ঈদের ছুটি শুরু হলে সংবাদপত্রে একটি কমন শিরোনাম দেখা যায়, তাহলো ‘নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়ছে লাখো মানুষ’। এই বাক্যটি সংবাদপত্রে কবে থেকে স্থান পেল তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়। প্রশ্ন হলো, এভাবে গ্রামের দিকে ছুটে যাওয়ার ঘটনা পৃথিবীর কটি দেশে দেখা যায়? ছুটি শুরু হলে মানুষ পরিবারপরিজন নিয়ে শত দুর্ভোগ সহ্য করে বাস-ট্রাক-ট্রেনের ছাদে চড়ে ও লঞ্চে গাদাগাদি করে গ্রামের দিকে ছুটতে থাকে। আবার ছুটি শেষ হলে একই কায়দায় ঢাকায় ফিরে আসে। এবার ঈদের আগে-পিছে ১৫ দিনে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জনের মৃত্যু হয় এবং হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয় (সূত্র : যাত্রী কল্যাণ সমিতি)। অনেকে মন্তব্য করেছেন ১৫ দিনে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধেও এত মানুষের প্রাণহানি ঘটেনি। একজন মানুষ খুন হলে এলাকাবাসী তার কথা অনেক দিন মনে রাখে; কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে তাদের কথা মানুষ দুই দিনেই ভুলে যায় এবং একপর্যায়ে পরিসংখ্যানে রূপান্তরিত হয়। দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে সদরঘাটে দুই লঞ্চের চিপায় পড়ে পিতা-পুত্রের মৃত্যু এবং দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নদীতে বাস ডুবে ও কুমিল্লা পদুয়ার বাজারে বাস-ট্রেনের সংঘর্ষে ৩৮ জনের মৃত্যুর ঘটনা তিনটি বড়ই মর্মান্তিক। গত ১৭ মার্চ সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম রাঙামাটির একটি নদীতে ব্রিজ উদ্বোধনের সময় বলেন, ‘এবার ঈদের ছুটিতে দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়বে।’ ছুটিতে ঢাকা ছাড়ার ঘটনা এই প্রথম নয়, এটা মন্ত্রীও জানেন। তিনি আরও জানেন, এই বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর মতো পরিবহনব্যবস্থা এ দেশে নেই। তারপরও তিনি ইচ্ছা করলে শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত করতে পারতেন। এরকম দুর্ঘটনা ঘটলে বিশেষজ্ঞরা ঢাকার লোকসংখ্যা কমানোর জন্য বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেন। কিন্তু বিকেন্দ্রীকরণের রূপরেখা কেমন হবে, তা নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি হওয়ার ঘটনা কখনোই দেখা যায়নি।
ঢাকা শহরে ১৯৯০ সালে লোকসংখ্যা ছিল ৬০-৬৫ লাখের মতো। এখন সেটা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় তিন কোটি হচ্ছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে রয়েছে পোশাকশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, গৃহকর্মী, রিকশাওয়ালা, মুদি দোকানিসহ নানান পেশার লোক। লোকসংখ্যা কমানোর কথা উঠলেই একশ্রেণির লোক বলা শুরু করেন, ঢাকা থেকে আগে গার্মেন্ট কারখানা সরাতে হবে। তাঁরা জানেন না, বেসরকারি উদ্যোগে ১৯৭৭ সালে প্রথম গার্মেন্টশিল্পের যাত্রা শুরু হয়। পরে সরকার বেপজা সৃষ্টি করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৮টি ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করে। বিগত সরকার বিভিন্ন জেলায় ১০০টি অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছিল। এগুলো বিকেন্দ্রীকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় নয়। মজার বিষয় হলো, এ দেশের বহু রাজনীতিক চীন সফরে গিয়ে চীনের পরিকল্পিত উন্নয়ন দেখে মুগ্ধ হন এবং দেশে এসে চীনের মডেলে উন্নয়নের কথা বলেন। তাঁরা ভেবে দেখেন না, বেইজিংয়ের লোকসংখ্যা ২ কোটি ১৮ লাখ। বেইজিং প্রশাসনিক শহর হওয়ায় সেখানে বসবাস করতে হলে সরকারের বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। ফলে সেখানে লোকসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় শূন্য। শিল্পকারখানার জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চল। যোগাযোগের জন্য রয়েছে অত্যাধুনিক পরিবহনব্যবস্থা। ভিয়েতনামেও শিল্পকারখানার জন্য নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। সেখানে কঠোরভাবে কৃষিজমি রক্ষা করা হয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও বিভিন্ন রাজ্যে শিল্পকারখানার জন্য নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। বিকেন্দ্রীকরণের জন্য কেউ কেউ প্রদেশ সৃষ্টি, কেউ বিভাগীয় শহরগুলোর উন্নয়নের কথা, কেউবা সরকারি অফিসগুলো ঢাকার বাইরে স্থাপনের কথা বলেন। এখানে একটি উদাহরণ প্রাসঙ্গিক হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একটি পাড়ার শিশুদের পড়ান। অথচ তাঁদের চাকরি নিয়ন্ত্রণ করা হয় ঢাকা থেকে। কাজেই দুই প্রকারের সরকারব্যবস্থা, তথা কেন্দ্রীয় সরকারব্যবস্থা ও স্থানীয় সরকারব্যবস্থাই স্থায়ী সমাধান দিতে পারে। বিভাগগুলো বিলুপ্ত করে যাবতীয় স্থানীয় কাজ জেলাকেন্দ্রিক করে দিতে হবে (বিভাগীয় শহরগুলো কোনো না কোনো জেলার প্রধান শহর)। জেলার সঙ্গে শুধু কেন্দ্রের সম্পর্ক থাকবে। তার আগে স্থানীয় ইউনিটগুলোকে প্রজাতান্ত্রিক রূপ দিয়ে স্বশাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। সমগ্র দেশে আরও শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। শিল্পাঞ্চলগুলো কেন্দ্রের হাতে থাকবে। যদিও বিদ্যমান আইনে বেপজা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন।
লেখক : গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক