দেশের প্রাচীন ইতিহাসের অন্যতম স্মারক মহাস্থানগড় শুধু একটি প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়; এটি সভ্যতা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় বিকাশের এক গৌরবময় প্রতীক। তাই শিবগঞ্জ উপজেলার নাম পরিবর্তন করে ‘মহাস্থান উপজেলা’ করার দাবি কোনো আবেগনির্ভর প্রস্তাব নয়; বরং ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, ঐতিহ্যের যথাযথ স্বীকৃতি এবং জাতীয় আত্মপরিচয়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি ন্যায্য ও সময়োপযোগী দাবি।

একটি জাতির আত্মপরিচয় কেবল তার বর্তমানের অর্জনে নির্মিত হয় না; বরং তা গড়ে ওঠে তার অতীতের স্মৃতি, ঐতিহ্য এবং সভ্যতার ধারাবাহিকতার ওপর। যে জাতি তার ইতিহাসকে সম্মান করে, সে জাতিই ভবিষ্যতের পথে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু স্থান রয়েছে, যেগুলো কেবল ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জাতীয় চেতনা, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং সভ্যতার বিকাশের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মহাস্থানগড় নিঃসন্দেহে সেই বিরল ঐতিহাসিক জনপদগুলোর অন্যতম।

প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী মহাস্থানগড় শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন নগরসভ্যতার এক অনন্য নিদর্শন। প্রাচীন পু-্রনগরের রাজধানী হিসেবে এর পরিচিতি ইতিহাসের পাতায় সুপ্রতিষ্ঠিত। এই জনপদের মাটির নিচে লুকিয়ে আছে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন এবং মুসলিম আমলের অসংখ্য স্মারক, যা যুগে যুগে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের নীরব সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। ইতিহাসবিদদের কাছে মহাস্থান কেবল একটি প্রতœতাত্ত্বিক স্থান নয়; এটি জাতির রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রাচীনতম ভিত্তিগুলোর একটি।

কিন্তু এক গভীর বৈপরীত্য আজও আমাদের সামনে বিদ্যমান। যে মহাস্থানগড় বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত ঐতিহাসিক নাম, সেই জনপদের প্রশাসনিক পরিচয় এখনও ‘শিবগঞ্জ’ নামের আড়ালে রয়ে গেছে। ফলে ইতিহাসের সঙ্গে প্রশাসনিক বাস্তবতার একটি অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতা শুধু ঐতিহাসিক মর্যাদার প্রশ্নই নয়, বরং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নও বটে।

একটি অঞ্চলের নাম তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো তাদের ঐতিহাসিক জনপদগুলোর নাম ও পরিচয় সংরক্ষণে অত্যন্ত সচেতন। কারণ তারা উপলব্ধি করে, নাম কেবল একটি শব্দ নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের বাহক। সেই বিবেচনায় “মহাস্থান উপজেলা” নামকরণ কোনো নতুন পরিচয় সৃষ্টির উদ্যোগ নয়; বরং হারিয়ে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়াস।

মহাস্থানের গুরুত্ব শুধু ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের অবদান অনস্বীকার্য। মহাস্থান শিলালিপি প্রাচীন বাংলার ভাষাগত ঐতিহ্যের এক মূল্যবান দলিল। যুগে যুগে এই অঞ্চল শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর স্বীকৃতি রয়েছে; ২০১৬ সালে মহাস্থানকে সার্ক সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তাই প্রশাসনিক পরিচয়ে ‘মহাস্থান’ নামের অন্তর্ভুক্তি ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনেরই শামিল।
প্রশাসনিক যুক্তিও এখানে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাংলাদেশে একাধিক উপজেলার নাম শিবগঞ্জ হওয়ায় বিভিন্ন সময় সরকারি নথিপত্র, ডাকব্যবস্থা, তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। ‘মহাস্থান’ নামটি যেমন স্বতন্ত্র, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। ফলে এ নাম প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে এবং এলাকার স্বকীয় পরিচয়কে আরও সুদৃঢ় করবে।

পর্যটন অর্থনীতি ও উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বে ইতিহাস ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচিত। মহাস্থানগড় ইতোমধ্যেই দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রতœতাত্ত্বিক ও পর্যটন কেন্দ্র। ‘মহাস্থান উপজেলা’ নামকরণ এ অঞ্চলের ব্র্যান্ডমূল্য বৃদ্ধি করবে, দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগ্রহ বাড়াবে এবং পর্যটনকেন্দ্রিক বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। এর ফলে হোটেল, পরিবহন, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সেবাখাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। স্থানীয় অর্থনীতি পাবে নতুন গতি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই নামকরণ উত্তরবঙ্গের মানুষের আত্মমর্যাদা ও আঞ্চলিক গৌরবকে নতুন মাত্রা দেবে। একটি জাতির ইতিহাস তখনই জীবন্ত থাকে, যখন তা নতুন প্রজন্মের চেতনায় স্থান করে নেয়। মহাস্থান উপজেলা নামটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত করবে, ইতিহাস জানার আগ্রহ সৃষ্টি করবে এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়বোধ জাগ্রত করবে।

শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। প্রতœতত্ত্ব, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব এবং সংস্কৃতি বিষয়ে দেশি-বিদেশি গবেষকদের জন্য মহাস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রশাসনিক স্বীকৃতি এর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও গবেষণাগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলবে। ফলে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
শিবগঞ্জ উপজেলার নাম মহাস্থান উপজেলা করার বিষয়ে ইতোমধ্যে সরকারি পর্যায়ে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশিত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। তবে ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে তার মূল্য কমে যায়; এর প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় বাস্তবায়নের মাধ্যমে। তাই দীর্ঘদিনের এই ন্যায্য দাবিকে দ্রুত কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি।
মহাস্থানগড় কোনো একটি অঞ্চলের সম্পদ নয়; এটি সমগ্র বাংলাদেশের ঐতিহাসিক গৌরবের প্রতীক। রাষ্ট্র যখন তার প্রাচীনতম সভ্যতার স্মারককে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়, তখন তা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থাকে না; বরং জাতীয় চেতনার পুনর্জাগরণের এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়। মহাস্থান উপজেলা নামকরণ তাই একটি নাম পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; এটি ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা, ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের সভ্যতার উত্তরাধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার।

লেখক : অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews