নিউইয়র্ক শহর। যার সরকারি নাম সিটি অব নিউইয়র্ক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ও সবচেয়ে প্রভাবশালী মহানগরী। পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল  শহরও বটে; যা নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ-পূর্বে হাডসন ও ইস্ট নদীর মোহনায় অবস্থিত। ব্যবসায়িক, সাংস্কৃতিক, পর্যটন সর্বক্ষেত্রে রয়েছে নিউইয়র্কের প্রাধান্য। এজন্য নিউইয়র্ককে বলা হয় বিশ্বের রাজধানী। প্রধান দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে স্ট্যাচু অব লিবার্টি, রকফেলার সেন্টার, অ্যাম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, সেন্ট্রাল পার্ক, ব্রুকলিন ব্রিজ, টাইম স্কয়ার, মেডিসন স্কয়ার, ব্রডওয়ে মিউজিয়াম উল্লেখযোগ্য। একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হলো-দ্য নিউইয়র্ক সিটি নেভার স্লিপস। অর্থাৎ নিউইয়র্ক শহর কখনো ঘুমায় না। এই শহরকে যাঁরা চব্বিশ ঘণ্টা জাগিয়ে রাখেন, সচল রাখেন তাঁরা আর কেউ নন-ট্যাক্সি-ক্যাব চালক।

২. গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মানুষের ভিড় বেড়েছে কয়েক গুণ। তাঁরা নানা ক্ষেত্রে নানা পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন। দেখা গেছে, বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি নিয়োজিত হয়েছেন ট্যাক্সিচালকের পেশায়। ট্যাক্সি ড্রাইভিং কিছুটা পরিশ্রমের কাজ হলেও উপার্জন ভালো। তাই বেশির ভাগ নতুন অভিবাসী এই পেশাটিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বিধায় ট্যাক্সি চালানোর কাজটিকেই সানন্দে বেছে নেন। অর্থাৎ নিউইয়র্কে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়ের প্রধান উৎস এই ট্যাক্সি ক্যাব। এই পেশাটির যেটি বড় সুবিধা তা হলো ধরাবাঁধা কোনো কাজ নয়। ইচ্ছা হলো তো কাজ থেকে বাসায় চলে এলো। পরে আবার কাজে গেল। অর্থাৎ নিজেই যেন নিজের বস। কিছুটা স্বাধীন ব্যবসার মতো।

৩. নিউইয়র্ক সিটিতে যে কত ধরনের ট্যাক্সি এবং কোম্পানি রয়েছে তার হিসাব রাখা মুশকিল। যেমন ইয়েলো ক্যাব, গ্রিন ক্যাব, ব্ল্যাক ক্যাব, উবার, লিভারি, লিমোজিন সার্ভিস ইত্যাদি। জানা গেছে, নিউইয়র্ক সিটিতে ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি ট্যাক্সি ক্যাব চলাচল করে। এর মধ্যে ইয়েলো ক্যাব বা হলুদ ট্যাক্সির ড্রাইভারই রয়েছেন ৯০ হাজার। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই ড্রাইভারদের ৮৬ শতাংশ হচ্ছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা নতুন অভিবাসী। এই নতুন অভিবাসীর মধ্যে আবার দক্ষিণ এশিয়ার; অর্থাৎ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মানুষই বেশি। সত্যি কথা বলতে কী, ঢাকায় যেমন রিকশার সংখ্যা  নিউইয়র্কে তেমনি ট্যাক্সি ক্যাবের সংখ্যা, যা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। নিউইয়র্ক সিটির ট্যাক্সি ক্যাবশিল্পের সঙ্গে ২ লাখেরও বেশি লোক জড়িত রয়েছেন; তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যাই বেশি।

৪. নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাজপথের দিকে তাকালেই দেখা যায়, ট্যাক্সিচালকদের অধিকাংশই বাংলাদেশি। আমেরিকান চালকের কদাচিৎ দেখা গেলেও অভিবাসী চালকরাই মূলত এই শহরটিকে সচল রেখেছেন। গত এক দশকে ট্যাক্সিচালকের পেশায় পাকিস্তানি ও ভারতীয়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশিরাই এগিয়ে আছেন। ইদানীং আফ্রিকান দেশগুলো থেকে আগত নতুন অভিবাসীদের মাঝেও এ পেশায় নিয়োজিত হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।  যেমন মিসর, মরক্কো, ঘানা ও নাইজেরিয়া থেকে আগত বহু লোক এই পেশায় নিয়োজিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে আগের মতো অবস্থা নেই, একেক ক্যাবের জন্য একেক ধরনের শর্ত। তারপরও বাংলাদেশিরা তাঁদের মেধা, মননশীলতা ও সততা দিয়ে এগিয়ে চলছেন।

৫. প্রবাসী বাংলাদেশিরা মনে করেন, এই নিউইয়র্ক সিটিতে সামান্য ইংরেজি জেনে সৎপথে ডলার উপার্জন করার ক্ষেত্রে  ইয়েলো ক্যাব চালানোর কোনো জুড়ি নেই। একসময় এ পেশায় নিয়োজিত থেকে বছরে কোটি টাকা উপার্জন করার নজির রয়েছে। তবে বর্তমান মার্কেট এতটাই প্রতিযোগিতামূলক যে উপার্জন আগের চেয়ে অনেকটাই কমে গেছে। তারপরও সময় ধরে ঠিকমতো কাজ করলে দিনে ৩০০ ডলার উপার্জন করাটা কোনো ব্যাপার নয়। নিউইয়র্ক সিটিতে ট্যাক্সি চালিয়ে একজন লোক বছরে গড়ে ৫০ হাজার ডলার থেকে ১ লাখ ডলার পর্যন্ত উপার্জন করতে পারে। পেশাজীবী এই ক্যাবচালকরা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরাট এক ভূমিকা রেখে চলেছেন। জনপ্রতি গড়ে ২০০ ডলার হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৫ মিলিয়ন ডলার তাঁরা ঘরে নিয়ে যান। এই অর্থের সিংহভাগ দেশে পরিবারপরিজনের কাছে পাঠান; যা দিনশেষে দেশের জিডিপিতে যোগ হয়।

৬. আমেরিকার পঞ্চাশটি রাজ্যেই কমবেশি বাংলাদেশি অভিবাসী ছড়িয়েছিটিয়ে বসবাস করছেন। কোনো সুনির্দিষ্ট স্ট্যাটিসটিকস না থাকলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আমেরিকায় প্রায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী বসবাসরত রয়েছেন। তন্মধ্যে নিউইয়র্কেই থাকেন প্রায় ৪ লাখ। নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস ও জ্যামাইকায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির বসবাস। এঁদের বেশির ভাগই  কঠোর পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই গরিব মানুষগুলো যে কতটা কষ্টের কাজ করেন তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এঁরাই তো মূলত দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে থাকেন। পরিবারপরিজন ছেড়ে ভাগ্যান্বেষণে ও দেশে গিয়ে বছরের পর বছর আছেন। কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। কাগজপত্রের আশায় কষ্টার্জিত উপার্জনের অনেকাংশই ল’ইয়ারকে মাসের পর মাস দিয়ে যাচ্ছেন-যদি কোনো দিন সোনার হরিণ ধরা দেয়। 

প্রবাসে ঘাম দেশে স্বপ্ন৭. সম্প্রতি নিউইয়র্ক শহরের ফ্লোরাল পার্কে এক আত্মীয়ের বাসায় অবস্থানকালীন কুমিল্লার এক বাংলাদেশি ক্যাবচালক মোশারফ হোসেনের ট্যাক্সি ক্যাবে বেশ কয়েক দিন ম্যানহাটন ও জ্যাকসন হাইটসে যাতায়াত করি। আর তখনই তাঁর সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে ওঠে। সেই সুবাদে একদিন কৌতূহলবশত তাঁকে অনেক খোলামেলা প্রশ্ন করি। যেমন কবে থেকে এই পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। অন্য পেশায় না গিয়ে এই পেশা কেন বেছে নিলেন। পরিবারে কে কে আছে। দৈনিক উপার্জন কেমন? খরচ বাদে কেমন সঞ্চয় থাকে। পরিবারপরিজনের কাছে কীভাবে রেমিট্যান্স পাঠান ইত্যাদি। তিনি  জানান, পেশাটিতে পরিশ্রম ও ঝুঁকি থাকলেও অন্যান্য পেশার চেয়ে এ পেশায় উপার্জন ভালো। স্বাধীন একটি পেশা। তিনি কাজে খুব নিয়মিত। তাই দৈনন্দিন রোজগারও ভালো, একা মানুষ, সেদিক থেকে সঞ্চয়ও ভালো। নিজের খরচটা রেখে বাকি সবই দেশে পাঠান।

৮. মোশারফ হোসেন মনে করেন, কোনো পেশাই ছোট নয়। গত উনত্রিশ বছর তিনি নিউইয়র্ক শহরে ইয়েলো ক্যাব চালান। তাঁর বাড়ি বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলায়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে টাকা উপার্জন করে দেশে পাঠান। একদিন কথা প্রসঙ্গে মোশারফের জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু চমকপ্রদ ঘটনা তুলে ধরেন।

প্রবাসে এখনো মেসে থাকেন তিনি। স্ত্রী-সন্তানরা দেশে থাকেন। তাঁদের কেন আমেরিকায় আনেননি সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানালেন, মেসে আমি যেনতেনভাবে থাকতে পারি। আলুভর্তা, ডাল বা ডিম দিয়ে চলে যায় তিন বেলা। পরিবার নিয়ে থাকতে গেলে বাসাভাড়া দিতে হতো। তাতে খরচ অনেক বেড়ে যেত। বরং সেই টাকাটাই এখন দেশে পাঠাতে পারছি, এটাই আমার বড় আনন্দ-সহজসরল উত্তর মোশারফের। আর এজন্য স্ত্রীর প্রতিও রয়েছে তাঁর অগাধ বিশ্বাস আর কৃতজ্ঞতা।

৯. তিনি নিজে বেশি দূর পড়তে পারেননি। কিন্তু হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ভাইবোনদের পড়িয়েছেন। ঘামে ভেজা টাকায় এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-দুটি কলেজ, একটি উচ্চবিদ্যালয় ও একটি কিন্ডারগার্টেন। গড়েছেন দুটি পাঠাগারও। প্রায় ২ কোটি টাকা সমমূল্যের জমি দিয়েছেন হাসপাতালের জন্য। বললেন, ‘পড়ালেখার মূল্য আমি বুঝি। জীবিকার তাগিদে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েই পাড়ি জমাতে হয়েছিল বিদেশে। কিন্তু আমার মন পড়ে থাকে দেশে। টাকার অভাবে কারও যেন পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সেজন্যই এলাকায় এত কিছু করা।’ কথা প্রসঙ্গে তিনি আরও জানান-এখান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা দেশেবিদেশে বিভিন্ন জায়গায় এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে। ভাবলে মনটা খুশিতে ভরে ওঠে।

১০. নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালিয়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে মোশারফ হোসেন দেশে শিক্ষা ও সমাজসেবায় আলো ছড়াচ্ছেন। এই মানুষটি যে অন্য ধাতুতে গড়া তাতে আমার আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইল না। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন মুল্লুকে ট্যাক্সি চালাচ্ছেন। উপার্জন ভালো হলেও অন্যদের মতো আয়েশি জীবনযাপন করেননি। আয়ের বেশির ভাগই উজাড় করে দিয়েছেন নিজ এলাকায়, গড়ে তুলেছেন বিদ্যার বাতিঘর। তাঁর এই অসামান্য উদ্যোগ শুধু যে প্রবাসীদের জন্য অনুকরণীয় তা কিন্তু নয়; এই মহান উদ্যোগ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে এবং অসহায় শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে বড় ভূমিকা রাখছে।

১১. মোশারফ হোসেনের জীবন আমাদের শেখায়-মানুষ চাইলে প্রবাসে থেকেও নিজের শিকড়কে শক্ত করতে পারে। নিউইয়র্কে স্টিয়ারিং হাতে রেখেও তিনি চালনা করেছেন একটি গ্রামের ভবিষ্যৎ। তাঁর ত্যাগ, শ্রম ও মানবিকতা আজ তাঁর জন্মভূমিকে পরিণত করেছে শিক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে। তিনি বলেন, ‘মানুষের জন্য কিছু করতে পারলেই আমার আনন্দ। যত দিন বাঁচব, এই আনন্দ নিয়েই বাঁচতে চাই।’ তাঁর এই গল্প শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়-এটি একটি সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাসও বটে।

১২. দূরত্ব কখনোই শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ হতে পারে না; বরং একজন প্রবাসী হিসেবে মোশারফের এই অবদান দেশের অগ্রগতি ও সমাজ বিনির্মাণে এক অবিচ্ছেদ্য শক্তি। তাঁর এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ নিউইয়র্কের মতো ব্যস্ত শহরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্যাক্সি চালিয়েও দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, মমত্ববোধ ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, যা অন্যদেরও অনুপ্রেরণা জোগাবে।

♦ লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews