২০২৫ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কযুদ্ধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে নতুন ও জটিল মোড় নিয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য গভীর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের পূর্ববর্তী কঠোর পাল্টা শুল্কনীতিকে অবৈধ ঘোষণা করলেও এই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট দমে যাননি, বরং তাঁর নীতি বাস্তবায়নে আরও মরিয়া হয়ে উঠেছেন। আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে তিনি এখন বিশ্বব্যাপী ঢালাও ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন,  যা বিশ্ববাণিজ্যে নতুন অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের জন্য এ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে বলে মনে করছেন শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ এবং এর আইনি বৈধতা নিয়ে তৈরি বর্তমান জটিলতা। ট্রাম্পের আগের ঘোষণার পর বাংলাদেশের সঙ্গে ১৯ শতাংশ শুল্কের একটি বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা রপ্তানি বাণিজ্যে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল। এখন আদালতের রায়ে আগের শুল্ককাঠামো বাতিল হয়ে যাওয়ায় ওই ১৯ শতাংশের বিশেষ চুক্তিটিও চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এবং এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চুক্তিটি যদি আইনি জটিলতায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়, তবে বাংলাদেশ নতুন ঘোষিত ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের আওতায় পড়বে, যা আপাতদৃষ্টে শুল্কের হার কম মনে হলেও এই নীতিগত অনিশ্চয়তা তৈরি পোশাক খাতের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে শুল্কহারের চেয়েও বড় সমস্যা হলো যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বাণিজ্য নীতিতে স্থিতিশীলতার অভাব এবং ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন। যখন কোনো দেশের বাণিজ্যনীতি বা আমদানি-রপ্তানি আইন নিয়মিতভাবে পরিবর্তিত হয়, তখন মার্কিন ক্রেতারা দীর্ঘমেয়াদি কার্যাদেশ বা ‘লং টার্ম অর্ডার’ দিতে ভয় পান এবং দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। নীতিগত নিশ্চয়তা না থাকলে বড় আমদানিকারকরা স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প উৎসের সন্ধান করেন, যা বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে। এই দোদুল্যমান অবস্থা বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠানোর প্রক্রিয়া জটিল করে তুলছে এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও ট্রাম্প প্রশাসন হাত গুটিয়ে বসে নেই, বরং তারা এখন ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন ব্যবহারের সুনিপুণ পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। এ আইনের বিশেষ ধারার অধীনে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা বা অন্যায্য বাণিজ্যরীতির অজুহাতে যেকোনো দেশের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপের পথে হাঁটছেন। তার এই জেদি মনোভাব ও রক্ষণশীল অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে, তিনি মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যেকোনো চরম পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। এমনকি মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন, প্রশাসন নতুন এই আইনি পথে শুল্ক কার্যকরের জন্য প্রশাসনিক কাজ শুরু করেছে, যা বিশ্ববাজারে অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দেবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান এখন অত্যন্ত নাজুক এবং তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়া ইতোমধ্যে তাদের উৎপাদনসক্ষমতা এবং শুল্কসুবিধা নিয়ে বৈশ্বিক বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। তারা পণ্যের বৈচিত্র্যে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষত ভিয়েতনাম প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চমূল্য সংযোজন পণ্যে অগ্রসর। ভারত ও পাকিস্তান তাদের নিজস্ব তুলা ও জ্বালানিসুবিধার কারণে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছে, ভারতের বাজার বহুমুখীকরণ কৌশলও জোরদার হচ্ছে। ফলে শুধু নিম্নব্যয়ভিত্তিক উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। যেখানে বাংলাদেশ এখনো কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। মার্কিন এ শুল্কযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে আঞ্চলিক প্রতিযোগীরা যদি বিশেষ ছাড় বা রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারে, তবে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বাজার সংকুচিত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র, যা আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ডে আঘাত করবে।

বর্তমান এ ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমদানিকারকের চাহিদা অনুযায়ী ‘গ্রিন’ অত্যন্ত জরুরি। ক্রেতারা এখন কেবল সস্তা পণ্য নয়, বরং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যের মূল শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারখানায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং পানির অপচয় রোধ করার মাধ্যমে টেকসই পরিবেশ নিশ্চিতকরণ ছাড়া বিশ্ববাজারে টিকে থাকা অসম্ভব। একই সঙ্গে অটোমেশন এবং আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে উৎপাদন দক্ষতা না বাড়ালে উচ্চ শুল্ক ও ক্রমবর্ধমান মজুরির চাপে পোশাকশিল্প প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি পর্যায়ে নীতিগত সহায়তা এবং ব্যাংকঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো যাতে আধুনিক প্রযুক্তি এবং গ্রিন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে, সেজন্য বিশেষ তহবিল বা গ্রিন বন্ডের ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়িয়ে পণ্যের বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগ দিতে হবে।  কেবল সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকার দিন শেষ হয়ে আসছে; এখন গুণগত মান এবং কারিগরি উৎকর্ষই হবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মূল শক্তি। এ বৈশ্বিক সংকটে সরকারের পাশাপাশি বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএকেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখক : প্যারিসপ্রবাসী বিশ্লেষক ও গবেষক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews