উচ্চশিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগের বিকল্প নেই। তবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা করলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই বর্ধিত বাজেটের সুফল কি কেবল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই ভোগ করবে, নাকি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও এর আওতায় আনা হবে? যদি রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের সুবিধা একমাত্র সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাধ্যমে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সীমিত আসনসংখ্যার কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে বাধ্য হয়। এসব শিক্ষার্থীর পরিবারও রাষ্ট্রের করদাতা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে সমানভাবে অবদান রাখে। ফলে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের সুফল থেকে তাদের সম্পূর্ণ বঞ্চিত রাখা ন্যায়সঙ্গত নয়। বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যক্ষ সরকারি অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থে পরিচালিত হয়, উন্নয়ন প্রকল্প ও গবেষণা অনুদানের সুবিধা পায়, সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি ও নিজস্ব আয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে বাজেট ও নীতিগত সহায়তার ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে।

উচ্চশিক্ষার প্রাণশক্তি হলো গবেষণা। অথচ, এক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোশকতায় বৈষম্য রয়েছে। জাতীয় বাজেট কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে গবেষণার জন্য যে বিপুল তহবিল বরাদ্দ করা হয়, তার অধিকাংশই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে যায়। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদ-ে বিভিন্ন বৈশ্বিক সূচকের নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করেছে। তবুও তারা সরকারি গবেষণা অনুদান, উদ্ভাবনী প্রকল্প কিংবা প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা তহবিলে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হয়।
যদি গবেষণা অনুদান, ল্যাবরেটরি উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শিক্ষার্থী বৃত্তির মতো সুবিধা শুধুমাত্র সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সংরক্ষিত থাকে, তাহলে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান আরও বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, সরকারকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন ব্যয় বহন করতে হবে। বরং একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোর মাধ্যমে গবেষণা তহবিল, উদ্ভাবন অনুদান, শিক্ষার্থী বৃত্তি এবং অবকাঠামো উন্নয়ন সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ই যোগ্যতার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করবে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং উচ্চশিক্ষার মানও উন্নত হবে।

একইভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বৈষম্য স্পষ্ট। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত করতে স্থায়ী ক্যাম্পাস, আধুনিক গবেষণাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ, খেলার মাঠ, অডিটোরিয়াম এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন হয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব উন্নয়নের জন্য সরাসরি উন্নয়ন বাজেট ও মেগাপ্রকল্পের সুবিধা পায়। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে এই ব্যয় বহন করতে হয়। এর ফলে তাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে।

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে যে পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করা হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেই সুবিধার সামান্য অংশও পায় না। অথচ, উভয় ক্ষেত্রের শিক্ষার্থীরাই দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে সমান ভূমিকা রাখছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর ও ভ্যাট সংক্রান্ত নীতি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইনগতভাবে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে তাদের ওপর কর বা ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব সামনে আসে, যা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে গবেষণা, উদ্ভাবন ও উন্নয়ন কার্যক্রম এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

শিক্ষা একটি মৌলিক জনকল্যাণমূলক খাত। তাই যেখানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন, সেখানে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা কার্যত বঞ্চনার শামিল। অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার প্রবণতাও এই বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।শিক্ষা যেহেতু একটি জনকল্যাণমূলক খাত, তাই এই খাতে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি না করে বরং উৎসাহমূলক নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

নীতিগত সুযোগের ক্ষেত্রেও অনেক সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে থাকে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও পিএইচডি প্রোগ্রাম পরিচালনা, আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা কিংবা বিভিন্ন একাডেমিক সুবিধা অর্জনের ক্ষেত্রে তারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমপর্যায়ের সুযোগ পায় না। ফলে উচ্চশিক্ষার প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাজেটের আওতায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য দেশে-বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও ফেলোশিপের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা সেসব সুযোগে তুলনামূলকভাবে কম অংশগ্রহণ করতে পারে। এতে মানবসম্পদ উন্নয়নের সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা নয়, বরং গবেষণার মান, উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং জাতীয় উন্নয়নে অবদানই অর্থায়নের প্রধান মানদ- হবে। জাতীয় উচ্চশিক্ষার উন্নয়নকে শুধুমাত্র সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক চিন্তা করলে কাক্সিক্ষত ফল অর্জন করা সম্ভব হবে না। সরকারি ও বেসরকারিÑ উভয় খাতকে সমান গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত উচ্চশিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্য না করে গবেষণার মান, উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং জাতীয় প্রয়োজনের ভিত্তিতে অনুদান প্রদানের জন্য একটি কেন্দ্রীয় জাতীয় গবেষণা তহবিল গঠন করা যেতে পারে। যেখানে সরকারি ও বেসরকারিÑ উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সমানভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। স্থায়ী ক্যাম্পাস, গবেষণাগার ও প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদে ঋণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সেমিনার ও গবেষণা কর্মসূচিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নির্দিষ্ট অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যেতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশেই উচ্চশিক্ষা অর্থায়নের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বিভাজন করা হয় না। বরং গবেষণার গুণগত মান, উদ্ভাবন এবং সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদানের ভিত্তিতে অর্থায়ন করা হয়। বাংলাদেশেও সময়ের দাবি হলো এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উচ্চশিক্ষা নীতি, যেখানে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং উন্নয়ন কর্মী



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews