সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ বা নীতিসহায়তা পেতে হলে আবেদনকারীকে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব ধরনের মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। শুধু মামলা প্রত্যাহার করলেই হবে না, আবেদনকারীর পক্ষ থেকে হলফনামার মাধ্যমে এ মর্মে ঘোষণা দিতে হবে, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তার কোনো মামলা বিচারাধীন বা অনিষ্পন্ন নেই।
গতকাল বুধবার এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এ নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের নীতিসহায়তা ও প্রণোদনা দিয়ে আসছে। এসব সহায়তার আওতায় রফতানিমুখী বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা, কৃষি, কুটির, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও মাইক্রো (সিএমএসএমই) খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণসুবিধা প্রদান এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতে বিশেষ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কিছু গ্রাহক একদিকে সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিসহায়তার সুবিধা গ্রহণ করছেন, অন্য দিকে একই সময়ে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট পিটিশনসহ বিভিন্ন ধরনের মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে অপ্রয়োজনীয় আইনি জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং নীতিসহায়তা বাস্তবায়নেও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত যেকোনো প্রণোদনা প্যাকেজ কিংবা বিশেষ নীতিসহায়তা অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে নিশ্চিত হতে হবে যে আবেদনকারীর পক্ষ থেকে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আবেদনপত্রের সাথে প্রত্যাহার করা মামলার পূর্ণাঙ্গ তালিকা সংযুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পাদিত একটি হলফনামার মাধ্যমে আবেদনকারীকে ঘোষণা দিতে হবে যে, সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে তার কোনো মামলা বর্তমানে বিচারাধীন নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এ নির্দেশনার ফলে একদিকে অপ্রয়োজনীয় মামলাজট কমবে, অন্য দিকে সরকারি প্রণোদনা ও নীতিসহায়তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনি অনিশ্চয়তা হ্রাস পাবে। একই সাথে যেসব গ্রাহক প্রকৃত অর্থে ব্যবসা পুনরুজ্জীবন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সহায়তা নিতে আগ্রহী, তাদের জন্য প্রক্রিয়াটি আরো স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে।
ব্যাংকারদের মতে, অতীতে বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধা নেয়ার পাশাপাশি আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে গেছে। এতে এক দিকে নীতি বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে, অন্য দিকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকেও দীর্ঘ সময় আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকতে হয়েছে। নতুন নির্দেশনা এ ধরনের দ্বৈত অবস্থান নিরুৎসাহিত করবে। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের সাংবিধানিক প্রতিকার চাওয়ার অধিকার এবং সরকারের নীতিসহায়তা প্রদানের শর্ত দুই বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে। এ কারণে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা বাস্তবায়নের সময় সার্কুলারের বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, নতুন এ নীতির মাধ্যমে প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে আরো কার্যকরভাবে পৌঁছবে, আইনি জটিলতা কমবে এবং উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরো গতিশীল হবে।