ফুটবল বিধাতা হয়তো তার পায়ে কেবল গোলের নেশাই দেননি, দিয়েছেন নাটকীয়তার এক অমোঘ পাণ্ডুলিপি। সেই ২০১০ সালের জোহানেসবার্গে ঘানার বিপক্ষে গোললাইনে ‘হ্যান্ড অফ গড’ করে যিনি একাধারে খলনায়ক ও উরুগুয়ের ত্রাতা হয়েছিলেন, সেই লুইস সুয়ারেজ আবারও ফিরতে চাইছেন চেনা আঙিনায়। তার ‘কামড় কাণ্ড’ জানেন না এমন ফুটবলপ্রেমী বিরল। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যখন অশ্রুসিক্ত নয়নে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন, মনে হয়েছিল এক মহাকাব্যের শেষ পাতাটি ওল্টানো হয়ে গেছে। কিন্তু দেড় বছরের ব্যবধানে ৩৯ বছর বয়সেও সুয়ারেজের রক্তে বইছে সেই চিরচেনা জেদ আর আকাশি-নীল জার্সি গায়ে জড়ানোর তীব্র আকাক্সক্ষা।
বুট জোড়া তুলে রাখার সময় কোচ মার্সেলো বিয়েলসার সঙ্গে সম্পর্কের তিক্ততা আর ড্রেসিং রুমের বিভক্তি নিয়ে যে ক্ষোভ ঝরেছিল, আজ তা অতীত। বর্তমান ইন্টার মায়ামির এই গোলমেশিন এখন যেন স্মৃতিকাতর। ১১ জুন থেকে উত্তর আমেরিকায় শুরু হতে যাওয়া ৪৮ দলের বিশ্বকাপে উরুগুয়ে যখন ‘এইচ’ গ্রুপে সৌদি আরব, কেপ ভার্দ আর স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সুয়ারেজ বলছেন অন্য কথা। স্প্যানিশ বার্তা সংস্থা ইএফই-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ‘জাতীয় দলের প্রয়োজনে আমি কখনোই ‘না’ বলতে পারি না। বিশেষ করে বিশ্বকাপের হাতছানি যখন সামনে।’
অতীতের ভুল স্বীকার করে নিয়ে এই ‘এল পিস্তোলেরো’ আরও যোগ করেন, ‘তখন হয়তো এমন কিছু বলেছিলাম যা অনুচিত ছিল। যাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন ছিল, আমি চেয়েছি।’ উরুগুয়ের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১৪৩ ম্যাচে ৬৯ গোল) এখনো প্রতিটি গোল করে সেই আগের মতোই শিশুতোষ উল্লাসে মাতেন। মায়ামির জার্সিতে এমএলএস মাতানো এই স্ট্রাইকারের কণ্ঠে লড়াইয়ের আজন্ম তৃষ্ণা, ‘ভুল পাসে এখনো ক্ষুব্ধ হই, হারের যন্ত্রণায় ছটফট করি। এটাই প্রমাণ করে আমার ভিতরে এখনো সেই প্রাণশক্তি বেঁচে আছে।’
২০১১ সালের কোপাজয়ী এই সেনানী চারটি বিশ্বকাপের সাক্ষী। ৩৯-এ দাঁড়িয়ে আরও একবার সেই মহাযজ্ঞে অংশ নেওয়ার ব্যাকুলতা কি বিয়েলসার মন গলাতে পারবে? অভিজ্ঞতার ছন্দে কি উরুগুয়ের নবীন প্রজন্মের রোদ ঝলমলে আক্রমণভাগ পূর্ণতা পাবে? উত্তর তোলা থাকল সময়ের হাতে। তবে সুয়ারেজের এই ফিরে আসার ঘোষণা উরুগুয়ের ফুটবল আকাশে এক নতুন রোমাঞ্চের সুর বেঁধে দিয়েছে। ফুটবলের এই চিরবিদ্রোহী নায়ক কি পারবেন তার ক্যারিয়ারের গোধূলি বেলায় আরও একটি রূপকথা লিখতে? অপেক্ষা এখন কেবল সবুজ গালিচায় সেই চিরচেনা উদ্যাপনের।