সারাবিশ্বে ব্যাপক আকারে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। বাহ্যত মনে হচ্ছে দুর্ভিক্ষকে আমরা হাতছানি দিয়ে আহ্বান করছি। একটা বিশেষ শ্রেণি ছাড়া বিশ্বের একটা বড়ো অংশ দিনদিন নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। তাই এখনই সময় সব ধরনের অপচয় থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা।
একটি বিষয় নিয়ে আমরা যদি চিন্তা করি, তাহলে দেখবো বিশাল এ পৃথিবীর কোথাও কোনো প্রাণী খাবারের কষ্ট পেলে তা কিন্তু মানুষের কারণেই পেয়ে থাকে। কখনও মানুষের সীমালঙ্ঘনের কারণে চেপে বসা দুর্ভিক্ষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়। বিশ্বের চলমান অর্থনৈতিক মন্দার হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে ইসলামি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। যদিও মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে সৃষ্টিজগতের সব প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহপাক নিয়েছেন।
যেভাবে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রাণী রয়েছে সবার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর, তিনিই জানেন তারা কোথায় থাকে আর কোথায় তাদের মরণ হবে। সব কিছুই একটি সুবিন্যস্ত কিতাবে সংরক্ষিত আছে’ (সুরা হুদ, আয়াত : ৬)। তবে আমরা কেউ জানি না কখন কোন বিপদ আপতিত হয়।
বর্তমান বিশ্বের যে অবস্থা আমরা কেউ বলতে পারিনা সামনে কি হতে যাচ্ছে, সর্বত্রই যেন হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে। তাই কঠিন পরিস্থিতির আগেই আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সব ধরনের অপচয় রোধে সবাইকে কাজ করতে হবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, খাবারসহ কোনো কিছুরই অপচয় করা যাবে না।
অপ্রয়োজনীয় ব্যয় সম্পর্কে ইসলামের কঠোর মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিসে। যাতে অজু করার সময়ও পানির অপচয় না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একদা হজরত রসুল (সা.) হজরত সাদ (রা.)কে অজুর মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যয় করতে দেখে বলেন, ‘হে সাদ! অপচয় করছ কেন? সাদ (রা.) বলেন, অজুতে কী অপচয় হয়? নবিজি (সা.) বলেন, হ্যাঁ। প্রবহমান নদীতে বসেও যদি তুমি অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করো, তা অপচয়।’ (ইবনে মাজাহ)।
হাদিসে আরো এসেছে, ‘যা ইচ্ছা পানাহার করো এবং যা ইচ্ছা পরিধান করো, তবে শুধু দুটি বিষয় থেকে বেঁচে থাক। প্রথমত, তাতে অপব্যয় অর্থাৎ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি না হওয়া চাই এবং দ্বিতীয়ত গর্ব ও অহংকার না থাকা চাই। (বুখারি)। তবে এ ক্ষেত্রে রাসূল (সা.) একটি স্বাভাবিক সীমা দিয়ে দিয়েছেন।
আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আদম সন্তান যে-সব ভাণ্ডার পূর্ণ করে, তন্মধ্যে পেট হলো সবচেয়ে খারাপ। আদম সন্তানের জন্য স্বল্প কিছু লোকমাই যথেষ্ট, যা দিয়ে সে তার পিঠ সোজা রাখতে পারে। এর বেশি করতে চাইলে এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ নিশ্বাসের জন্য যেন নির্দিষ্ট করে।’ (তিরমিজি)।
বর্তমান অনেকের ক্ষেত্রে এমনও দেখা যাচ্ছে, যার আছে সে ইচ্ছেমতো অপচয় করছে আর যার নেই সে কোনোভাবে দু’মুঠো খেয়ে নাখেয়ে দিনাতিপাত করছে। অথচ কঠিন পরিস্থিতিতে মহানবি (সা.) সংযত থাকার শিক্ষা দিয়েছেন।
নবিজি (সা.)এর যুগে যখন মদিনায় দুর্ভিক্ষ এসেছিল, এই দুর্ভিক্ষ থেকে উম্মতকে বাঁচাতে সবাইকে তিনি জীবনাচারে সংযত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হজরত জাবালা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা মদিনায় কিছুসংখ্যক ইরাকি লোকের সঙ্গে ছিলাম। একবার আমরা দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হই, তখন ইবনে জুবায়ের (রা.) আমাদের খেজুর খেতে দিতেন। ইবনে উমর (রা.) আমাদের কাছ দিয়ে যেতেন এবং বলতেন, হজরত রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাউকে তার ভাইয়ের অনুমতি ছাড়া একসঙ্গে দুটো করে খেজুর খেতে নিষেধ করেছেন। (বুখারি)।
দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় মহানবি (সা.)এর শিক্ষাই তার পবিত্র সাহাবিগণ (রা.) অবলম্বন করতেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) দুর্ভিক্ষের বছর বলেন, আর সেই বছর ছিল ভীষণ দুর্বিপাক ও কষ্টের। হজরত উমর (রা.) পল্লি অঞ্চলের বেদুইনদের উট, খাদ্যশস্য ও তেল প্রভৃতি সাহায্যসামগ্রী পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। এমনকি তিনি গ্রামাঞ্চলের একখণ্ড জমিও অনাবাদি পড়ে থাকতে দেননি এবং তাঁর চেষ্টা ফলপ্রসূ হলো। ওমর (রা.) দোয়া করতে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি তাদের রিজিক পর্বতচূড়ায় পৌঁছে দিন।’ আল্লাহ তার এবং মুসলমানদের দোয়া কবুল করলেন। তখন বৃষ্টি বর্ষিত হলে তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর শপথ, যদি আল্লাহ এই বিপর্যয় দূর না করতেন, তবে আমি কোনো সচ্ছল মুসলমান পরিবারকেই তাদের সঙ্গে সমসংখ্যক অভাবী লোককে যোগ না করে ছাড়তাম না। যতটুকু খাদ্যে একজন জীবন ধারণ করতে পারে, তার সাহায্যে দুজন লোক ধ্বংস থেকে রক্ষা পেতে পারে। (আদাবুল মুফরাদ)।
আজ মুসলমান দেশগুলোও মানব সৃষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বিশ্বাসী। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এদের কোনো চেতনাই নেই। বিশ্বনেত্রীবৃন্দ নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত, দেশ যদি রসাতলে যায়, তাতে তাদের কীই-বা আসে যায়। বর্তমানে গোটা বিশ্বে যে অর্থনৈতিক মন্দাভাব বিরাজ করছে, তাতে ধনী-দরিদ্র সব দেশই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামনে কি তা কেবল আল্লাহপাকই ভালো জানেন।
আজ মুসলমান দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনাও খোদা প্রদত্ত শিক্ষা মোতাবেক নয়। তারা সেই রীতি-নীতির ওপর পরিচালিত হবার চেষ্টা করেনি, যার নির্দেশ আল্লাহতায়ালা দিয়েছেন। তারা নি:সন্দেহে দেশের কাঠামোকে উন্নত করেছে কিন্তু সেভাবে সম্পদের ব্যবহার করেনি যেভাবে আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন।
দৃষ্টান্তস্বরূপ বিভিন্ন দেশ প্রয়োজনাতিরিক্ত অর্থ সুদ পাওয়ার আশায় পাশ্চাত্যের ব্যাংকে গচ্ছিত রাখছে কিন্তু অসহায় দরিদ্র মুসলিম দেশগুলোকে সাহায্য করছে না।
মোটকথা মুসলমানরাও আজ ইসলামি শিক্ষার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে, যার ফলে বর্তমানে সর্বত্র বিপর্যয় নেমে আসছে। অর্থনৈতিক মন্দার এই অস্বাভাবিক কবল থেকে উদ্ধার পেতে হলে কুরআন ও হাদিসের আলোকে ইসলামি অর্থনীতির অনিন্দ্য সুন্দর শিক্ষা এবং সম্পদের সুষম বণ্টন ও ব্যবহার জরুরি। বিশ্বের কোনো দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে অন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজন তাদেরকে সাহায্য করা। যেভাবে মহানবি (সা.) মক্কাবাসীদের সাহায্য করেছিলেন।
আমরা জানি, হজরত মুহাম্মদ(সা.) কাফেরদের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য হিজরত করে মক্কা থেকে মদিনা গমনের কিছুদিন পর অনাবৃষ্টি এবং খরার কারণে মক্কায় প্রবল দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। মক্কার চারদিকে খাবারের জন্য প্রবল হাহাকার। খাদ্যের অভাবে মানুষ মৃত পশু, পশুর চামড়া খাবার হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য হলেন। মক্কার প্রতাপশালী, সর্দার এবং ধনাঢ্য আবু সুফিয়ান তখনও মুসলিম হননি এবং ইসলামের প্রবল বিরোধীদের একজন, তিনি জানতেন যে, নবিজি (সা.) দোয়া করলে কবুল হয়। তাই তিনি গোপনে মদিনায় গিয়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.)এর সাথে দেখা করেন এবং মক্কায় খাদ্যের অভাবে তার আত্মীয়-স্বজনগণ খাদ্যের অভাবে কষ্ট করছেন একথা জানিয়ে বৃষ্টির জন্য দোয়া করতে বলেন।
নবিজি (সা.) আবু সুফিয়ানের কথা শুনে তাকে কিছু বলেননি কিন্তু মক্কায় বৃষ্টির জন্য দোয়া করেন, মক্কায় বৃষ্টি হয় এবং মক্কার মানুষ কষ্ট থেকে রক্ষা পায়। এছাড়া রসুল (সা.) ও সাহাবিরা নিজেরাই তখন মারাত্মক কষ্টে থাকা সত্ত্বেও মদিনা থেকে ৫০০ স্বর্ণমুদ্রা পাঠিয়ে দেন মক্কার কাফের সর্দার আবু সুফিয়ান ও সাফওয়ান ইবন উমাইয়ার নিকট। মক্কার দরিদ্র মানুষদের মাঝে তা বণ্টন করে দিতে বলেন। (ফাতাওয়ায়ে শামি ৩/৩০২)
ইসলামে জাকাত পদ্ধতির দান অভাবী এবং দরিদ্রের আত্মসম্মান ও মানমর্যাদা ক্ষুণ্ন না করে তাদের অভাব-অনটন এবং দারিদ্র ক্লেশ মিটিয়ে থাকে। অপর পক্ষে সুদের লগ্নি গরিবের অভাবমোচনতো করেই না বরং তার দারিদ্রকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এতে দেখা যায় একদিকে অভাবিরা আরো দারিদ্রতার দিকে অগ্রসর হয় আর অপর দিকে প্রভাবশালিরা তাদের ধনসম্পদ আরো বৃদ্ধি করছে। মানুষের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যে বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠই দারিদ্রের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছে আর একটি সংখ্যালঘিষ্ঠ গোষ্ঠী সম্পদের পাহাড় গড়ে তার ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে আর এর মূলে রয়েছে সুদ। সুদের কাঠামো আর সুদের প্রতিষ্ঠানই এই মহা বৈষম্যের জন্য সর্বাপেক্ষা বেশি দায়ী।
দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় যে জরুরি বিষয়গুলো আল্লাহতায়ালা হজরত ইউসুফ (আ.)-এর যুগে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে মানুষকে অবগত করেছিলেন তারমধ্যে প্রধান বিষয় ছিল কৃষি ও খাদ্য বিভাগের দায়িত্বশীলকে অবশ্যই খাদ্য ও ফসল উৎপাদন বিদ্যায় পারদর্শী এবং সুষম বণ্টনে অভিজ্ঞ হতে হবে। জনগণের সামর্থ্যানুযায়ী বিনিময় মূল্য গ্রহণ করে এবং সামর্থ্যহীনদের বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। দুর্ভিক্ষকবলিত জনগণের প্রতি অনুগ্রহ নয় বরং অধিকার হিসেবে আপদকালে তাদের খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। ব্যবস্থাপনা এমন থাকবে যেন মানুষ সরকারি ত্রাণ সম্মানের সঙ্গে নিতে পারে। স্বজনপ্রীতি এবং চুরি বন্ধ করতে হবে। কোনো জমিকে চাষাবাদ ছাড়া রাখা যাবে না। সরকারি ব্যবস্থাপনায় খাদ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে তার কৃপার চাদরে জড়িয়ে নিন, আমিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, ইসলামী চিন্তাবিদ।
[email protected]
এইচআর/জেআইএম