মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ। সাম্প্রতিক হামলায় ইরান অস্থিরতার নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বৈশ্বিক শক্তির টানাপোড়েন এবং পালটা-পালটি সামরিক হুমকি পরিস্থিতিকে করে তুলেছে আরও স্পর্শকাতর। কিন্তু ভূরাজনীতির এই দাবা খেলায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হয়ে পড়েন সাধারণ মানুষ—আর বিদেশের মাটিতে থাকা প্রবাসীরা। 

রোববার (১ মার্চ) সকালে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী প্রবাসীদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন অসংখ্য বাংলাদেশি যাত্রী। বিশেষ করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটকে পড়া যাত্রীদের দুর্ভোগ পরিস্থিতিকে আরও মানবিক সংকটে রূপ দিয়েছে। প্রবাসীরা কেউ দেশে ফিরতে পারছেন না, কেউ আবার কর্মস্থলে যেতে পারছেন না—ফলে তাদের অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ বেড়েছে বহুগুণ। প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি তদারকি করছেন এবং যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছানোর বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বিমান প্রতিমন্ত্রী ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী বর্তমানে বিমানবন্দরে অবস্থান করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও যাত্রীদের সহায়তা প্রদান করছেন। আটকে পড়া যাত্রীদের খাবার, আবাসন ও প্রয়োজনীয় তথ্য সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা প্রমাণ করে—প্রবাসীরা কেবল পরিসংখ্যান নন; তারা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের অংশ।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা আমাদের শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে চাঙা রাখেন। ইরান হয়ত বৃহত্তম শ্রমবাজার নয়, কিন্তু সেখানে কর্মরত প্রতিটি বাংলাদেশি পরিবারের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের প্রতিনিধিত্ব করেন। তারা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান না; পাঠান আস্থা, আশাবাদ এবং টিকে থাকার শক্তি। ফলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকেই সুরক্ষিত রাখা।

সাম্প্রতিক হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়া স্বাভাবিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাসমান নানা তথ্য পরিস্থিতিকে আরও বিভ্রান্তিকর করে তোলে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধপরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেখানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষ সতর্কতা জারির পাশাপাশি হটলাইন চালু করেছে সরকার।

অতীত অভিজ্ঞতা বলে, সংকটকালে প্রবাসীদের দেশে ফিরিয়ে আনার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে। বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা মহামারির সময় সরকার চার্টার্ড ফ্লাইট ও বিশেষ ব্যবস্থায় নাগরিকদের ফিরিয়ে এনেছে। যদিও সবাইকে ফিরিয়ে আনা সবসময় সমাধান নয়, তবে জরুরি প্রয়োজনে বিকল্প পথ খোলা রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতার প্রমাণ।

এক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্যভিত্তিক প্রস্তুতি। ইরানে কতজন বাংলাদেশি আছেন, তারা কোন কোন শহরে অবস্থান করছেন, কারা বৈধ নথিপত্রসহ কর্মরত—এসব তথ্য হালনাগাদ থাকা প্রয়োজন। ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দূতাবাসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ নিশ্চিত করা গেলে সংকট ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। অনিয়মিতভাবে অবস্থানরত নাগরিকদের ক্ষেত্রেও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সহায়তার পথ খুঁজতে হবে।

এই সংকট আমাদের সামনে আরও একটি বাস্তবতা তুলে ধরে—মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক শ্রমবাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। আঞ্চলিক অস্থিরতা, নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক উত্তেজনা যে কোনো সময় শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প বাজার অনুসন্ধান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষা চুক্তি জোরদার করা সময়ের দাবি। 

গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দায়িত্বও এখানে কম নয়। যাচাই ছাড়া আতঙ্ক ছড়ানো থেকে বিরত থাকা, সরকারি নির্দেশনা প্রচার করা এবং প্রবাসীদের সহায়তায় ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। সংকটের মুহূর্তে বিভাজন নয়, সংহতিই শক্তি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রবাসীদের পাশে থাকার ঘোষণা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা না হয়। প্রয়োজন হলে জরুরি সহায়তা তহবিল, চিকিৎসা সহায়তা, আইনি সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রবাসীরা যেন অনুভব করেন, তাদের ঘাম ও ত্যাগের মূল্য রাষ্ট্র বোঝে।

ইরানে হামলার এই দুঃসময় দ্রুত কেটে যাক—এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু পরিস্থিতি যাই হোক, একটি বার্তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন: বিদেশের মাটিতে থাকা প্রতিটি বাংলাদেশি রাষ্ট্রের দায়িত্বের পরিধির ভেতরেই আছেন। তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—এই আস্থা বাস্তব পদক্ষেপে প্রতিফলিত হলেই সংকট মোকাবিলা সহজ হবে। কারণ প্রবাসীরা কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নন; তারা বাংলাদেশের বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মুখ, আমাদের শ্রম, সাহস ও স্বপ্নের দূত। 

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews