চল্লিশ দিনের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর ইরান-আমেরিকা যুদ্ধে বিরতি চলছে। দ্বিপাক্ষিক সম্মতিতে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর পাকিস্তানের ইসলামাবাদে একটি স্থায়ী শান্তি প্রচেষ্টার আলোচনায় ইরানের অনড় যৌক্তিক শর্তগুলো মেনে নিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেয়া হিসেবে গণ্য হবে। আর শর্ত প্রত্যাখ্যান করলে পুনরায় যুদ্ধাবস্থায় ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ সক্ষমতা এবং আভ্যন্তরীণ-আন্তর্জাতিক জনমত পুরোপুরি যুদ্ধের বিপক্ষে। পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার ছাড়া মার্কিন যুদ্ধসক্ষমতার প্রায় সর্বোচ্চ ব্যবহার করেও ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত সম্পদের বিপর্যয় ও ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানে পারমানবিক বোমা মেরে যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে যে নতুন বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্বে উঠে এসেছিল, এবারের ইরান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিপোলার সা¤্রাজ্যবাদের যবনিকাপাত ঘটাতে চলেছে। ইরান বার বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতারণার শিকার হয়েছে। কূটনৈতিক সমঝোতা ও আলোচনার নামে বিভ্রান্ত করে আকস্মিক বিমান হামলা করে দেশের শীর্ষ নেতাদের হত্যার ঘটনা একাধিকবার ঘটিয়েছে। আলোচনার নামে নতুন করে হামলা ও বিশ্বাসঘাতকতার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের সময় নেয়া বলে মনে করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে ইরানের। স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইরানের দেয়া ১০টি শর্তের সবগুলোই যৌক্তিক-অপরিহার্য। এসব শর্ত না মেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৫টি অযৌক্তিক শর্ত চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির আলোচনা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে ইরান। এহেন বাস্তবতায় পুনরায় যুদ্ধ শুরুর আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবেই অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারিতে ইরানে ইসরাইল-আমেরিকার যৌথ বিমান হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অপারেশন এপিক ফিউরির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পদক্ষেপই সামরিক ও কৌশলগতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বুমেরাং হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইমাম খামেনিকে হত্যা করে রিজিম বদলের হিসাব-নিকাশ বিপরীত ফল দিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনরত ইরানিরাও মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের মানব প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন ইরানের সব বিদ্যুতকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেয়ার হুমকি দিলেন, ইরানিরা এসব কেপিআই’র সামনে অবস্থান নিয়ে দেশপ্রেম ও সাহসের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে। এমনকি যুদ্ধ বিরতির শর্ত মেনে নেয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে রাতের মধ্যেই ইরানি সভ্যতা নিশ্চিহ্ন করার হুমকিকেও পরোয়া করেনি ইরানের সাধারন জনগন এবং নেতারা। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে পশ্চিমা মিত্ররা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান স্পষ্টতই প্রত্যাখ্যান করে প্রণালিতে ইরানি আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর নৌ অবরোধ আরোপ করতে ব্যাপক নাভাল সমাবেশ ঘটালেও তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই বেশি ক্ষতি হচ্ছে। এভাবেই যুদ্ধের নিয়ন্ত্রক শক্তি হয়ে উঠেছে ইরান।
ঐকবদ্ধ দেশপ্রেমিক জনগণ ও দক্ষ জনবলই রাষ্ট্রের প্রধান শক্তি। ইরান বিপ্লব, ইরান-ইরাক যুদ্ধ, সাড়ে চার দশকের অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলা এবং ইসরাইল-আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ কৌশল থেকে বিশ্বের অনেক কিছু শেখার আছে। প্রতিরোধ যুদ্ধের তাৎপর্যকে সামনে রেখে শহীদ ইমাম খামেনি বলেছিলেন, ‘আমরা মরে গেলেও কিছু যায় আসেনা, ইরানও গুরুত্বপূর্ণ নয়, ইসলাম এবং মুসলিম উম্মাহ গুরুত্বপূর্ণ।’ ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে যুদ্ধবাজ মার্কিন নেতারা একে ধর্মযুদ্ধ হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেছেন। পিট হেগসেথকে কপালে ক্রুসেডের উল্কি এঁকে সাংবাদিক সম্মেলনে হাজির হতে দেখা গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জিশুর প্রতিনিধি হিসেবেও প্রচার করা হয়েছে। এসব প্রচারনার মূল উদ্দেশ্য ছিল, যুদ্ধের পক্ষে আমেরিকা, ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বের সাধারণ খৃষ্টান জনগণের সমর্থন আদায় করা। নেতানিয়াহুর পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা ন্যারেটিভ পশ্চিমা বিশ্বের জনগণ এবার সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইতিপূর্বে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সবগুলো যুদ্ধের আগে যে সব প্রচারণা-প্রপাগান্ডা চালানো হয়েছে, তার সবই মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। এসব যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফির মতো নেতাদের হত্যা করা হয়েছে। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, সোমালিয়ায় রিজিম চেঞ্জ, নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা গত দুই দশকেও স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরতে পারেনি। মূলত মুসলিম বিশ্বে অশান্তি-অস্থিতিশীলতা জিইয়ে রেখে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদের উপর চিরস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ অক্ষুন্ন রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য। সেই সাথে আছে মার্কিন মিলিটারি ইন্ডাসট্রিয়াল কমপ্লেক্সের অস্ত্র বাণিজ্য এবং আরব মুসলমানদের জমি দখল করে গ্রেটার ইসরাইল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। ইতিমধ্যে এই যুদ্ধে কার্যত মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার পতন ঘটলেও সিরিয়া সীমান্তে ও দক্ষিণ লেবাননে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে বাফারজোন প্রতিষ্ঠার নামে নতুন ভূমি জবরদখলের প্রক্রিয়া থেকে ইসরাইল বিচ্যুত হয়নি। এমনকি নানা মাধ্যমের তথ্য-উপাত্ত ও বিচার-বিশ্লেষনে উঠে আসছে, ইসরাইল বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বায়তুল মোকাদ্দাস বা আল আকসা ধ্বংস করে তার দায় ইরানের উপর চাপিয়ে একঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা করছে। একটি হচ্ছে, মুসলিম বিশ্বের জনমতকে ইরানের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা, অন্যদিকে ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত প্রমিজ্ড ল্যান্ডের অংশ হিসেবে আল আকসার স্থানে থার্ড টেম্পল নির্মাণ করা। তবে এসব নিয়ে গাল্ফ স্টেটগুলোর যেন কোনো মাথাব্যথা নেই! ইরানের হাতে ইসরাইল-আমেরিকার সামরিক ও কৌশলগত বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করার পরও সংযুক্ত আরব আমিরাত আব্রাহাম অ্যাকর্ডের অধীনে ইসরাইলের সাথে নরমালাইজেশন ও সামরিক নিরাপত্তা সহযোগিতার আত্মঘাতী পথেই হাঁটছে। যেখানে পেট্রিয়ট, থাডসহ সবগুলো বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পরাস্ত করে ইরানের মিসাইল হামলায় ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সবগুলো মার্কিন বিমান ঘাঁটির পতন ঘটেছে, সেখানে ইসরাইলের কাছ থেকে আয়রন ডোম নিয়ে আমিরাতের আত্মরক্ষার চেষ্টাকে ইরানের অবস্থানের প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ জানানো হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।
দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রায় দেড় বছরের মাথায় ডোনাল্ড ট্রাম্প বললেন, প্রেসিডেন্টের মত বিপজ্জনক পেশা আর নেই! গত শনিবার মধ্যরাতে ওয়াশিংটন ডিসির হিলটন হোটেলে হোয়াইট হাউজের সংবাদদাতাদের সম্মানে আয়োজিত ডিনারে একজন বন্দুকধারির গুলিতে হুলুস্থুল ঘটনার পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের পদকে খুব বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আড়াইশ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে আর কারো কাছে কি প্রেসিডেন্ট পদটিকে এমন বিপজ্জনক মনে হয়েছিল? ইতিহাস বা আর্কাইভে এমন কোনো তথ্য আছে কিনা আমাদের জানা নেই। সেই সাথে এখন এই প্রশ্নও উঠে আসতে পারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আর কোনো প্রেসিডেন্ট কি এমন অজনপ্রিয়, রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক এবং মার্কিন সা¤্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করতে এমন অপরিপক্ক, অপরিনামদর্শি ও আত্মঘাতী ভূমিকা রেখেছিলেন? ডিপস্টেটের পাতা ফাঁদ এবং ক্ষমতার দম্ভ ক্ষমতাধরদের অন্ধ করে দেয়। তারা এক অলীক স্বপ্নে বিভোর হয়ে একের পর এক উদ্ভট সিদ্ধান্ত নিতে থাকে এবং উল্টাপাল্টা কথাবার্তা বলে নিজেই নিজের বিপদ ও পতন ডেকে আনে। চব্বিশের জুলাইয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের বীজ আরো অনেক আগে নিজেই বপন করেছিলেন। গুম-খুন, গণহত্যার ঘটনাগুলোর নেপথ্যে ছিল ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করা। সেটা ২০০৯ সালে পিলখানা হত্যাকা-ে ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল, ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীণ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে, ২০১৪ সালে বিনাভোটের নির্বাচন আয়োজন, ২০১৮ সালে রাতের ভোটের নির্বাচন। এসব ঘটনা ছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও জনগণের ক্ষমতাকে নিস্ক্রিয় ও অকার্যকর করে ক্ষমতাকে নিস্কন্টক ও দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্যে। কিন্তু কেটলিতে পানি ঢেলে চুলায় বসিয়ে মুখ বন্ধ রাখার চেষ্টা কখনো সফল হয়না। বিস্ফোরণ অবশ্যম্ভাবি। চব্বিশের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পলায়ন কিংবা আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থা কি তাদের কিংবা তাদের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও উত্তরসুরিদের জন্য কোনো বোধোদয় ঘটাতে সক্ষম হচ্ছে? তা নাহলে ঐতিহাসিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। কোন পরিস্থিতিতে হাজার হাজার তরুন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ হাজার হাজার আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে বুক পেতে নিজের জীবন দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়! সাড়ে চার দশকের অবরোধ- নিষেধাজ্ঞা, সম্মিলিত পশ্চিমা শক্তির বার বার সামরিক আগ্রাসন, পারমানবিক হামলার হুমকি ইরানি জনগণকে পশ্চাদপসারণে বাধ্য করতে পারেনি। উপরন্তু, ইরানের মডারেট ও সরকারবিরোধী অনেক লোক, যারা বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্বে অবস্থান করছিলেন, যুদ্ধের শুরুতে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেলেও তারা ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবেশি দেশ হয়ে ইরানে ফিরে আসেন। এর মধ্যে ইরান সরকারের দ্বারা হয়রানির শিকার হওয়ার চলচ্চিত্রকার জাফর পানাহিও রয়েছেন। অন্যদিকে, বিশ্বের সবচেয়ে প্রিভিলেজ্ড ও সুরক্ষিত নিরাপত্তা বেষ্টনিতে থাকা লাখ লাখ ইসরাইলি যুদ্ধের সময় দেশত্যাগ করেছে। এই পরস্পর বিরোধি বাস্তব চিত্রই হতে পারে যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের অন্যতম মানদ-।
একদিকে, ইরানি জনগণ মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় হতাহতের বিপদ উপেক্ষা করে তাদের ইমাম ও বিপ্লবী সরকারের পক্ষে রাজপথে অবস্থান করছে, অন্যদিকে হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক শুধু রাজপথে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করেই ক্ষান্ত হয়নি, একজন মেধাবি স্কুল শিক্ষক মার্কিন নাগরিক, কোল টমাস অ্যালেন মধ্যরাতে অস্ত্র সজ্জিত হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডিনার পার্টিতে নিরাপত্তারক্ষিদের উপর হামলা চালিয়েছেন। মার্কিন গণমাধ্যম স্পষ্টভাবেই কোল এলেনের এই বন্দুক হামলাকে অ্যাসাসিনেশন অ্যাটেম্পট বা হত্যাচেষ্টা বলে অভিহিত করেছে। একজন মেধাবি গ্রাজুয়েট শিক্ষক কেন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এসে ওয়াশিংটনের হিলটন হোটেলের বার্ষিক প্রেস ডিনারে প্রায় আড়াই হাজার অতিথির সামনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যা করতে চাইলেন, তা নিয়ে এখন জোর বিচার-বিশ্লেষণ চললেও এটা বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থ ও নিরাপত্তা উপেক্ষা করে নেতানিয়াহুর কথায় ইরানে হামলা চালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের কাছে হেয়, পরাজিত করেছেন, এটা অনেক মার্কিনীর মতো কোল এলেনকেও বিক্ষুব্ধ করেছে।
অন্ধ হলেও প্রলয় বন্ধ থাকে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার পর যে সব কর্মকান্ড করেছিলেন, যে কারণে তিনি দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হয়ে হোয়াইট হাউজ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। জায়নিস্ট নিয়ন্ত্রিত ডিপস্টেট এবং ইসরাইলি লবির মদতে তাদের পক্ষে কাজ করার শর্তেই হয়তো ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে পুনরায় বিজয়ী করা হয়েছিল। ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ তাঁকে নিজের গতিপথ বদল করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারেনি। অথচ আগেরবার ইরানের সাথে ৬ জাতির পারমানবিক সমঝোতা চুক্তি বাতিল এবং ইরান আক্রমণের পরিকল্পনা সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই একটি বিপজ্জনক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত একজন আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভুত মার্কিন সাংবাদিক সিজার সেলালা ২০১৯ সালে গণমাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে একটি খোলা চিঠি দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ট্রাম্পের বিপজ্জনক পরিকল্পনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপর্যয় ও জনগণের ভোগান্তির আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছিলেন। সেই চিঠির শুরুতেই তিনি উল্লেখ করেছিলেন, তিনি ট্রাম্পকে এই চিঠি লিখেছেন সারাবিশ্বের শান্তিকামী মানুষের পক্ষ থেকে। ৮৮০ শব্দে লেখা চিঠির শুরুটা ছিল এ রকম, ‘Sir: I am writing to you in the name of many peace-loving people from all over the world, who are worried about our future and that of our children. A future that your dangerous policies put in terrifying danger. Attacking Iran will mean retaliatory actions that will cause havoc not only in Iran but throughout the region’. একজন সাংবাদিক বা সাধারণ নাগরিক সাত বছর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপজ্জনক যুদ্ধনীতি ও ইরান আক্রমণের পর ইরানের সম্ভাব্য প্রতিরোধ ও প্রত্যাঘাতের ফলে যে বিপর্যয়ের আশঙ্কার কথা বুঝতে পেরেছিলেন, সিআইএ, এফবিআই, মোসাদ, সামরিক-বেসামরিক উপদেষ্টা ও থিঙ্কট্যাঙ্ক পরিবেষ্টিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি তা বুঝতে পারেননি? এমনটা হওয়ার কথা নয়। আরেকজন সাংবাদিক ব্রেট উইলকিন্স এর একটি নিবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়ে সিজার সেলালা লিখেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১০ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে ইরানের কোনো সামরিক ঘাটি নেই। ইরানের কোনো পারমানবিক বোমা নেই। গত শত বছরেও আমেরিকা বা অন্য কোনো দেশে আগ্রাসন চালানো কিংবা রিজিম বদলে ভূমিকা রাখার প্রশ্নে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকলেও গত সাত দশকে ইরানসহ অসংখ্য দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসন, রেজিম বদলের নামে গনতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাতের অনেক উদাহরণ আছে। সিজার সেলালা সারাবিশ্বের শান্তিকামী মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে ২০১৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, তা যদি তিনি সঠিকভাবে বুঝতে সক্ষম হতেন, তাহলে আজকে তিনি এমন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতেন না। তাঁর কর্মকান্ডের কারণে শান্তিকামী নাগরিকরা বন্দুকধারি আততায়ী হয়ে যাচ্ছে, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পদকে বিপজ্জনক করে তুলেছেন। তাকে অভিসংশিত করে এই পদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা মার্কিন রাজনীতিবিদ ও জনগণের কর্তব্য।