একটি জাতির ভবিষ্যৎ উন্নতি নির্ভর করে তার শিক্ষার্থীদের চরিত্র, জ্ঞান, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার ওপর। আজকের ছাত্ররাই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, শিক্ষক, বিচারক, সমাজসংস্কারক, ইমাম, মুফতি ও মুহাদ্দিস। তাই শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান উপায় হলো সুশৃঙ্খল নীতিমালা এবং মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা। কিন্তু বর্তমান সময়ে ‘শাসন’ শব্দটি নিয়ে সমাজে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শাসন নির্যাতনে রূপ নিচ্ছে, আবার কোথাও শাসনের অভাবে শিক্ষাঙ্গনে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান দেশের বাস্তবতা এবং ইসলামের আলোকে ছাত্রদের শাসনের বিষয়টি নতুনভাবে ভাবা জরুরি।
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রশাসনের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে শিক্ষক ও অভিভাবকের শাসনকে সন্তানদের কল্যাণের অংশ হিসেবে দেখা হতো; এখন অনেক ক্ষেত্রে তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কিছু শিক্ষক শারীরিক শাস্তির অপব্যবহার করছেন, যা সমাজে নিন্দিত এবং আইনগতভাবেও দণ্ডনীয়। ফলে অনেক শিক্ষক এখন ছাত্রদের সংশোধনের প্রয়োজনে ন্যূনতম কঠোরতাও দেখাতে সংকোচবোধ করেন। অন্যদিকে শাসনের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলাভঙ্গ, শিক্ষকের প্রতি অশ্রদ্ধা, সহিংসতা, মাদকাসক্তি, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও নৈতিক অবক্ষয় বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পারিবারিক অবহেলা এবং মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার অভাব শিক্ষার্থীদের আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে ছাত্রশাসন বিষয়টি বর্তমানে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। তাই সব ধরনের শাসনব্যবস্থা কল্যাণমুখী, ন্যায়সংগত ও মানবিক হওয়া সময়ের দাবি, ইমলামের বিধান।
ইসলাম শাসনকে প্রতিহিংসা বা দমননীতি হিসেবে দেখে না; বরং সংশোধন, চরিত্র গঠন ও কল্যাণের উপায় হিসেবে বিবেচনা করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো (সুরা আত তাহরিম-৬)।’ এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, অভিভাবক ও শিক্ষকের দায়িত্ব হলো অধীনস্থদের সঠিক পথে পরিচালিত করা। তবে প্রহার করা কেবল ব্যতিক্রমী ও সর্বশেষ উপায়। তা-ও কঠোর শর্তসাপেক্ষ। কোমলতা ও সদ্ব্যবহারই ইসলামে শাসনের মূলনীতি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো (সুরা আল বাকারাহ-৮৩)।’ রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় কোমলতা যে জিনিসে থাকে, তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে, আর যে জিনিস থেকে তা উঠিয়ে নেওয়া হয় তাকে কলুষিত করে।’ (সহিহ মুসলিম) রসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম শিক্ষক। তিনি কখনো শিক্ষার্থীদের অপমান বা নির্দয় আচরণ করেননি; বরং ভালোবাসা, প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের মাধ্যমে সংশোধন করতেন। ইসলাম কখনো অমানবিক, অপমানজনক বা ক্ষতিকর শাস্তিকে সমর্থন করে না। ছাত্র, সন্তান ও অধীনস্থকে এমনভাবে শাসন করা যাবে না, যাতে তার দেহে আঘাত লাগে, মানসিক ক্ষতি হয় বা তার আত্মসম্মান নষ্ট হয়। মুখমণ্ডলে আঘাত করা হারাম। দেহে ক্ষত, দাগ, ভাঙন সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ। রাগের মাথায় বা প্রতিশোধমূলক প্রহার বৈধ নয়। অপমান, গালি বা লাঞ্ছনা করা যাবে না। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ তার ভাইকে অপমান করবে না, কষ্ট দেবে না।’ অপর হাদিসে রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন মুখে আঘাত না করে।’ (সহিহ মুসলিম) ইসলাম মানবমর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভুল হলে প্রথমে উপদেশ, তারপর সতর্কতা, তারপর প্রয়োজন হলে সীমিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা, এই ধাপে এগোনোই ইসলামি নীতি। বর্তমান দেশের প্রেক্ষাপটে ছাত্রদের শাসনের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষক সম্মানিত থাকবেন, ছাত্র নিরাপদ থাকবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শৃঙ্খলাবদ্ধ হবে। আইন, মানবাধিকার ও ইসলামি মূল্যবোধ-এই তিনের সমন্বয়ে শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে যেন তারা আধুনিক মনোবিজ্ঞানসম্মত ও ইসলামি নৈতিকতার আলোকে ছাত্র পরিচালনা করতে পারেন। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। শিক্ষককে শত্রু নয়, সন্তান গঠনের সহযোদ্ধা হিসেবে দেখতে হবে।
শাসনহীন শিক্ষা যেমন ফলহীন, তেমনি নির্মম শাসন ধ্বংসাত্মক। ইসলামের শিক্ষা হলো, শাসন হবে ন্যায়সংগত, স্নেহপূর্ণ, প্রজ্ঞাভিত্তিক এবং সংশোধনমূলক। আজকের সমাজে ছাত্রদের শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, চরিত্রবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাদের শাসনের ভাষা বদলাতে হবে, রাগ থেকে রহমতে, কঠোরতা থেকে হিকমতে, দমন থেকে দিকনির্দেশনায়। ছাত্রদের প্রতি শিক্ষকের সুদৃষ্টি তাদের মেধা, চরিত্র ও নৈতিক বিকাশের প্রধান সহায়ক। একজন শিক্ষক যখন স্নেহ, মমতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে শিক্ষার্থীদের দেখভাল করেন, তখন ছাত্ররা আত্মবিশ্বাসী, শৃঙ্খলাবান ও শিক্ষানুরাগী হয়ে ওঠে। অনুশাসন শিক্ষার্থীদের জীবনকে সুশৃঙ্খল করে, সময়ানুবর্তিতা শেখায় এবং ভুল পথ থেকে রক্ষা করে। সুদৃষ্টি ও অনুশাসনের সমন্বয়েই একজন ছাত্র আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। তবে তা সীমালঙ্ঘনের মাধ্যমে নয়। হবে সহনশীলতার মাধ্যমে।
লেখক : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা