সভ্যতার ক্রমবিকাশে ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোর অন্যতম হচ্ছে রেশম শিল্প। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আভিজাত্য ও গৌরবের প্রতীক হয়ে টিকে আছে রাজশাহী সিল্কের সুতা তৈরির অন্যতম নিয়ামক উপাদান রেশম। আমাদের দেশে প্রধানত মালবেরি, এন্ডি, মুগা ও তসর- এই চার ধরনের রেশম উৎপাদন হয়। এর মধ্যে বম্বিক্স বর্গের রেশমপোকা মালবেরি বা তুঁতগাছের পাতা খেয়ে, ক্যাস্টর গাছের পাতা খেয়ে ফিলোসেমিয়া বর্গের রেশম, কুল-তেজপাতা ও কর্পুরের পাতা খেয়ে অ্যান্থেরিয়া আসমেনসিন বর্গের রেশম এবং ওকগাছের পাতা খেয়ে অ্যানথেরি বর্গভুক্ত রেশম গুটি তৈরি করে থাকে। যদিও বম্বিক্স মোরি (Bombyx mori) রেশমপোকার গুটি থেকে উন্নতমানের রেশম সুতা উৎপাদিত হয়। প্রতিটি গুটির মধ্যে প্রায় ৫০০ মিটার পর্যন্ত একটানা সুতা থাকে। রেশম থেকে সুতা প্রস্তুত করে সেই সুতা দিয়ে শাড়ি, কামিজ, থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা, ওড়না, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, স্কার্ফ, রুমাল, টাই, সার্ট ইত্যাদি নামীদামি পোশাক প্রস্তুত করা হয়।

শাড়িসহ বিভিন্ন তৈরী পোশাকে নান্দনিকতা ফুটিয়ে তুলতে বিভিন্ন ধরনের নকশা সন্নিবেশিত করা হয়। নকশার জন্য ব্যবহার করা হয় রঙ, রঙিন সুতা, জরি, পুতি, কাচ, প্লাস্টিকসহ নানাবিধ উপকরণ ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

রেশম শিল্পের আদি নিবাস চীনে। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে চীনে এই রেশমের উৎপাদন শুরু হয়। প্রায় দুই হাজার বছর চীনারা বিষয়টি বিশ্ববাসীর দৃষ্টি গোচরে না এনে গোপন রাখে। পরে চীন থেকে তিব্বত ও কাশ্মির হয়ে ভারতে চলে আসে। ইতিহাসবিদদের মতে, মোগল শাসনামলে অবিভক্ত বাংলায় রেশম চাষের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে।

ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে মোগল আমলে ভারতবর্ষে প্রচুর রেশম চাষ ও সিল্কের সুতা এবং পোশাক তৈরি হতো। সেই সময়ে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বাণিজ্য করতে আসা বণিকরা রেশম সুতা এবং পোশাক সংগ্রহ করে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিক্রি করত। এতে করে সারা বিশ্বে এই সিল্কের তৈরী পোশাকের সুনাম ছড়িয়ে যায়। ইউরোপীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের বণিকরা একে বেঙ্গল সিল্ক নামে অভিহিত করতেন। তখন এ শিল্প ছিল আর্থসামাজিক অবস্থানের মাপকাঠি। এখনো রেশমি সুতার রাজশাহী সিল্ক আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে সুনাম অক্ষুণ্ন রেখেছে।

রেশম শিল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আমাদের রাজশাহী এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ত্রয়োদশ শতাব্দী বা তার আগে থেকেই রেশম চাষ ও এর উৎপাদন শুরু হয়। ১৮৩৫ সালের দিকে এই অঞ্চল থেকে প্রচুর কাঁচা রেশম রফতানি হতো। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিভিন্ন প্রতিনিধিদের রিপোর্টেও এই অঞ্চলে রেশম শিল্পের শত শত বছরের ইতিহাসের প্রমাণ পাওয়া যায়।

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ হান্টারের মতে, বহু শতাব্দী আগে থেকে রাজশাহী জেলায় রেশম ও রেশমজাত পণ্য তৈরি এবং রফতানিতে ভারতবর্ষের যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় শীর্ষস্থানে অবস্থান করে আসছিল। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত রেশম সুতা তৈরিতে রাজশাহী ছিল অন্যতম। ওলন্দাজ ও ডাচদের পর ইংরেজরা রাজশাহীতে এসে রেশম ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার করেছে। ইংরেজি ১৮৭১ সালে রাজশাহীর তৎকালীন কালেক্টর জে এস কার্সটৈয়ারসের দেয়া রিপোর্টে জানা যায়, সে সময় মোগল ও ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানির কারখানায় প্রতিদিন গড়ে আট থেকে ১০ হাজার মানুষ রেশম গুটি থেকে সুতা তৈরি করত।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তান সরকার রেশম উৎপাদনে তেমন মনোযোগী ছিল না। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রেও কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছিল না। যদিও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার ষাটের দশকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার মাধ্যমে ১২টি রেশম নার্সারি, ২০টি সম্প্রসারণ কেন্দ্র, একটি রেশম কারখানা এবং গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তুলে। কিন্তু দক্ষ জনশক্তি, সমন্বিত পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে রেশমের কর্মকাণ্ড অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে।

পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের রেশম শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যায়। দক্ষ কারিগররা ভারতে চলে যায়। রেশম নার্সারিগুলো বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। এতে অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়ে রেশম শিল্প। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত নার্সারি ও কারখানাগুলো মেরামত এবং এই শিল্পকে একটি নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হলেও এই শিল্পের গুরুত্বের তুলনায় তা যথেষ্ট ছিল না।

এই অবস্থায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রেশম শিল্পের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ১৯৭৭ সালে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে রেশম বোর্ড গঠন করেন। ১৯৭৮ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি রাজশাহীতে রেশম বোর্ডের প্রধান কার্যালয় স্থাপনের মধ্য দিয়ে রেশম শিল্পকে পুনরুজ্জীবন দেন। এতে রেশম নিয়ে নতুন করে শুরু হয় নানা তৎপরতা। গড়ে তোলা হয় ক্ষুদ্র তুঁত-বাগান। রেশম চাষে বিদেশ থেকে উন্নত জাত আমদানি করা হয়।

জিয়াউর রহমানের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে তার সন্তান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও রেশম নিয়ে তৎপরতা শুরু করেছেন।

২০১৭ সালে রাজশাহী সিল্ককে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ২০১৩ সালে এক আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেশম, বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ সিল্ক ফাউন্ডেশন- এ তিনটি পৃথক সংস্থাকে একত্র করে রাজশাহীতে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হয়। এতেও ভালো ফলাফল আসেনি। রেশম উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও স্বজনপ্রীতির গুরুতর অভিযোগ উঠে। একই সাথে জনবল সঙ্কটে রেশমচাষিদের প্রশিক্ষণ, তদারকি ও সহায়তা দেয়ায় ঘাটতি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাবসহ নানা কারণে রেশম চাষে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে চাষিরা রেশম চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। রেশম শিল্পের এই খারাপ অবস্থার মধ্যেই বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে ১৯৯১ সালে ঢালাওভাবে সুতা আমদানির সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া হয়। এতে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সুতা আমদানি শুরু করে। ফলে দেশীয় সুতা উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে রেশম চাষ ছেড়ে দেয়। শুরু হয় চীন, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সুতা আমদানি। ফলে সুতার বাজার হয়ে যায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।

রেশম আমাদের সভ্যতা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের প্রতীক। কাজেই এই শিল্পকে বিকশিত করতে বর্তমান সরকারের তৎপরতাকে সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তি ও গবেষণার মাধ্যমে উন্নত জাতের তুঁতগাছের চাষাবাদ বাড়াতে হবে। রেশম পোকার চাষ যেন ভালো হয়, এর জন্য চাষিদের প্রশিক্ষণ দেয়া জরুরি। সুতা আমদানি কমিয়ে দেশীয় সুতা উৎপাদন বাড়াতে হবে। বন্ধ ও রুগ্ণ কারখানাগুলো চালু করতে হবে। একই সাথে নতুন প্রজন্মের মধ্য থেকে দক্ষ কারিগর তৈরি করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করতে হবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিপণন করে রাজশাহী সিল্কের নান্দনিকতা ও আভিজাত্য ব্র্যান্ডিং করতে হবে।

লেখক : আইনজীবী



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews