ছোটবেলায় বর্ষাকাল মানেই ছিল এক অন্যরকম অনুভূতি। আকাশ জুড়ে কালো মেঘ, ঝড়ো হাওয়া, টানা বৃষ্টি আর নদীর ফুলে-ফেঁপে ওঠা এসব ছিল আমাদের জীবনের খুবই পরিচিত দৃশ্য। তখন ঝড়-ঝঞ্ঝা ও বন্যা ছিল নিয়মিত ঘটনা। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ আমাদের ভয় পাইয়ে দিতো, কিন্তু একই সঙ্গে শিখিয়ে দিতো মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা। আর এই শিক্ষা আমরা পেয়েছি আমাদের পরিবার থেকে।

বন্যার পানি যখন গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে যেতো, তখন মানুষের ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু সবকিছুই হুমকির মুখে পড়তো। অনেক পরিবার আশ্রয় নিতো স্কুল, মাদ্রাসা কিংবা উঁচু স্থানে। সেই সময় আমাদের পরিবার, প্রতিবেশী ও গ্রামের মানুষ একসঙ্গে এগিয়ে আসতো। কেউ শুকনো খাবার দিতো, কেউ রান্না করে খাওয়াতো, কেউ কাপড় সংগ্রহ করতো, আবার কেউ নৌকা নিয়ে দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছে যেতো। ছোট হলেও আমরা যার যা সামর্থ্য ছিল, তা নিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতাম। কখনো খাবার পৌঁছে দিয়েছি, কখনো ত্রাণ বিতরণে বড়দের সহায়তা করেছি, আবার কখনো আশ্রয়কেন্দ্রে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। আমার মনে পড়ে আমরা স্কুলের ছেলেমেয়েরা পুরনো কাপড় সংগ্রহ করতাম। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাল-ডাল সংগ্রহ করতাম। সবাই অল্প অল্প করে দিতেন কিন্তু সেগুলো যখন এক জায়গায় করা হতো সেগুলো পরিমাণে অনেক হয়ে যেতো। আমরা দলবেঁধে গান গেয়ে ত্রাণ সংগ্রহ করেছি। এগুলো এখনো স্মৃতি হয়ে ভাসে। আমার মা প্রখ্যাত লেখক রাবেয়া খাতুন আমাদেরকে উৎসাহ দিতেন। তিনি বলতেন অসহায়ের পাশে দাঁড়াতে হয়। আল্লাহ খুশি হন।

তখন হয়তো আমাদের হাতে আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ছিল না। কিন্তু ছিল আন্তরিকতা, প্রতিবেশীর প্রতি দায়বদ্ধতা এবং একে অপরের প্রতি গভীর সহমর্মিতা। বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করা যে মানবিক কর্তব্য এই শিক্ষা আমরা বই থেকে নয়, বাস্তব জীবন থেকেই পেয়েছি। এখন সময় অনেক বদলেছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রযুক্তি, আগাম সতর্কবার্তা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বেড়েছে। আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট আছে তবুও একটি বিষয় অপরিবর্তিত রয়েছে। মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব। কোনো দুর্যোগে সরকারি উদ্যোগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্যোগও সমান প্রয়োজন। কারণ বিপদের সময় একটি সহানুভূতির হাত, একটি খাবারের প্যাকেট বা একটি নিরাপদ আশ্রয় একজন মানুষের কাছে নতুন আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।

আমাদের ছোটবেলার সেই অভিজ্ঞতাগুলো আজও মনে করিয়ে দেয়, দুর্যোগ শুধু ক্ষয়ক্ষতির গল্প নয়; এটি মানবতারও এক বড় পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় আমরা দেখেছি, ‘মানুষ মানুষের জন্য’-এই কথাটি কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং এটি জীবন্ত সত্য। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও এই মানবিক মূল্যবোধ পৌঁছে দেয়াই আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।

সেই সময় আমরা দেখেছি, দুর্যোগ মানুষের ভেতরের মানবিকতাকে জাগিয়ে তোলে। কোনো পরিবার খাবারহীন থাকলে পাশের বাড়ি থেকে হাঁড়িভর্তি ভাত পৌঁছে যেতো। কারও ঘর ভেঙে গেলে প্রতিবেশীরা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে নতুন করে ঘর তুলতে সাহায্য করতো। গ্রামের যুবকেরা নৌকা নিয়ে আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতো। মসজিদ, স্কুল কিংবা উঁচু জায়গাগুলো হয়ে উঠতো আশ্রয়কেন্দ্র। সেখানে ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ থাকতো না; সবাই ছিল একই দুর্যোগের মানুষ। এখন অনেক আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেয় দুর্যোগে আক্রান্তরা।

আমরাও সে সময়ে বড়দের সঙ্গে শুকনো খাবার, পুরনো কাপড়, বিশুদ্ধ পানি কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে দুর্গত মানুষের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। হয়তো আমাদের সাহায্য খুব বড় কিছু ছিল না, কিন্তু আন্তরিকতা ছিল অফুরন্ত। সেই ছোট ছোট কাজগুলোই আমাদের শিখিয়েছে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা।

প্রকৃতির দুর্যোগ থামানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কষ্ট কিছুটা লাঘব করা অবশ্যই সম্ভব। সেটি হতে পারে একটি খাবারের প্যাকেট, একটি কম্বল, একটি ওষুধ, কিংবা শুধু সাহস জোগানো কয়েকটি কথা। মানবতার শক্তি এখানেই সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের পাশে দাঁড়ানো। আমাদের মুখে মুখে উচ্চারিত একটি অদৃশ্য প্রতিজ্ঞা আমরা একে অপরকে ছেড়ে যাবো না। হাতে হাত রেখে অসহায়ের পাশে থাকবো।

আমরা যখন মানবিক কাজ করেছি তখন এইসব প্রযুক্তি ছিল না। ছিল না এত প্রচারের ব্যবস্থা। আমার আম্মা বলতেন কাউকে দান করলে প্রচারের প্রয়োজন নেই। আমাদের ইসলাম ধর্মেও আছে ডানহাতে দান করলে বামহাত জানবে না। আমরাও সেই নীতিতে কাজ করতাম। কিন্তু এখন দেখা যায় কেউ কিছু দান করলে আগে থেকেই একটি ক্যামেরা রেডি করে রেখেছে প্রচারের জন্য। আমাদের উচিত ক্যামেরার সামনে নয় পেছন থেকেই কাজ করা প্রয়োজন। প্রচার নয়, প্রয়োজন মানবিক কাজটি ঠিকমতো করতে পেরেছি কিনা। আজকের প্রজন্মের কাছে আমাদের সেই স্মৃতিগুলো শুধু অতীতের গল্প নয়; এগুলো মানবিকতার উত্তরাধিকার। দুর্যোগ আসবে, প্রকৃতি তার নিয়মে চলবে। কিন্তু মানুষ যদি মানুষের পাশে থাকে, তবে কোনো দুর্যোগই আমাদের মানবিক শক্তিকে পরাজিত করতে পারবে না। তাই ক্যামেরার জন্য অপেক্ষা নয়। আমরা আমাদের মানবতার হাত বাড়িয়ে দেবো সেই মানুষের দিকে যারা অসহায়ভাবে দিনযাপন করছে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews