পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বারুইপুর থানা এলাকায় ১১ বছর বয়সী এক মুসলিম শিশুকে গণধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার পর লাশ বস্তাবন্দী করে পুকুরে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৪ জুলাই (শনিবার) নিখোঁজ হওয়ার পরদিন ৫ জুলাই (রবিবার) স্থানীয় একটি পুকুর থেকে তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই পৈশাচিক ঘটনার প্রতিবাদে এবং জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে বারুইপুর, নরেন্দ্রপুর ও সোনারপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় রাস্তা অবরোধ, টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ এবং পুলিশি যান ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন ওইসব এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার বিকেলে কিশোরীটি তার বান্ধবীর জন্মদিনের উপহার কিনতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। পরিবারের অভিযোগ, চার হিন্দুত্ববাদী তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। রবিবার সকালে সূর্যপুর হাট এলাকার একটি পুকুরে বস্তাবন্দী অবস্থায় তার মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রবিবার সকালে তরুণীর মরদেহ ঘিরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন স্থানীয়দের একাংশ। শিয়ালদহ-নামখানা লাইনে অবরোধের জেরে ঘণ্টাখানেক বন্ধ থাকে ট্রেন চলাচল। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকে সড়কও।
প্রাথমিক ময়নাতদন্তের রিপোর্টে যে নৃশংসতার চিত্র উঠে এসেছে, তা দেখে শিউরে উঠেছে সাধারণ মানুষ। পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিশুটির শরীরে একাধিক কামড় ও আঁচড়ের দাগ রয়েছে। তার গোপনাঙ্গে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন মিলেছে এবং মাথার পেছনে কোনো ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে অথবা শক্ত দেওয়ালে মাথা ঠুকে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, শিশুটিকে যখন পুকুরে ফেলা হয়, তখনো সে জীবিত ছিল। তার ফুসফুস ও পাকস্থলীতে পানি পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে পানিতে ডুবেই তার চূড়ান্ত মৃত্যু হয়েছে।
মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই বারুইপুরের সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। উত্তেজিত জনতা রাস্তা অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলে উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে ইন্দ্রজিৎ তাঁতি (পিন্টু) নামে এক অভিযুক্তের মৃত্যু হয়। ওই যুবক পেশায় অটোচালক। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, শনিবার বিকেলে ওই যুবকের অটোতেই শিশুটিকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিক্ষোভের পরিস্থিতি সামাল দিতে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী।
পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সড়ক অবরোধ তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানায় এবং বলে যে এই অপরাধের সাথে যুক্ত প্রত্যেককে গ্রেফতার করা হবে এবং সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে। তবে, স্থানীয় বিজেপি কর্মী শান্তনু মণ্ডলসহ গ্রেপ্তারকৃত পাঁচজন অভিযুক্ত জামিনে মুক্তি পেয়েছেন—এমন খবরের পর বাসিন্দারা আরও উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
গণদাবি ও উত্তেজনার মুখে পুলিশ ঘটনার তদন্তে ৬ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করেছে। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজন গ্রেফতার এবং তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তবে স্থানীয় বিজেপি কর্মী শান্তনু মন্ডলসহ কয়েকজন অভিযুক্তকে প্রাথমিক আটকের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এমন খবরে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়।
জানা যায়, বারুইপুরের ঘটনায় মোট অভিযুক্ত পাঁচ জন। এরমধ্যে তিনজন হলেন- প্রভাস মন্ডল, ইন্দ্রজিৎ(পিন্টু ) তাঁতী ও আনন্দ। প্রভাস মন্ডল একটি ভিডিওতে আনন্দের নাম উল্লেখ করেছে। প্রভাস সেই সময় ওই রাস্তা দিয়ে সে গিয়েছিল এবং ঘটনা ঘটতে দেখেছিল। আর তাকে ছাড়াতে যায় স্থানীয় বিজেপি নেতা শান্তনু মন্ডল।
নিহত তরুণীর বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলে সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের দাবি, মেয়েটির পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একটি ফেসবুক লাইভে মমতার অভিযোগ, তাঁকে কার্যত নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে। মৃতার পরিবারের সঙ্গে ভিডিয়ো কলে কথা বলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও।
এই নৃশংস ঘটনার পর ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম বা তথাকথিত ‘গদি মিডিয়া’র ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মী ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমাজকর্মী দেবরাজ ভট্টাচার্যসহ অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন যে, এই ঘটনায় যদি ভুক্তভোগী ও অপরাধীদের ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতো, তবে মিডিয়ার চিত্র অন্যরকম হতে পারত।
অধিকার কর্মীদের মতে, ভারতের সাধারণত কোনো হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তি সামান্য আক্রান্ত হলেও মূলধারার মিডিয়াগুলো ভুক্তভোগী কার্ড খেলে এবং অভিযুক্ত যদি মুসলিম হয়, তবে তা নিয়ে ২৪ ঘণ্টা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা হয়।
এই ঘটনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। দেশটির প্রায় সব বড় গণমাধ্যমে মুসলিম ভুক্তভোগীর ধর্মীয় পরিচয় এবং অভিযুক্ত উগ্র হিন্দুত্ববাদী বা বিজেপি নেতাদের সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সেন্সরশিপ বজায় রাখতে দেখা গেছে। পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমগুলো এই নৃশংস অপরাধের চেয়ে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি নিয়ে বেশি ব্যস্ত, যা প্রকৃত সত্যকে আড়াল করার শামিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নতুন শাসকগোষ্ঠী বিজেপির উগ্র মেরুকরণের রাজনীতির কারণে অপরাধীরা আশকারা পাচ্ছে। বিশেষ করে বিজেপি সংশ্লিষ্ট বা উগ্র হিন্দুত্ববাদী মনোভাবাপন্ন অপরাধীদের ক্ষেত্রে এক ধরণের অঘোষিত 'সরকারি দায়মুক্তি' বা আইনি শিথিলতা প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে অপরাধীরা আরও বেশি উৎসাহিত হচ্ছে এবং সংখ্যালঘু নারী ও শিশুদের ওপর এই ধরনের বর্বর হামলা দিন দিন বাড়ছে।
দেবরাজ ভট্টাচার্য ফেসবুকে লিখেছেন, ‘‘১১ বছরের একটি ফুটফুটে কন্যাশিশু কতগুলো হিন্দুত্ববাদী নরপিশাচের লোভের শিকার হলো, সমাজ নীরব, কোনো কোলাহল নেই। আজ যদি এদের নাম আনসারী আব্দুল হতো তাহলে এতক্ষণে রাস্তায় মড়া কান্নায় ভরে যেত। মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন সকালে ধরে বিকেলে খরচ করা হবে আর এখন ওনার দলের নেতা ধর্ষণ ধামাচাপা দিচ্ছেন। ’’
উত্তেজনাপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারী ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ও ফাঁসির আশ্বাস দিয়েছেন। মঙ্গলবার মেয়েটির বাবাকে ভবানীভবনেও যেতে বলেছেন। আইজি (প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ) কঙ্করপ্রসাদ বাড়ুই আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘‘এই ঘটনার সঙ্গে যাঁরা জড়িত, সকলকে গ্রেফতার করা হবে। ফাঁসির সাজা যাতে দেওয়া হয়, সেই চেষ্টা করব। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) অভিযোগ করেছে যে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যেতে বাধা দিতে তার কালীঘাটের বাসভবনের বাইরে বিশাল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে অগণতান্ত্রিকভাবে তাকে কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। যদিও বিজেপি এই অভিযোগ অস্বীকার করে একে রুটিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলে দাবি করেছে।
গদি মিডিয়ার নীরবতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতির মাঝেও আশার আলো দেখাচ্ছে বারুইপুরের সাধারণ মানুষ। এই নারকীয় ঘটনার বিরুদ্ধে কোনো ধর্মীয় বিভাজন না রেখে স্থানীয় সাধারণ হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। তারা সম্মিলিতভাবে এই ঘৃণ্য অপরাধের প্রতিবাদ করছেন এবং রাজনৈতিক রং না দেখে সমস্ত অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন। স্থানীয় জনগণের দাবি, দল-মত ও ধর্ম নির্বিশেষে এই 'নরপিশাচদের' কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।