কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা যখন নির্বাচনের মাধ্যমে তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠন করে তখন সরকার গঠনের পর সেই নেতার এবং দলের অন্যান্য দায়িত্বশীল নেতা ও কর্মীর কার্যকলাপ এবং কথাবার্তায় খুব সতর্ক থাকা উচিত। অন্যথায় জনপ্রিয়তায় ধস নামতে সময় নেয় না এবং চূড়ান্ত পরিণামে বিপর্যয়ও নেমে আসে। এর জ¦লন্ত উদাহরণ শেখ মুজিবের মর্মান্তিক অপসারণ।

এখন যাদের বয়স ৬০ এর ওপর তারা জানেন, ১৯৭১ সাল এবং তার অব্যবহিত পূর্বে শেখ মুজিবের ছিলো আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আসন বরাদ্দ ছিলো ১৬৯টি। শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সেখানে পায় ১৬৭টি আসন। পূর্ব পাকিস্তান আইনসভায় মোট ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন পায় আওয়ামী লীগ। তারপর মুক্তিযুদ্ধ এবং পরিশেষে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়।
শেখ মুজিব মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে পারেননি। কারণ, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টায় তিনি স্বেচ্ছায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধরা দেন। এখানে অনেকে প্রশ্ন করেন যে, শেখ মুজিব তাজউদ্দিনসহ অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতার মতো ঢাকা ছেড়ে আত্মগোপনে গেলেন না কেনো? কারণ, পাকিস্তান আর্মির হাতে ধরা পড়লে তার তো ফাঁসি হতে পারতো। কিন্তু এ সম্পর্কে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র বলে যে, শেখ মুজিব নিশ্চিত ছিলেন যে, পাকিস্তান আর্মির হাতে ধরা দিলে তার কোনো বিপদের আশঙ্কা নাই। কারণ, সেই সময়কার মার্কিন প্রশাসন জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে সাবধান করে দিয়েছিলেন যে, বন্দি অবস্থায় শেখ মুজিবের যেনো কোনো প্রকারের ক্ষতি না হয়। শেখ মুজিবের নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো তৎকালীন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ডকে। আর শেখ মুজিবকেও আমেরিকা আশ্বাস দিয়েছিলো যে, তিনি গ্রেফতার হলেও তার কোনো ক্ষতি তারা করতে দেবেন না।

একারণেই দেখা যায় যে, ২৫ মার্চ সন্ধ্যা থেকে শেখ মুজিবকে তৎকালীন ছাত্রনেতা আসম আব্দুর রব, সিরাজুল আলম খান এবং আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দিনসহ সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতারা রাত ১০টার আগে পর্যন্ত বার বার তাকে অনুরোধ করেন যে, তিনি যেনো এই মুহূর্তেই আত্মগোপনে চলে যান। উল্টো শেখ মুজিব তাদের সকলকে বলেন, কিছুক্ষণ পরেই পাক আর্মির ক্র্যাকডাউন শুরু হবে। তোরা এক্ষণই এখান থেকে সরে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যা। তিনি তাদেরকে আরো জানিয়েছিলেন যে, তারা ভারত চলে যাক। ভারতের সাথে সব ব্যবস্থা করা আছে। তিনি একটি ঠিকানাও দেন, যে ঠিকানায় আওয়ামী লীগ নেতারা ভারতে গিয়ে যোগাযোগ করবে।

আমার মূল পয়েন্ট এগুলি নয়। পাক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে শেখ মুজিবÑ এটি বাংলাদেশের জনগণ মেনে নিতে পারছিলেন না। তারা তার জীবনের আশঙ্কা করছিলেন। তখন মুজিবের জনপ্রিয়তা এত তুঙ্গে ছিলো যে, ঐ সময় অনেক প্রবীণ মানুষ তার নিরাপত্তার জন্য দোয়াও করেছেন।
এহেন পর্বতসমান জনপ্রিয়তার অধিকারী শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মধ্যে ধুলায় মিশে গেলো। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট রজনীর তৃতীয় প্রহরে শেখ মুজিব ও বেগম মুজিবসহ মুজিব পরিবারের ১৮ জন সদস্য নিহত হলেন। এতবড় বিয়োগান্তক ঘটনার পরেও আওয়ামী লীগের একটি মানুষকেও প্রতিবাদে রাস্তায় বের হতে দেখা যায়নি। এই জন্যই ইংরেজিতে রাজনীতি সম্পর্কে একটি জনপ্রিয় আপ্ত বাক্য আছে। সেটি হলো, ওহ ঢ়ড়ষরঃরপং পযববৎং ধহফ লববৎং মড় ংরসঁষঃধহবড়ঁংষু. অর্থাৎ রাজনীতিতে ফুলের মালা এবং জুতার মালা পাশাপাশি যায়।

॥দুই॥
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এই রকম কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব এখনো ঘটেনি। তবে বিগত ২ মাসে বিএনপি সরকার এমন কতগুলো কাজ করেছে যেগুলোর সমর্থন শুধুমাত্র বিএনপি ছাড়া আর কারো কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। আমার এই লেখাটাকে বিএনপি সরকার এবং দল ডধশব ঁঢ় পধষষ হিসাবে ধরে নিতে পারে। বড় বড় ভুলগুলো একটু পরে বলছি। প্রথমে ছোটখাটো দু’ একটি ভুল ধরিয়ে দেই।

জাগপার ভাইস প্রেসিডেন্ট রাশেদ প্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্পর্কে একটি কটুক্তি করেছেন। আমার কাছে সেটি মোটেই গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। আমি তার ঐ উক্তির তীব্র নিন্দা করছি। গত রবিবার ১৯ এপ্রিল রাশেদ প্রধান তার এই উক্তির জন্য ক্ষমাও প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু তার উক্তির প্রতিবাদ বিএনপির কি ওইভাবে করা উচিত ছিলো? এই উক্তির প্রতিবাদে বিএনপির (তারা ছাত্রদল বা যুবদল বা বিএনপি) প্রায় ৪০ জন কর্মী রাশেদ প্রধানের বাড়িতে গিয়ে শুধুমাত্র উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ও গালাগালিই করেনি, তারা ওই বাড়িতে ইট-পাটকেলও ছুঁড়েছে। রাশেদ প্রধানের পার্সোনাল এ্যাসিস্ট্যান্টকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে বলে অনলাইন পত্রপত্রিকায় দেখেছি।

সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো, তারা রাশেদ প্রধানের পিতা শফিউল আলম প্রধান সম্পর্কে এমন সব মন্তব্য করেছে যেগুলো তাদের মূর্খতার পরিচয় বহন করে। দেখা যাচ্ছে, পঞ্চগড়েও তারা একই রকম আরচণ করেছে। শফিউল আলম প্রধানকে রাজাকার এবং পাকিস্তানের দালাল বলে গালিগালাজ করা হয়েছে।
বিএনপির এই অংশটি শফিউল আলম প্রধান সম্পর্কে কী জানে? তিনি গান গাওয়া এবং সংস্কৃতি করা মুক্তিযোদ্ধা নন। অস্ত্র হাতে তিনি পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। দিনাজপুর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে আসে তার নেতৃত্বে। অথচ, তেমন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে বিএনপির এসব ছেলে পেলে রাজাকার বানিয়ে ছাড়লো। আমি এগুলো লিখতাম না, যদি পরবর্তীতে ওইসব উচ্ছৃঙ্খল ছেলেকে দল থেকে সাবধান করে দেওয়া হতো।

শফিউল আলম প্রধানকে রাজাকার বলা শুনে আমার মনে পড়ে ৯ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়ার কথা। আওয়ামী লীগ বিশেষ করে শেখ হাসিনা তার ১৫ বছরের অপশাসনে শহীদ জিয়া, মেজর জলিল প্রমুখ মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষ কমান্ডারদেরও রাজাকার এবং পাক বাহিনীর দালাল বলেছিল। অথচ, শেখ হাসিনা তখন ভুলে গিয়েছিলেন যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার পিতা যেমন বাংলাদেশে না থেকে পাকিস্তান ছিলেন, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি এবং তার বোন শেখ রেহানা বাংলাদেশে পাক সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় ছিলেন।

এধরনের আর একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছিলো মফস্বলের একটি জেলায়। গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা সভায় খেলাফত মজলিসের এক নেতা তার বক্তব্যে বলেন যে, মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবের প্রত্যক্ষ কোনো অবদান ছিলো না। কারণ, তিনি তখন ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি দেশে ফেরেন। এই বক্তব্য দেওয়ার অপরাধে ওই সভায় আওয়ামীপন্থী একশ্রেণীর লোক আপত্তি তুললে সভার সভাপতি জেলা প্রশাসক খেলাফত মজলিসের ওই বক্তাকে মঞ্চ থেকে নেমে যাওয়ার নির্দেশ দেন। বিএনপির শাসনামলেও যদি শেখ মুজিবকে নিয়ে এমন আনুগত্য দেখানো হয় তাহলে জুলাই বিপ্লবই অর্থহীন হয়ে পড়ে।

গত ১৯ এপ্রিল রোববার দৈনিক ‘যুগান্তরের’ শেষ পৃষ্ঠায় ৩ কলাম ব্যাপী একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে। সংবাদের শিরোনাম, ‘কুষ্টিয়ায় কথিত পীরকে পিটিয়ে হত্যা/ হামলায় সামনের সারিতে ছাত্রদল নেতাকর্মী’। ওই সংবাদে ১০ জন হামলাকারীর ছবি ছাপা হয়েছে। হামলাকারী ১০ জনের মধ্যে ৮ জনই ছাত্রদলের সদস্য। ছবিতে ওই ৮ জনকে গোল চিহ্ন দিয়ে শনাক্ত করা হয়েছে। ওরা হলো ছাত্রদলের সেক্রেটারি মারুফ, কর্মী শাওন, কর্মী কমল, যুবদল সদস্য রাসেল, সুজন, বিপ্লব, ছাত্রদল কর্মী মাহিম, যুবদল ক্যাডার মিঠুন।
ওই পীর ভন্ড হোক আর যাই হোক, প্রকাশ্য দিবালোকে একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার অধিকার কারো নাই। এই ধরনের নৃশংস কাজ করেছিলো আওয়ামী লীগ।

॥তিন॥
শুধুমাত্র ওপরে উল্লেখিত ঘটনাবলীর জন্য আমি ডধশব ঁঢ় পধষষ দেইনি। চলতি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সরকার একটি আইন পাস করেছে। আইনটির নাম হলো ব্যাংক রেজুলেশন আইন। ইন্টারিম সরকারের এসম্পর্কিত অধ্যাদেশ সংশোধন করে আলোচ্য আইনটি পাস করা হয়েছে। ইন্টারিম সরকারের অধ্যাদেশে এই সরকার যে সংশোধনী এনেছে সেখানে বলা হয়েছে যে, এসব ব্যাংকের প্রাক্তন মালিকরা আবার মালিকানা ফেরত পেতে পারেন যদি তারা পরিশোধিত মূলধনের সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করেন। অবশিষ্ট ৯২.৫ শতাংশ ১০ শতাংশ সরল সুদে ২ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ২০২৫ সালে ইন্টারিম সরকার যে অধ্যাদেশ জারি করেছিলো সেই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ৫টি দুর্বল এবং প্রায় দেউলিয়া ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত রাষ্ট্রায়াত্ত ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তর করা হয়। এই ব্যাংকগুলি হলো, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, স্যোশাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। এক্সিম ব্যাংকের মালিক ছিলেন নাসা গ্রুপের নজরুল ইসলাম মজুমদার। তিনিই ফেডারেশন অব চেম্বারের মিটিংয়ে আওয়াজ তুলেছিলেন, ‘এই মুহূর্তে দরকার / শেখ হাসিনার সরকার’। আর অবশিষ্ট ৪টি ব্যাংকের মালিক ছিলেন সেই মশহুর এস আলম গ্রুপের সাইফুল আলম। সাইফুল আলমের পরিচয় আর নতুন করে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

এই আইনটি পাস হওয়ার পর ১৯ এপ্রিল রবিবার মতিঝিলে কয়েকশত লোক সমবেত হয় এবং দুই ধরনের দাবি তোলে। একটি দাবি হলো, এস আলম যখন মালিক ছিলেন তখন তারা ওইসব ব্যাংকে চাকুরি করতেন। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হওয়ার পর তারা চাকুরি হারান। এখন তাদের চাকুরি ফেরত দিতে হবে। আর দ্বিতীয় দাবিটি হলো, অবিলম্বে ওই ৫টি ব্যাংক তাদের প্রাক্তন মালিকদেরকে ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের দাবি মেটানো এত সহজ বলে মনে হয় না। এটি একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যারা ঋণ নেওয়ার নামে এই ৫টি ব্যাংককে লুট করেছিলো তাদের ফেরত দেওয়ার যে সুযোগ রাখা হয়েছে সেটি শিক্ষিত সুধীজনদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো এই যে, এই সরকার একটি নির্বাচিত সরকার। দুই তৃতীয়াংশ মেজরিটি পেয়ে সরকার গঠিত হয়েছে। এমন জনপ্রিয় একটি সরকার জনগণের নাড়ির স্পন্দন শুনতে পাবে, এটিই মানুষের প্রত্যাশা।

তবে সুপ্রিমকোর্টে বিচারপতি নিয়োগ, সুপ্রিমকোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, গুম অর্ডিন্যান্স, মানবাধিকার অর্ডিন্যান্স ইত্যাদি অকার্যকর করার কাজগুলো কেনো করা হলো সেটি আজও জাতীয়তাবাদী এবং ইসালামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষদের বোধগম্য নয়। এসব অধ্যাদেশ অকার্যকর হয়ে যাওয়া এবং গণভোট, জুলাই সনদ ইত্যাদি বিষয়ে বারান্তরে আলোচনা করা যেতে পারে।

ঊসধরষ:লড়ঁৎহধষরংঃ১৫@মসধরষ.পড়স



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews