দুবাইয়ে পুলিশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারের খবর প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনায় আসে তার নানা অপকর্ম ও দুর্নীতির ঘটনা। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে- কোন মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হলো এবং কোন মামলার সূত্র ধরে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করেছিল। দুদক বলছে, তার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলার মধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে করা মামলায় আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। পরে সেই পরোয়ানার ভিত্তিতে আইজিপির মাধ্যমে ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়। দীর্ঘ আইনি ও আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত ইন্টারপোলের জালে ধরা পড়েন একসময় দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সাবেক এই আইজিপি। দুদক সূত্রে জানা গেছে, আজ (মঙ্গলবার) বেনজীরের প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র দুদক থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে।
এদিকে বিএনপি সরকারের চার মাসের মাথায় বেনজীরের গ্রেফতার বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বলে আখ্যা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো বাংলাদেশকে জানায় যে, দুর্নীতির মামলায় বেনজীরকে তাদের পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তিনি সেখানে আটক আছেন। দুদকের নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ১১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এর মধ্যে বেনজীরের বিরুদ্ধে করা মামলাটি দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় রুজু করা হয়। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। এ মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই বেনজীরকে গ্রেফতার করে ইন্টারপোল।
আদালতের অনুমতি চায় দুদক : মামলার পর তদন্ত কর্মকর্তা করা হয় দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামকে। তদন্তকালে বেনজীর আহমেদ দেশে অনুপস্থিত থাকায় তাকে গ্রেফতারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি হাফিজুল ইসলাম আদালতে আবেদন করে জানান, বেনজীর বিদেশে অবস্থান করছেন এবং বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে তাকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতার করা প্রয়োজন। পরে আদালত বেনজীরের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
আইজিপির কাছে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদন : আদালতের পরোয়ানা পাওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তা মো. হাফিজুল ইসলাম ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আইজিপি বরাবর আরেকটি আবেদন করেন। সেখানে বেনজীরের বিরুদ্ধে জারি হওয়া পরোয়ানা, মামলার বিবরণ, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট নম্বর ও অন্যান্য তথ্য সংযুক্ত করে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়। দুদকের ওই আবেদনের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকা বিষয়টি ইন্টারপোলে পাঠায়।
এরপর রেড নোটিশ জারি : ইন্টারপোল প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল রেড নোটিশ জারি করে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ডাটাবেজে তার তথ্য যুক্ত হয়। পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের নজরে আসেন তিনি।
প্রত্যর্পণের অপেক্ষায় দুদক : দুদক সূত্র জানিয়েছে, দুবাইয়ে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে বেনজীরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। আমিরাতের আইন অনুযায়ী, গ্রেফতারের ৩০ দিনের মধ্যেই বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ আবেদন পাঠাতে হবে। দুদক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর যৌথভাবে সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। আজ বেনজীরের প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র দুদক থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে।
বেনজীরের বিরুদ্ধে আরও মামলা যে পর্যায়ে : আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার ও পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধান শেষে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মোট ছয়টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে তিন মামলায় বেনজীর প্রধান আসামি। স্ত্রী জীসান মির্জা এবং দুই মেয়ে ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইশা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে করা পৃথক তিন মামলায় তাকে সহযোগী আসামি করা হয়েছে। ছয় মামলার মধ্যে বর্তমানে পাঁচটি তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে ১০টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
অবৈধ সম্পদের মামলায় বিচার চলছে : ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর করা মামলায় বেনজীরের বিরুদ্ধে ১১ কোটি চার লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনে দুদক। মামলাটিতে ইতোমধ্যে অভিযোগ গঠন হয়েছে এবং সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্যও গ্রহণ করা হয়েছে। এ মামলাতেই তাকে আটক করে ইন্টারপোল।
পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলা : ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় নিজেকে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ দেখিয়ে পাসপোর্ট নেওয়ার অভিযোগে বেনজীরসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। অভিযোগ অনুযায়ী, র্যাব মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনার ও অতিরিক্ত আইজিপি পদে কর্মরত থাকলেও তিনি এনওসি ছাড়াই একাধিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেন।
অর্থ পাচারের মামলা : ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বেনজীর, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মামলা করে দুদক। মামলায় বলা হয়, অবৈধভাবে অর্জিত অন্তত ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার উৎস, মালিকানা ও অবস্থান গোপন করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।
স্ত্রী জীসান মির্জার বিরুদ্ধে মামলা : বেনজীরের স্ত্রী জীসান মির্জার বিরুদ্ধে ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে মামলা রয়েছে। এ মামলায় সহযোগী আসামি বেনজীর আহমেদ।
বড় মেয়ের বিরুদ্ধে মামলা : ফারহীন রিশতা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে আট কোটি ৭৫ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করেছে দুদক। এ মামলাতেও সহযোগী আসামি বেনজীর।
ছোট মেয়ের বিরুদ্ধে মামলা : তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে পাঁচ কোটি ৫৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। এ মামলাতেও বেনজীরকে সহযোগী আসামি করা হয়েছে।