দেশে প্রতিদিন গড়ে একটি মাত্র তেলবাহী ট্রেন চললেও মাসে দুই থেকে তিনটিই পড়ছে দুর্ঘটনার কবলে। জরাজীর্ণ রেলপথ আর ফিটনেসবিহীন ইঞ্জিন নিয়ে চলা এসব ট্রেনের কনটেইনার উলটে প্রতিবারই কোটি কোটি টাকার তেল ভেসে যাচ্ছে।
আর চুক্তি অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ তেলের বাজারমূল্য ক্ষতিপূরণ হিসাবে পরিশোধ করতে গিয়ে রীতিমতো ফতুর হচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। অভিযোগ রয়েছে, জরাজীর্ণ লাইন মেরামত না করে প্রতিবারই দায় চাপানো হয় চালক বা গার্ডের ওপর। উলটো তেলের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদানকে কেন্দ্র করে রেলে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী ‘তেলচক্র’ দুর্ঘটনার সুযোগ নিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অর্থ। মাসের পর মাস এই অব্যবস্থাপনার কারণে রেলের লোকসানের পাল্লা ভারী হওয়ার পাশাপাশি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে পরিবেশ ও যাত্রীসেবা।
এ প্রসঙ্গে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রেলওয়ে মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, রেলপথে তেল কিংবা তেলজাতীয় দ্রব্য পরিবহণে খুবই সতর্কতার সঙ্গে ট্রেন পরিচালনা করতে হয়। স্বাভাবিক ট্রেনের চেয়ে ৩-৪ গুণ বেশি ভারী হয় তেলবাহী ট্রেন। উনিশ থেকে বিশ হলেই লাইনচ্যুতের ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বলেন, তেলবাহী ট্রেন দুর্ঘটনায় তেলের বাজারমূল্য ধরে পুরো টাকা রেলকেই পরিশোধ করতে হয়। রেলপথেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। তাছাড়া তেল ভেসে পড়ায় আশপাশের নদীনালা, খাল-বিল ও পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে।
আফজাল হোসেন আরও বলেন, সম্প্রতি সিদ্ধান্ত হয়েছে, ওইসব ট্রেনে সংশ্লিষ্ট একজন যান্ত্রিক প্রকৌশলী চালকের সঙ্গে থাকবেন। সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় ট্রেন চালাতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর গড়ে ৩৫টির বেশি তেলবাহী ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। এক্ষেত্রে নষ্ট হওয়া তেলের হিসাবনিকাশে চলে জালিয়াতি। একটি চক্র এক্ষেত্রে অবৈধ অর্থের চালাচালি করে। এ কারণে তেলবাহী ট্রেন কেন বারবার লাইনচ্যুত হচ্ছে-এর যথাযথ উত্তরও মেলে না। দুর্ঘটনার যাবতীয় দায় রেলের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে চালকদের ওপরই চাপানো হয়, যারা নিজেরাই দুর্ঘটনার শিকার। গার্ড কিংবা স্টেশন মাস্টারের ওপরও শাস্তি নেমে আসে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক (সাময়িক বরখাস্ত) একজন ট্রেনচালক যুগান্তরকে বলেন, জরাজীর্ণ লাইনের কারণে দুর্ঘটনা হলেও শাস্তি ভোগ করতে হয় চালক, গার্ড ও সংশ্লিষ্ট স্টাফদের। অথচ দুর্ঘটনায় আমরাও গুরুতর আহত হই।
রেল বলছে, দুর্ঘটনায় তেল পড়লে তেল কোম্পানিগুলো ক্ষতিপূরণ দাবি করে। দাবি অনুযায়ী, রেলের পরিদর্শক যাচাই-বাছাই করে। পরে একটি কনটেইনারের জন্য (তেলের ক্ষতি বাবদ) ৫০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে হয় রেলকে।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় একটি কনটেইনার পড়লে একাধিক দেখিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা ভাগাভাগি করা হয়। রেলের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি চক্র এতে জড়িত। যারা রেলে ‘তেলচক্র’ নামে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষতিপূরণ হিসাবে পাওয়া অর্থের ভাগ পেয়ে থাকে ট্রেনের দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু চালক ও গার্ডও। দুর্ঘটনার পর যিনি পরিদর্শনে যান, তিনিও নামমাত্র পরিদর্শন করেন। তাছাড়া একসময় রেলে এই পরিদর্শক পদে ৭০ থেকে ৮০ জন ছিলেন, বর্তমানে আছেন মাত্র ৫-৬ জন। বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে, জরাজীর্ণ রেললাইন, ফিটনেসবিহীন ইঞ্জিন, রেললাইনের স্লিপার ও পাথর সরে যাওয়া এবং কারিগরি ত্রুটির কারণেই ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দুর্ঘটনায় কখনো কখনো ৬-৭টি তেলভর্তি কনটেইনার উলটে তেল ভেসে যায়। এতে যথাসময়ে টাকা পরিশোধও সম্ভব হয় না। এজন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দও নেই। তিনি বলেন, তেলবাহী ট্রেন দুর্ঘটনার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক একটি রেল সেকশন বন্ধ থাকে। কখনো যাত্রীবাহী ট্রেন বাতিলও করতে হয়, এতে লোকসান আরও বাড়ে।
নাজমুল ইসলাম আরও বলেন, একটি তেলবাহী ট্রেন পরিচালনায় সিলেট রুটে ৬ লাখ এবং রংপুর রুটে ১৪ লাখ টাকা আয় হয়। কিন্তু এক একটি দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ হিসাবে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন তথ্যে উঠে আসছে পুরো রেলপথ জরাজীর্ণ। আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন-কোচ দ্বারা বিভিন্ন ট্রেন চলছে। ঘন ঘন দুর্ঘটনা মানেই পুরো ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম-দুর্নীতি রয়েছে। সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। ট্রেন দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে শতভাগ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।