রাষ্ট্রের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হইল—ইহার ন্যায়বোধ। কারণ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কেবল ভূখণ্ডের উপর প্রতিষ্ঠিত নহে—ইহা প্রতিষ্ঠিত হয় মানুষের বিশ্বাস, আস্থা ও নিরাপত্তাবোধের উপর। যখন একটি দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষের সন্তানও অন্যায়ের শিকার হইয়া পড়ে, তখন সেই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের দুর্ভাগ্য নহে—ইহা রাষ্ট্রীয় ন্যায়বোধের গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। অপরাধী গ্রেফতার হইবে—ইহা আইন ও সভ্যতার স্বাভাবিক নিয়ম; কিন্তু যখন অভিযোগ উঠে যে, বড় দুইটি রাজনৈতিক শক্তি প্রশাসনকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করিতেছে—তখন বিষয়টি আর সাধারণ আইন প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্ৰশাসন নিরপেক্ষতা হারাইলে আইনের প্রয়োগ তখন ভয়ের প্রতীকে পরিণত হয়।

প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মানুষ আশায় বুক বাঁধে। সাধারণ মানুষ ভাবে—এই বার হয়তো অন্যায় কমিবে। হয়তো অতীতের মতো একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটিবে না; কিন্তু যদি সেই পরিবর্তনের পরও গ্রামগঞ্জের বাস্তবতা অপরিবর্তিত থাকে—কেবল পক্ষ বদলায়—যদি একইভাবে নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হয়, তাহা হইলে সেই আশার ফানুস ধীরে ধীরে ফুটা হইয়া যায়। আশাহীন সমাজ দীর্ঘ মেয়াদে সবচাইতে বিপজ্জনক সমাজে পরিণত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ধরনের অভিজ্ঞতার দৃষ্টান্ত অজস্র। লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইলেও বাস্তবে দেখা গিয়াছে—পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা পূর্বের ন্যায়ই রাজনৈতিক চাপের মধ্যে পরিচালিত হইতেছে। মেক্সিকো বা ব্রাজিলের কিছু অঞ্চলে অপরাধ দমনের নামে বৃহৎ অভিযান পরিচালিত হইলেও পরবর্তীকালে গবেষণায় দেখা যায়—নিরীহ জনগোষ্ঠীও সেই অভিযানের শিকার হইয়াছে, যাহার ফলে জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতা বৃদ্ধি পায়। আফ্রিকার কিছু দেশে নির্বাচনপূর্ব বা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিরোধী পক্ষ দমনের অভিযোগ উঠিয়াছে, যাহাতে সাময়িকভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা হইলেও দীর্ঘ মেয়াদে ইহা রাজনৈতিক সহিংসতার বীজ বপন করিয়াছে।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার সাধারণত দুই ভাবে ক্ষতিকর। প্রথমত, ইহা নিরপরাধ মানুষের জীবনে সরাসরি অন্যায় সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত, সমাজের গভীরে ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের সঞ্চার ঘটায়। যখন কোনো দরিদ্র পরিবারের সন্তান অযথা গ্রেফতার হয়, তখন তাহার পরিবারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি ভাঙিয়া পড়ে। ইহার পাশাপাশি প্রতিবেশী ও সমাজের অন্যান্য মানুষ উপলব্ধি করে—আইনের নিরাপত্তা সকলের জন্য সমান নহে। এই উপলব্ধি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষয় করিয়া দেয়। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—প্রতিহিংসার রাজনীতি কখনো স্থায়ী স্থিতিশীলতা আনিতে পারে না। পাকিস্তান আমল হইতে স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকসমূহ পর্যন্ত এই জনপদ বহু বার দেখিয়াছে, প্রশাসনিক ক্ষমতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিবার ফলাফল কেবল অস্থায়ী সুবিধা দেয়; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে ইহা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করে। যেই প্রশাসন একদিন এক দলের হাতিয়ার হয়, অন্যদিন সেই একই প্রশাসন আরেক দলের হাতিয়ার হইয়া দাঁড়ায়। ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধীরে ধীরে নৈতিক দেউলিয়াত্বের দিকে ধাবিত হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি আরো সংবেদনশীল। কারণ এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রতিহিংসা ও অবিশ্বাসের চক্রে বহু বার আবর্তিত হইয়াছে। বিশ্বের সকল দেশেরই সাধারণ মানুষ মূলত শান্তি ও স্থিতিশীলতা চাহে। তাহারা রাজনৈতিক মতাদর্শের জটিলতায় নহে, বরং দৈনন্দিন নিরাপত্তা ও ন্যায়ের নিশ্চয়তায় আস্থা রাখিতে চাহে। যখন সেই ন্যায়ের নিশ্চয়তা ক্ষুণ্ণ হয়, তখন জনগণ মনে করে—রাষ্ট্র তাহাদের নহে, বরং কোনো বিশেষ শক্তির জন্য পরিচালিত হইতেছে।

সুতরাং, আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র চাই—যাহা পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিশোধের নূতন অধ্যায় শুরু করে? নাকি এমন একটি রাষ্ট্র চাই—যাহা প্রতিটি পরিবর্তনকে ন্যায়ের পথে আগাইবার সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করে? মনে রাখিতে হইবে, আশার ফানুস বারবার ফুটা হইলে একসময় মানুষ আর নূতন আশার ফানুস বানায় না। ইহা ভয়ংকর। কারণ, রাষ্ট্র মানুষের জন্য। মানুষ রাষ্ট্রের জন্য নহে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews