১ জুলাই থেকে দেশে পালিত হচ্ছে জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বার্ষিকী। আন্দোলনের পক্ষের একটি শক্তি বিএনপি এখন সরকারে আছে, আরেক পক্ষ আছে বিরোধী দলে। এরই মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে আন্দোলনের শরিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে সুস্পষ্ট মতপার্থক্য ও অবিশ্বাস। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে-জুলাই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য কী ছিল? আর জুলাই নিয়ে মানুষের প্রত্যাশাই বা কতটা পূরণ হয়েছে-এমন আলোচনাও উঠেছে। বলা হচ্ছে, জুলাই আন্দোলনে অনেক অর্জন থাকলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে পাড়ি দিতে হবে আরও অনেক পথ।

তবে সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়া জুলাই বিপ্লবের মূল অর্জন বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর পর দেশ একটি নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতায় আসাও গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ। এর আগে পরপর তিনটি নির্বাচনে দেশের জনগণ ভোট দিতে পারেনি। কিন্তু এবার দেশের মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। এছাড়া হাসিনা সরকারের আমলে ভয়ের সংস্কৃতি চালু থাকলেও এখন মানুষ প্রাণ খুলে কথা বলতে পারছেন। গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামো প্রায় ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরে এসেছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আন্দোলনের অগ্রভাবে থাকা তরুণ প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর দায়িত্ব এখন সরকারের। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মুখ চেপে ধরার রাজনীতি, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি চব্বিশে দেশের জনগণকে গণ-অভ্যুত্থানে বাধ্য করেছিল। ফলে অভ্যুত্থানকারীদের মনের ভাষা, আহতদের চোখের ভাষা, শহীদপরিবারের প্রত্যাশা বর্তমান নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় নিতে হবে বলে দেশের রাজনীতিতে আলোচনা আছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা এক বা দেড় বছরেই পুরোপুরি পূরণ হবে না। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পূরণ হতে থাকবে। দেশ যদি সঠিকভাবে চলে এবং গণতন্ত্র সুচারুভাবে পরিচালিত হয়, তবেই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হবে। ফ্যাসিবাদী আমলের নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, সঠিক উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যাংক লুটপাট ও শেয়ারবাজার লুটের মতো ঘটনা না ঘটাই কাঙ্ক্ষিত। বিএনপি সরকারের ৫ মাসে এখন পর্যন্ত দেশে এসব অনিয়ম ঘটেনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ীই দেশ পরিচালিত হচ্ছে।

বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা কয়েক মাসে পূরণ করা সম্ভব না। কারণ, একদিন কিংবা দু-এক মাসে গণ-অভ্যুত্থান হয়নি। বিগত ১৭ বছরে বিএনপির হাজারো নেতাকর্মী গুম, খুন হয়েছে; নানা দমন-পীড়ন ও পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকেই গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছে।

তিনি বলেন, আমরা মনে করি, জুলাইয়ের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। অন্ততপক্ষে একটা অভিযাত্রা শুরু হয়েছে। মানুষের ভোটাধিকার ফেরত এসেছে, গণহত্যা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টাটি অন্তত সফল হয়েছে।

আলাল বলেন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কূটনৈতিক এবং অন্যান্য বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিবেশী ও প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মর্যাদা ইতোমধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রমাণ মানের দিক থেকে বাংলাদেশের পাসপোর্টও আগের চেয়ে তিন ধাপ এগিয়েছে। তাছাড়া মানুষের মনে একটা প্রত্যাশা জন্মেছে যে যতকিছুই হোক, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং ফ্যাসিবাদের ফেরত আসার ব্যাপারে কোনো মতানৈক্য থাকবে না। অন্য বিষয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে; কিন্তু এ ব্যাপারে ঐক্য হয়েছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার মনে করেন, ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়া জুলাই বিপ্লবের অর্জন। তার মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর পর আমরা একটি নির্বাচিত সরকারের আমলে আছি। বহু বছর পর এ দেশের মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন, যদিও ভোটের ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল দেশের রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তন; যেখানে প্রধানমন্ত্রীর একক ও অসীম ক্ষমতা থাকবে না, বৈষম্যহীন রাষ্ট্রগঠন করা, সর্বস্তরে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা-সেটি অর্জিত হয়নি। এসব আগের মতোই চলছে।

তার মতে, জুলাই হারিয়ে গেলে দেশের রাজনীতি, সমাজ ও সভ্যতা আবারও সেই ঘন অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। সর্বোপরি দেশ আবার কোনো বিদেশি শক্তির ডিক্টেশনে পরিচালিত হবে। আলটিমেটলি হেরে যাবে বাংলাদেশ। সেটা আমরা হতে দেব না। আবু সাঈদ থেকে শুরু করে ওসমান হাদি পর্যন্ত কোনো শহীদের আকাঙ্ক্ষা আমরা হারিয়ে যেতে দেব না।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব যুগান্তরকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী ১৭ বছরে বাংলাদেশ চলেছে প্রতিবেশী দেশের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে। বিরোধী দল ও মতের মানুষকে গুম-খুন ও নির্যাতন করা হয়েছিল ওই দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। ২০০৯ সালে পিলখানায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তা হত্যা, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড-সবকিছুতেই ওই সংস্থা জড়িত ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ছিল প্রতিবেশী দেশটির হাতে। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পেয়েছে, এটা বড় অর্জন। দ্বিতীয় অর্জন হলো-জেনারেশন জেড এবং আলফা রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠেছে। এই প্রতিবাদী শক্তির সক্রিয়তার কারণে আগামী দিনে আর কেউ স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারবে না।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর মানুষের ভোটের অধিকারের স্বীকৃতি মিলেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এর ফলে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সরকার পরিবর্তনের একটি সুযোগ আবার তৈরি হলো।

তিনি বলেন, গত দুই দশকের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বড় ‘ডেমোক্রেটিক স্পেস’ বা গণতান্ত্রিক পরিসর তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

সাইফুল হক বলেন, আন্দোলন শুরু হয়েছিল বৈষম্যবিরোধী চেতনা থেকে; কিন্তু বাস্তবে অর্থনৈতিক, সামাজিক, নগর-শহর কিংবা নারী-পুরুষের বৈষম্য দুবছরে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়ে লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়েছে। সমাজে অস্থিরতা ও নৈরাজ্য পরিস্থিতি দেখা গেছে; মানুষের জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। গত সাড়ে পাঁচ মাসেও দখলবাজি, হাতবদল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও বল প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে। দুর্বৃত্ত-অর্থনীতি ও দুর্বৃত্ত-রাজনীতির যে শক্তিশালী অশুভ আঁতাত রয়েছে, তা এখনো ভাঙা সম্ভব হয়নি। তবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিএনপি কিছু জনপ্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছে, যা সমাজে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের ঐকান্তিক ইচ্ছা প্রকাশ পায়।

জুলাই আন্দোলনকালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল এবং পরবর্তী সময়ে সংগঠনটির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, হাসিনার আমলের ১৫ বছরে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে যে ভীতিকর অবস্থা ছিল, সেটা এখন নেই। সিট দখল, ফাও খাওয়া, কমিশন বাণিজ্য, সব সময় কথিত বড় ভাইয়ের পেছনে ছোটা, ভিন্নমতের অবস্থান করতে না দেওয়া এবং গণরুম-গেস্টরুমের নামে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ছিল নিত্যকার ঘটনা। এখন ক্যাম্পাসে সহাবস্থান আছে। আরেকটি হলো-দেশে ভয়ের রাজনীতি কিছুটা হলেও কমেছে। এখন সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপিদেরও ন্যায্য সমালোচনা করা যায়। সর্বোপরি একটি নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে কোনো সময় রুখে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করেছে। তাদের হাত ধরে আগামী দিনে দেশ সামনে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে, ইনশাআল্লাহ।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews