ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন উৎসবমুখর পরিবেশ ধরে রাখতে চায় বিএনপি। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র এবং ভোট বিতর্কিত করার চক্রান্ত প্রতিহতে সতর্ক থাকবেন দলটির নেতাকর্মীরা। চূড়ান্ত ফলাফলের শিট নিয়ে দলীয় পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র ত্যাগ করাসহ বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সুশৃঙ্খলভাবে ফজরের নামাজ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আদায় ও শেষ পর্যন্ত নেতাকর্মীদের পাহারা দিতে বলা হয়েছে। কেউ যাতে কেন্দ্র দখল, বিশৃঙ্খলা ও জাল ভোট দিতে না পারে-সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকবেন তারা। এছাড়া ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সবকিছু করারও বার্তা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে-অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সব ধরনের সহযোগিতা করবে দলটি। বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিএনপির নেতারা মনে করছেন, ২২ জানুয়ারি থেকে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচারণার ধানের শীষের পক্ষে সারা দেশে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। উৎসবমুখর এই সময়ে দেশি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ধারাবাহিক প্রতিবেদন, বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান ও জরিপের ফলাফল, তারেক রহমানের নির্বাচনি জনসভায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও বিপুল উপস্থিতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মিলিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, জনসমর্থনের দিক থেকে বিএনপি সর্বোচ্চ পর্যায়েই রয়েছে। সারা দেশে ধানের শীষের পক্ষে ঢেউ উঠেছে বলেও দলটি মনে করে। এমন পরিস্থিতিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় অনিবার্য বলে তারা ধরে নিয়েছেন। বিএনপির পক্ষে এই গণজোয়ার দেখে একটি গোষ্ঠী ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা করতে পারে বলেও ধারণা করছেন তারা। এজন্য সারা দেশের নেতাকর্মীদের কাছে কিছু নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
দলটির নেতারা জানান, বিএনপি একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। সেজন্যই অন্তর্বর্তী সরকারকে এ ব্যাপারে সব সময়ই সহযোগিতা করে আসছে। আসনভিত্তিকও নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে, যাতে সুষ্ঠু ভোটের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হয়। তারপরও ভোটের দিন কেউ কেউ যাতে কারচুপি ও বিশৃঙ্খলা করতে না পারে সেজন্য কেন্দ্রে পাহারাদারের ভূমিকায় থাকবেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এছাড়া যে কোনো ভাবেই হোক কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিত বাড়াতে চায় দলটি। সেজন্য প্রয়োজনে সেদিন ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য তারা বাড়ি বাড়ি যাবেন।
সোমবার রাজধানীতে এক জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংসদ নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র রুখে দিতে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভোটের দিন সকাল থেকে ভোটকেন্দ্রে থাকবেন। ফজরের নামাজ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আদায় করবেন। ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে যাবেন, যাতে কেউ ষড়যন্ত্র করে কিছু করতে না পারেন। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, শুধু ভোট দিলেই চলবে না, ভোট দিয়ে চলে আসবেন না। ভোট বুঝে নিয়ে আসবেন। হিসাব বুঝে নিয়ে আসবেন। শেষ পর্যন্ত পাহারা দিতে হবে। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন যুগান্তরকে বলেন, বিএনপির অবশ্যম্ভাবী বিজয় নস্যাৎ করতে যত অপপ্রচার, ষড়যন্ত্র, অর্থনৈতিক লেনদেন ও সহিংসতাই করা হোক না কেন, গণতন্ত্রকামী জনগণ তা রুখে দিয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে।
পোলিং এজেন্টদের জন্য বিশেষ বার্তা : এদিকে, দলীয় পোলিং এজেন্টদের জন্য সব আসনে বিশেষ বার্তা দিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও তৈরি করেছে, যা প্রার্থীরা তাদের ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। সেখানে পোলিং এজন্টদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচনের দিন আপনার দায়িত্ব শুরু হবে ভোট শুরু হওয়ার অন্তত ১ ঘণ্টা আগে। কেন্দ্রে পৌঁছে প্রথমেই প্রিসাইডিং অফিসারের সঙ্গে পরিচয়পর্ব শেষ করুন। সবার উপস্থিতিতে ব্যালট বক্সগুলো খালি কিনা তা দেখে নিন এবং বক্সের মুখ লক বা সিল দিয়ে বন্ধ করা নিশ্চিত করুন। ব্যালট পেপার বণ্টনের সময় পোলিং এজেন্ট তার নোটবুকে ব্যালট পেপারের শুরুর ও শেষের ক্রমিক নম্বর নোট করে রাখবেন। ভোট শুরু হওয়ার আগে প্রতি বুথে ভোটার সংখ্যার হিসাব অবশ্যই দেখে নিতে হবে। ভোট চলাকালীন প্রধান কাজ হলো সঠিক ভোটার শনাক্ত করা। ভোটারের নাম ও এনআইডি নম্বর আপনার তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে নিন। মৃত বা প্রবাসী ভোটারদের নামের পাশে আগে থেকেই চিহ্ন দিয়ে রাখুন, যেন কেউ জাল ভোট দিতে না পারে।’ বিশেষ বার্তায় আরও বলা হয়, ‘নারী ভোটারদের পরিচয় শনাক্তে পর্দা বজায় রেখে পরিচয় নিশ্চিত করুন। নিশ্চিত হোন যে একজন ভোটার শুধু একটি ভোটই দিচ্ছেন। এছাড়া আঙুলে অমোচনীয় কালির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। জাল ভোটার শনাক্তকরণে বিশেষ সতকর্তা ও গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো ব্যালট বক্স পূর্ণ হয়ে গেলে সেটি নির্বাচনি কর্মকর্তার মাধ্যমে সিল করতে হবে। ভোট গণনার পূর্বে বুথ ভিত্তিক এজেন্টরা তাদের নির্ধারিত ফর্মে ব্যালট ও ব্যালট বাক্সের হিসাব ভোটকেন্দ্রের প্রধান এজেন্টকে বুঝিয়ে দেবেন। গণনায় কোনো গরমিল বা অতিরিক্ত ভোট দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানান। হিসাবের চেয়ে ফলাফল বেশি হলে তা বাতিলের জন্য প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে আবেদন করুন। ভোটগ্রহণ শেষের আগে কোনোভাবেই ব্যালট বাক্স অন্য রুমে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।’ বিশেষ বার্তায় আরও বলা হয়, ‘ভোট শেষ হওয়া মাত্রই গণনা শুরু হবে। প্রতিটি প্রতীকের বান্ডিল আলাদাভাবে গুনে নিন। ব্যালটের পেছনে নির্বাচনি কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ও সিল চেক করুন। কোনো প্রতীকের ভেতরে যেন অন্য প্রতীকের ব্যালট চলে না আসে। কোনো গরমিল দেখলে সঙ্গে সঙ্গে লিখিত আপত্তি জানান এবং পুনরায় গণনার অনুরোধ করুন। অস্বাভাবিক বেশি ফলাফল বাতিলের জন্য আবেদন করুন। গণনা শেষে নির্ভুল ফলাফল শিট তৈরি হলে তবেই তাতে স্বাক্ষর করুন।
সংগৃহীত ফলাফলের ছবি সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনি এজেন্টকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় বিশেষ বার্তায়।