বাংলাদেশের জ্বালানি খাত বহু বছর ধরে একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে ক্রমবর্ধমান চাহিদা, অন্যদিকে সীমিত দেশীয় সম্পদ এবং আমদানিনির্ভরতার চাপ। শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে জ্বালানির ব্যবহার যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা দেশের অর্থনীতিকে বারবার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় সিলেট অঞ্চলের গ্যাসক্ষেত্রগুলো (সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্ল্যান্ট এবং চারটি বেসরকারি রিফাইনারি কোম্পানি) নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। এগুলো কেবল গ্যাস উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় একটি কৌশলগত ভূমিকা পালন করছে। এই উদ্যোগটি মূলত একটি ‘ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি ইউটিলাইজেশন মডেল’, যেখানে একই সম্পদ থেকে একাধিক জ্বালানি পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে এটি শুধু উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয় নয়, বরং সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার একটি সফল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কনডেনসেটের গুরুত্ব বোঝার জন্য এর প্রকৃতি ও ব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। কনডেনসেট হলো একটি হালকা তরল হাইড্রোকার্বন, যা প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে ভূগর্ভে অবস্থান করে এবং উত্তোলনের সময় আলাদা হয়ে আসে। অতীতে এই কনডেনসেটের যথাযথ ব্যবহার না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই এটি অপচয় হতো অথবা কমমূল্যের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে এখন এই কনডেনসেটকে উচ্চমূল্যের পণ্য যেমন পেট্রোল ও অকটেনে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে।
দেশীয় পর্যায়ে উৎপাদিত জ্বালানি তেল সরাসরি পরিবহন খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা আমদানীকৃত তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করছে। এই ধরনের উদ্যোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে এটি একটি ‘ডাউনস্ট্রিম ভ্যালু চেইন’ তৈরি করে, যেখানে কাঁচামাল থেকে চূড়ান্ত পণ্য পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি দেশের ভিতরেই সম্পন্ন হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের উৎপাদন পরিসংখ্যান এই উদ্যোগের কার্যকারিতা ও সম্ভাবনাকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার টন পেট্রোল এবং ৫৫ হাজার টনেরও বেশি অকটেন উৎপাদন নিছক একটি সংখ্যাগত অর্জন নয়, এটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় একটি কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। উল্লেখ্য প্রতিদিন উৎপাদিত জ্বালানির পরিমাণ হলো অকটেন ৬০০ ব্যারেল বা ৭৪ টন, পেট্রোল ৩ হাজার ৪৫০ ব্যারেল বা ৪২০ টন, ডিজেল ১৫০ ব্যারেল বা ২০ টন, কেরোসিন ১০০ ব্যারেল বা ১৩ টন এবং এলপিজি ১৭ ব্যারেল বা ১.৫ টন। দেশে বার্ষিক পেট্রোলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার টন এবং অকটেন প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার টন। এই তেল মোট পেট্রোলের ৩৩-৩৫ শতাংশ, অকটেনের ৭-৮ শতাংশ, কেরোসিনের ৭ শতাংশ এবং ডিজেলের ০.২ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতে পারে।
সিলেটের গ্যাসক্ষেত্রভিত্তিক কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাতকরণ উদ্যোগটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে যদি এই মডেলকে আরও সম্প্রসারিত করা যায়, যেমন নতুন প্ল্যান্ট স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, তাহলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি ‘সেমি-এনার্জি সেলফ-সাফিসিয়েন্ট’ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা অগ্রাহ্য করলে ভবিষ্যতে এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। প্রথমত গ্যাসক্ষেত্রগুলোর রিজার্ভ সীমিত এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উন্নত ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই উৎপাদন দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হবে না। দ্বিতীয়ত প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্টগুলোর প্রযুক্তি নিয়মিত আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন দক্ষতা কমে যেতে পারে এবং অপচয় বাড়তে পারে। তৃতীয়ত ব্যবস্থাপনাগত স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব এবং কখনো কখনো দুর্নীতির প্রভাব, যা একটি সফল প্রকল্পকেও দুর্বল করে দিতে পারে। চতুর্থত পরিবেশগত ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে। কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং জ্বালানি উৎপাদনের সময় নির্গত বর্জ্য ও গ্যাস পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যদি যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকে। তাই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রয়োগ করা অপরিহার্য।
♦ লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়