রাজনীতি কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রক্রিয়া। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে রাজনৈতিক শক্তি সময়ের পরিবর্তনকে উপলব্ধি করতে পারে এবং নিজেদের সাংগঠনিক শক্তিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তারাই দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিও আজ ঠিক এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অতীতের ত্যাগ, বর্তমানের প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যতের মেধাকে একত্র করে একটি নতুন সাংগঠনিক শক্তি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেম ও রাষ্ট্রদর্শন, বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং তারেক রহমানের প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাংলাদেশ ভাবনা- এই তিন ধারার সমন্বয়েই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হতে পারে।  তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক চেইন, মেধাবী তরুণদের অন্তর্ভুক্তি এবং ওয়েলফেয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ অপরিহার্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আছে, যখন একটি দলকে নিজেদের অতীতের শক্তিকে ধারণ করে ভবিষ্যতের জন্য নতুন পথ নির্মাণ করতে হয়। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ক্ষেত্রেও এখন সেই সময় উপস্থিত। একদিকে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের সাহসী নেতৃত্ব এবং স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে জাতিকে সংগঠিত করার অনন্য উদাহরণ; অন্যদিকে রয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, যা গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের প্রতীক হয়ে আছে। আর বর্তমান সময়ে তারেক রহমানের বক্তব্য ও পরিকল্পনায় উঠে আসছে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা। এই তিন ধারার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা যদি সংগঠিত শক্তিতে রূপ নেয়, তবে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নতুন প্রজন্মের কাছে একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। কারণ রাজনীতি কখনো স্থির থাকে না; সমাজ, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং মানুষের প্রত্যাশা বদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির চরিত্রও বদলে যায়। যে দল এই পরিবর্তনকে বুঝতে পারে এবং নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোকে সময়োপযোগী করে তুলতে পারে, তারাই দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকে এবং জনগণের আস্থা অর্জন করে। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা গভীরভাবে প্রযোজ্য।

বিএনপি এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি, যার জন্মই হয়েছিল এক ঐতিহাসিক সংকটের ভিতর দিয়ে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একটি নতুন রাজনৈতিক দর্শন সামনে আনেন। সেই দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, স্বনির্ভর অর্থনীতি এবং জনগণের ক্ষমতায়ন। এই দর্শনের ভিত্তিতেই বিএনপি একটি রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত হয়।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার ঘোষণা আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য মুহূর্ত। সেই ঘোষণা ছিল একটি যুদ্ধরত জাতির সাহস ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মেজর জিয়া বলছি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।’ সেই সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এ ঘোষণা ছিল একটি অনুপ্রেরণার উৎস। এই সাহসী ভূমিকার মধ্য দিয়েই জিয়াউর রহমান জাতীয় ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অর্জন করেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের উন্নয়ন ধারাকে নতুন পথে পরিচালিত করে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে রাজনীতি কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়; রাজনীতি হলো মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি মাধ্যম। অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির একটি নতুন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ধারার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি যে দৃঢ়তা এবং নেতৃত্বের পরিচয় দেন, তা তাঁকে গণতন্ত্রের সংগ্রামের অন্যতম প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৯০ সালের গণ অভ্যুত্থানে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন স্বৈরাচারের পতন ঘটায় এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।

বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর সময়ই অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তাঁর আপসহীন মনোভাব। কারাবাস, রাজনৈতিক নির্যাতন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপস করেননি। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করতে হয়, ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।’ এই কথার মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সার কথা নিহিত রয়েছে।

বর্তমান সময়ে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নতুন প্রজন্মকে এই রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত করা। কারণ সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির ভাষা এবং পদ্ধতিও বদলে গেছে। নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর, তথ্যসচেতন এবং বিশ্বমুখী। তারা রাজনীতির মধ্যে শুধু স্লোগান নয়; পরিকল্পনা, দক্ষতা এবং ভবিষ্যতের একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে চায়।

এই বাস্তবতায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি আধুনিক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনতে চেষ্টা করছেন। তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে বারবার উঠে আসে একটি প্রযুক্তিনির্ভর, জ্ঞানভিত্তিক এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের ধারণা। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদের বিকাশের বিকল্প নেই।’ এই বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রদর্শনের ইঙ্গিত বহন করে।

এই নতুন বাস্তবতায় জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে একটি আধুনিক সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত একটি সুসংহত সাংগঠনিক চেইন তৈরি করা যেতে পারে, যা প্রতিটি পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু হয়ে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, জেলা, বিভাগ এবং কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে। এই অপারেশনাল চেইন টিমের কাজ হবে সংগঠনকে সক্রিয় রাখা, সমাজের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির জন্য কাজ করা। আধুনিক যুগে তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। যদি একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করা যায়, তাহলে সংগঠন সহজেই জানতে পারবে কোন এলাকায় কী সমস্যা রয়েছে, কোথায় কী সম্ভাবনা আছে এবং কোন তরুণ কোন ক্ষেত্রে দক্ষ। এই তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা হলে রাজনৈতিক কর্মসূচি আরও কার্যকর ও বাস্তবমুখী হবে।

রাজনীতিকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য ওয়েলফেয়ারভিত্তিক কর্মসূচিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন, তাঁদের অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থায় আছেন। যদি সংগঠন তাঁদের জন্য প্রশিক্ষণ, সমবায় উদ্যোগ বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তার ব্যবস্থা করে, তাহলে তাঁরা বৈধ উপায়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবেন। এতে করে রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে সন্ত্রাস বা চাঁদাবাজির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতা কমে আসবে এবং সংগঠনের ভাবমূর্তিও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মেধাকে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। নবম শ্রেণি থেকে শুরু করে এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি ধারাবাহিক সহায়তা কাঠামোর মধ্যে আনা যেতে পারে। শিক্ষাবৃত্তি, ক্যারিয়ার গাইডেন্স, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের একটি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

এই ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলাফল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে একটি বৃহৎ বুদ্ধিবৃত্তিক প্ল্যাটফর্ম- জাতীয়তাবাদী মেধা পর্ষদ। এই পর্ষদে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মেধাবীরা যুক্ত হতে পারেন- ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, আইটি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ এবং গবেষক। তাঁরা দেশের উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা করবেন, নীতিগত পরামর্শ দেবেন এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে নেতৃত্বের চেতনা তৈরি করবেন। সংগঠনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো ত্যাগী ও অভিজ্ঞ নেতা-কর্মীরা।  দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তাই এই অভিজ্ঞ নেতাদের নিয়ে একটি অগ্রজ টিম তৈরি করা যেতে পারে, যারা তরুণদের রাজনৈতিক শিক্ষা দেবেন এবং সংগঠনের দিকনির্দেশনা দেবেন। রাজনীতির প্রকৃত শক্তি হলো মানুষ। আর মানুষকে সংগঠিত করতে হলে প্রয়োজন আদর্শ, সংগঠন এবং মেধার সমন্বয়। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত যদি একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে এবং তার সঙ্গে যদি নতুন প্রজন্মের মেধা যুক্ত হয়, তাহলে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শুধু একটি দলীয় শক্তি নয়- বরং একটি জাতীয় পুনর্জাগরণের আন্দোলনে পরিণত হতে পারে। এটাই হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির নতুন পথ।

লেখক : সমন্বয়কারী, নবান্ন ফাউন্ডেশন এবং সাধারণ সম্পাদক, সেন্টার ফর বাংলাদেশ থিয়েটার (সিবিটি),

ইমেইল : [email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews