চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ও বিধ্বংসী পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে ইরান। দেশটির প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড কোর আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এই যুদ্ধ পরিকল্পনায় ৫টি সুনির্দিষ্ট ধাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তেহরানের দাবি, তাদের এই কৌশল কেবল সামরিক নয় বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। শুক্রবার ওমানে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই তেহরানের এই রণকৌশল প্রকাশ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়ছে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই পরিস্থিতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে সতর্ক থাকতে বলে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও উসকে দিয়েছেন।
ইরানের এই যুদ্ধ পরিকল্পনার প্রথম ধাপ শুরু হবে সম্ভাব্য মার্কিন বিমান হামলাকে কেন্দ্র করে। দেশটির পারমাণবিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে আমেরিকা যদি হামলা চালায়, তবে ইরান তা প্রতিহত করার চেয়ে বরং পাল্টা আঘাত হানার জন্য নিজেদের সক্ষমতা টিকিয়ে রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা তাদের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ মাটির গভীরে অত্যন্ত সুরক্ষিত বাংকারে সরিয়ে নিয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপে ইরান তার নিজস্ব ভূখণ্ডের বাইরে যুদ্ধের পরিধি বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করেছে। এর আওতায় কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে শত শত ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলার নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে। একই সাথে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের সক্রিয় করে ইসরায়েলসহ মার্কিন মিত্রদের ওপর চতুর্মুখী হামলা চালানোর কথা ভাবছে তেহরান।
সাইবার যুদ্ধকে ইরান এই সংঘাতের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে দেখছে। মার্কিন পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ গ্রিড, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় ধস নামিয়ে দিয়ে আমেরিকানদের মনোবল ভেঙে দেওয়াই তাদের মূল উদ্দেশ্য। তবে ইরানের সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস লুকিয়ে আছে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে।
পরিকল্পনার চতুর্থ ধাপে ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। প্রতিদিন বিশ্ব বাজারের প্রায় ২১ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে যায়। ইরান মনে করছে, এই নৌপথটি বন্ধ করতে পারলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে। ইরানের কৌশলবিদদের মতে, এই অর্থনৈতিক চাপই শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকে পিছু হটতে বাধ্য করবে।
পরিকল্পনার শেষ বা পঞ্চম ধাপে ইরান দীর্ঘস্থায়ী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ছক কষেছে। তারা বিশ্বাস করে, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতার পর মার্কিন জনতা বা প্রশাসন কোনো দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে থাকতে চাইবে না। যদিও আমেরিকার অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তির সামনে ইরানের টিকে থাকা কঠিন, তবুও তেহরানের মূল লক্ষ্য হলো এই যুদ্ধকে এতটাই ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা যেন ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য হয়।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ
বিডি প্রতিদিন/নাজমুল