বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই নীতিগত পরিবর্তন ও বাস্তবায়নের টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন সরকারের কিছু ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত শিক্ষাক্ষেত্রে একটি গতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়। তবে প্রশ্ন হলো—এই গতি কি সত্যিই কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে, নাকি শুধুই খণ্ডিত নীতি প্রয়োগে সীমাবদ্ধ থাকবে?

সংক্ষিপ্ত সময়ে ভর্তি পদ্ধতি, পরীক্ষা সূচি, পাঠ্যক্রম এবং ব্যবস্থাপনায় একাধিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লটারি পদ্ধতির পরিবর্তে পরীক্ষাভিত্তিক ভর্তি, এসএসসি পরীক্ষা ডিসেম্বর মাসে স্থানান্তর এবং বিষয়সংখ্যা পুনর্বিন্যাস—এসব পদক্ষেপ শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও ফলাফলমুখী করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা ও নতুন ভাষা অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দক্ষতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্য প্রকাশ করে।

তবে ভর্তি ব্যবস্থার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত প্রশ্ন উত্থিত হয়—প্রবেশপথ পরিবর্তন করলে কি শিক্ষার সামগ্রিক মান উন্নত হবে? পরীক্ষাভিত্তিক ভর্তি মেধা যাচাইয়ের সুযোগ দেয়, কিন্তু এটি প্রস্তুতিনির্ভর বৈষম্যও বাড়াতে পারে। ফলে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু ভর্তি পদ্ধতি নয়, বিদ্যালয়গুলোর মানের পার্থক্যও সমানভাবে বিবেচনায় আনা দরকার। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এলাকাভিত্তিক ভর্তি একটি বিকল্প হতে পারে, তবে এর জন্য স্কুলগুলোর ন্যূনতম মান সমতা নিশ্চিত করতে হবে।

পরীক্ষা ও পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন প্রশাসনিক শৃঙ্খলা আনতে পারে। ডিসেম্বর মাসে এসএসসি পরীক্ষা আয়োজন শিক্ষাবর্ষকে পূর্বানুমেয় করতে সহায়ক হতে পারে, আর বিষয়সংখ্যা কমানো শিক্ষার্থীদের চাপ হ্রাসের লক্ষ্য বহন করে। তবে প্রশ্ন থাকে—সীমিত সময়ে পাঠ্যক্রম শেষ করা শিক্ষার গভীরতাকে কমিয়ে দেবে কিনা। অতিরিক্ত সময়সংকোচন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের ওপরই চাপ তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত মুখস্থনির্ভরতার প্রবণতা বাড়াতে পারে।

শিক্ষাক্ষেত্রে নীতিগত পরিবর্তনের একটি গতি তৈরি হয়েছে, তবে এটি এখনও পূর্ণাঙ্গ কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত নয়। ভর্তি, পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন এবং ব্যবস্থাপনার মধ্যে আন্তঃসংযোগ ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠিত হলে, এবং শিক্ষক উন্নয়ন, অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে, এই গতি শিক্ষার মান উন্নয়নে বাস্তব ও টেকসই প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে। সঠিক পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার শিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দিকে এগোতে পারে, যা শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ের জন্যই সুফল বয়ে আনবে।

শিক্ষক প্রস্তুতি এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয়। পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন ও পরীক্ষা কাঠামোর যে কোনো পরিবর্তন কার্যকর হয় তখনই, যখন শিক্ষকরা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠদান করতে সক্ষম হন। অভিন্ন প্রশ্নপত্র শিক্ষায় মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে, তবে শিক্ষার গুণগত দিক নির্ভর করে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রশ্ন প্রণয়ন দক্ষতা এবং শিক্ষণ পদ্ধতির ওপর।

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর আদেশ অনুযায়ী মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের জন্য প্রায় দুই মাসের লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন (LAISE) বেসিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করেছে। তবে শিক্ষক সংকট এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করলে, এককালীন, দীর্ঘমেয়াদি বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ (content-based training) সব চ্যালেঞ্জ সমাধান করতে পারবে না। বরং যুক্তরাজ্যের QTS (UK) মডেলের মতো কাঠামোবদ্ধ, তত্ত্বাবধানকৃত এবং সক্ষমতা-ভিত্তিক (competency-based) প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা শিক্ষকদের টিচিং কোয়ালিফিকেশন বা লাইসেন্স নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায়, ফাউন্ডেশন ট্রেনিং, TTC-ভিত্তিক আবাসিক কোর্স এবং উন্নয়ন অংশীদারদের (যেমন: ইউনেস্কো, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, এডিবি) সংক্ষিপ্ত কোর্সগুলো জ্ঞান প্রদানে কিছুটা সফল হলেও ব্যবহারিক ক্লাসরুম দক্ষতা, পরামর্শদান, ক্রমাগত পেশাগত উন্নয়ন (CPD) এবং লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় সীমিত প্রভাব ফেলেছে।

সাথে সাথে, PISA ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন কাঠামো থেকে শিক্ষা নিয়ে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও শিক্ষার মান উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে। প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও ভারসাম্যের প্রশ্ন আসে। স্কুল ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ বাড়ানো ইতিবাচক, তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সমানভাবে শক্তিশালী না হলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসা কঠিন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব শুধুই প্রশাসনিক নয়, এটি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মান রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত।

কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর এবং নতুন ভাষা অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে। এগুলো শিক্ষাকে শ্রমবাজারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে পারে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, দক্ষ জনবল এবং অবকাঠামোগত সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। বাজেট বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের ইতিবাচক বার্তা দেয়, তবে কার্যকারিতা নির্ভর করবে বণ্টন ও ব্যবহার পদ্ধতির ওপর। বিশেষ করে প্রান্তিক অঞ্চল, শিক্ষকসংকট এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষায় লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে দেখা যায়— শিক্ষাক্ষেত্রে নীতিগত পরিবর্তনের একটি গতি তৈরি হয়েছে, তবে এটি এখনও পূর্ণাঙ্গ কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত নয়। ভর্তি, পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন এবং ব্যবস্থাপনার মধ্যে আন্তঃসংযোগ ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠিত হলে, এবং শিক্ষক উন্নয়ন, অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে, এই গতি শিক্ষার মান উন্নয়নে বাস্তব ও টেকসই প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে। সঠিক পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার শিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দিকে এগোতে পারে, যা শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ের জন্যই সুফল বয়ে আনবে।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের হায়ার এডুকেশন অ্যাকাডেমির ফেলো।

[email protected]

এইচআর/জেআইএম



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews