা পরিচয়ের চারটি ‘হোম নেশন’। তাদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন, নিজস্ব জাতীয় দল, নিজস্ব জার্সি, নিজস্ব সমর্থক, নিজস্ব আবেগ।
কারণ আধুনিক ফুটবলের জন্মই ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে। ১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ডে গঠিত হয় বিশ্বের প্রথম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। এরপর স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও তৎকালীন আয়ারল্যান্ডও নিজেদের ফুটবল সংস্থা গড়ে তোলে। তখনও ফিফার জন্ম হয়নি। তাই ফুটবল যখন আন্তর্জাতিক কাঠামোয় ঢুকল, তখন এই চার সংস্থার ঐতিহাসিক মর্যাদা আগেই প্রতিষ্ঠিত।
১৮৭২ সালের ৩০ নভেম্বর গ্লাসগোতে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের ম্যাচকে ফিফা আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রথম আনুষ্ঠানিক ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ বিশ্ব ফুটবলের আন্তর্জাতিক যাত্রাই শুরু হয়েছিল এই দুই প্রতিবেশীর লড়াই দিয়ে। সেই ম্যাচে গোল হয়নি, কিন্তু ইতিহাসের দরজা খুলে গিয়েছিল।
ফিফা পরে যখন বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ নিয়ম দাঁড়ায়, এক দেশে একটি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু ব্রিটিশ হোম নেশনগুলোর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়। কারণ তারা শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রাচীনতম নির্মাতাদের একজন।
তাই আজও ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড আলাদা দল হিসেবে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব খেলে। যোগ্যতা অর্জন করলে একই বিশ্বকাপে চার দলই খেলতে পারে। তারা একই দেশের একই পাসপোর্টের নাগরিক হতে পারে, কিন্তু ফুটবলের মাঠে তারা চার আলাদা পরিচয়।
এখানে আরেকটি মজার বিষয় আছে। অলিম্পিকে তারা সাধারণত গ্রেট ব্রিটেন বা টিম জিবি নামে একসঙ্গে দেখা যায়। কারণ অলিম্পিকের কাঠামো রাষ্ট্রভিত্তিক। কিন্তু ফিফা সার্বভৌম রাষ্ট্রভিত্তিক নয়, সদস্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ফুটবল পরিচালনা করে। তাই ঐতিহাসিক কারণে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড আজও আলাদা সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি ধরে রেখেছে। এই পার্থক্যই ফুটবলের মাঠে যুক্তরাজ্যকে চার ভাগে দাঁড় করিয়েছে।
এই আলাদা পরিচয় কেবল প্রশাসনিক নয়, আবেগেরও। ইংল্যান্ড-স্কটল্যান্ড ম্যাচ শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়। সেখানে ইতিহাস থাকে, প্রতিবেশী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, শতবর্ষের স্মৃতি থাকে। স্কটিশ সমর্থকের কাছে ইংল্যান্ডকে হারানো অনেক সময় বিশ্বকাপ জয়ের মতো আনন্দের। ইংল্যান্ডের কাছে স্কটল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচ মানে পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায়।
বিশ্বকাপের এই ব্যতিক্রমে মানচিত্রের রেখা এক থাকে, কিন্তু ফুটবলের পরিচয় আলাদা হয়ে দাঁড়ায়। একই রাষ্ট্রের বুক থেকে উঠে আসে চারটি আলাদা ফুটবল-পরিচয়। ইংল্যান্ড নিজের গান গায়, স্কটল্যান্ড নিজের পতাকা তোলে, ওয়েলস নিজের ড্রাগন নিয়ে আসে, উত্তর আয়ারল্যান্ড নিজের সুরে দাঁড়ায়।
এক দেশের দুই দল তাই কোনো ভুল নয়। এটি ফুটবলের জন্মভূমির প্রতি ইতিহাসের এক বিশেষ সম্মান। বিশ্বকাপের মাঠে যখন ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড আলাদা জার্সিতে দাঁড়ায়, তখন আসলে একই দেশের দুই অংশ নয়, ফুটবলের দুই পুরোনো আত্মা মুখোমুখি হয়।
তথ্যসূত্র: FIFA Museum; FIFA Member Associations