করোনা মহামারিতে বিধ্বস্ত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ২০২৪-এর গণ অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী শাসনামল এবং মধ্যপ্রাচ্যের মহাসমরের প্রভাবে প্রচণ্ড-ভাবে প্রভাবিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মাত্র তিন-চার মাস বয়সি নবনির্বাচিত সরকারের জন্য নতুন বাজেট প্রস্তাব শুধু সনাতন চ্যালেঞ্জিংই নয়, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের দাবিদার। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ আন্দোলন এবং ২০২৪-এর গণ অভ্যুত্থানের মর্মবাণীর বাস্তবায়ন বর্তমান সরকারের জন্য অনিবার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে উপস্থিত।  এ কথা প্রণিধানযোগ্য যে, ১৯৭৫-২০০৮ সাল পর্যন্ত সময়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বিবর্তনে যতটুকু উৎকর্ষ সাধন সম্ভব হয়েছিল ২০০৯-২০২৪ পর্বে সেসবের মৌল ভিত্তিসহ প্রতিষ্ঠানের বোধ, বিশ্বাস, আস্থা নড়বড়ে হয়ে যায়। নতুন বাজেটে সেসবের মেরামতের পথ-নকশা আঁকা হবে-এটাই সবার প্রত্যাশা। আর শুধু প্রত্যাশা নয়, তা বাস্তবায়নে যার যা করণীয় সে ভূমিকা পালন করার প্রত্যয় ব্যক্ত ব্যতিরেকে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের বাজেট বাস্তবায়িত হবে না। 

যেমন-বর্তমান পর্যায়ে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একটি ‘পুশ ফ্যাক্টর’-এর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। যেকোনো মূল্যে রাজস্ব সংগ্রহ কাক্সিক্ষত পর্যায়ে উন্নীত করার জন্য জোরালো প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এখনো বিপুলসংখ্যক কর প্রদানে সক্ষম মানুষকে করজালের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। করের ভিত্তি বাড়ছে না। অন্যদিকে কর ও শুল্কের আওতার বাইরে থাকা করযোগ্য খাত এবং প্রাপ্য কর সঠিকভাবে আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই একটি পরিশীলিত ও সংস্কারমুখী কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে করদাতাবান্ধব এবং স্বয়ংক্রিয় প্রণোদনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা বা বাস্তবায়ন প্রয়োজন। অর্থাৎ যাদের কর দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে অথচ কর দিচ্ছেন না, তাঁদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি কর ফাঁকির সব পথ বন্ধ করতে হবে। কর প্রদান ও আদায়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং জটিলতা দূরীকরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। এ বিষয়ে ১৯৯০-এর দশক থেকেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; কিন্তু কাক্সিক্ষত সাফল্য আসেনি। আগে আমাদের অর্থনীতি মূলত আমদানিনির্ভর ছিল। দেশের নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা শক্তিশালী না হওয়ায় আমদানি শুল্ক ছাড়া কর ও ভ্যাট থেকে রাজস্ব আহরণের সুযোগ সীমিত ছিল। ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন বাণিজ্যনির্ভরতা থেকে উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে রূপ নিতে শুরু করে, তখন শুল্কের তুলনায় করের অংশ বৃদ্ধি পায়। তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়ের কারণে রপ্তানি আয় ও উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং আনুপাতিক হারে আমদানি ব্যয় কমে আসায় অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের বিষয়টি জাতীয় চিন্তার কেন্দ্রে আসে। অন্যদিকে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন মেরূকরণ শুরু হয়। তখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আগের মতো বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান পাওয়ার সুযোগ কমতে থাকে। ফলে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত কিন্তু দ্রুত উন্নয়নশীল দেশের জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আহরণের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে যায়।

সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে রাজস্ব আহরণের হার বৃদ্ধির চেষ্টা করলেও এখনো কর-জিডিপি অনুপাত কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনে এখনো অনেক পথ বাকি। বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত সম্পন্ন দেশগুলোর একটি। জাতীয় বাজেটে নির্ধারিত কর আহরণের লক্ষ্য কোনো বছরই পূরণ হয় না। কর আহরণের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ দিকনির্দেশনা থাকে না। এ অবস্থায় পদ্ধতিগত, অবকাঠামোগত ও নানাবিধ ত্রুটি দূর করে যত বেশি সম্ভব মানুষকে করজালের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি দ্রুত গড়ে ওঠা নতুন আর্থিক খাতগুলোকে করজালে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দক্ষতা ও কার্যকারিতার দিক থেকে এ চেষ্টার কাক্সিক্ষত ফল পেতে অনেক সময় লেগেছে। রাজস্ব আহরণ বিভাগে দক্ষ ও দায়িত্বশীল জনবলের স্বল্পতা এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের বিস্তারের প্রেক্ষাপটে অনলাইনভিত্তিক ব্যবস্থা ও সংস্কার কার্যক্রম সম্পূর্ণ করা যাচ্ছে না।

করদানে সচেতন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে যেখানে এবং যখন প্রয়োজন সেখানে উৎসাহমূলক ও প্রণোদনামূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করা জরুরি। কিন্তু যদি কর আদায়ের পরিবেশকে অতিরিক্ত কঠোর, অভিজ্ঞতানির্ভর বা চাপ সৃষ্টিকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে করদাতারা স্বস্তিবোধ করবেন না। বিধিবিধানকে করদাতাবান্ধব করার নামে পরিবেশ আরও জটিল হয়ে উঠছে কি না সেটিও বিবেচনার বিষয়। যদি কর আদায় ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল, খন্ডিত ও কঠিন হয়, তাহলে যারা এখনো করজালের বাইরে রয়েছেন তারা করদাতা হতে ভয় পেতে পারেন। এমনকি যারা বর্তমানে কর দিচ্ছেন তারাও সঠিকভাবে করদানে আগ্রহ হারাতে পারেন। করদাতারা একসময় (২০০৫-২০১১) ট্যাক্স ওমবাডসম্যানের মাধ্যমে অভিযোগ ও সমস্যার সমাধান পেতেন। বিশ্বের শতাধিক দেশে কার্যকর এ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে চালু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা বিলুপ্ত করা হয়। ট্যাক্স ওমবাডসম্যান প্রতিষ্ঠানের বাস্তবায়নে যেসব সীমাবদ্ধতা ও সমস্যাকে অনাকাক্সিক্ষত হিসেবে দেখা হয়েছিল, আইন সংশোধন ও সংযোজনের মাধ্যমে সেগুলো সমাধান করে প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ রয়েছে। যারা কর দেন এবং যারা কর আদায় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সবার দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার উন্নয়ন প্রয়োজন। যদি আমরা ধরে নিই, উন্নত অর্থনীতির মতো আমাদের সব করদাতাই শিক্ষিত, কর-দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন এবং আইন-বিধি সম্পর্কে অবগত, তাহলে করব্যবস্থার মানসিক কাঠামো ভিন্নভাবে গড়ে উঠবে। এতে রাজস্ব আহরণের পরিবেশ অগ্রগতিমূলক না হয়ে উল্টো পশ্চাৎমুখী হয়ে পড়তে পারে। নতুন করদাতারা যদি করজালে না আসেন বা তাদের আনা না যায়, আর তার পরিবর্তে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানো হয়, তাহলে তারাও কর ফাঁকির পথ খুঁজতে পারেন। প্রতি বছর প্রণীত অর্থ আইনে বিদ্যমান তিনটি প্রধান রাজস্ব আইন সংশোধন ও সংযোজনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইন প্রতিস্থাপনের জন্য ২০১২ সালে নতুন আইন প্রণীত হলেও ২০১৯ সালের আগে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। এদিকে ১৯৬৯ সালের কাস্টমস আইন ২০২৩ সালে, ১৯৮৪ সালের আয়কর অধ্যাদেশ ২০২৩ সালে নবায়ন করা হয়েছে। এসবের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে অর্থ আইনে ব্যাপক সংশোধনের প্রস্তাব দেখা যাচ্ছে। করহার, কর রেয়াত, অব্যাহতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতি বছর নতুন সংশোধনী ও সংস্কার প্রস্তাবের সংখ্যা বাড়ছে। শুধু আয়করের ক্ষেত্রেই গড়ে প্রায় ৭০টি সংস্কার প্রস্তাব অর্থ আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়। এ অবস্থায় যদি প্রতি বছরের অর্থ বিল আইনটির প্রতিটি ধারা ও উপ-ধারায় পরিবর্তন, সংযোজন ও সংশোধনের বন্যায় ভরে যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট সবার পক্ষে সেগুলো অনুসরণ কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে এগুলো বাস্তবায়নে আরও স্বচ্ছ ক্ষমতা প্রয়োগজনিত জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

ব্যবসা ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে করদাতাদের নানা দুশ্চিন্তার মুখোমুখি হতে হয়। আইন সংশোধনসংক্রান্ত এসআরও বাস্তবায়নে অন্তত পাঁচ বছর সময় স্থায়িত্ব থাকলে তার কার্যকারিতা একটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছায়। এদিকে আয়কর সার্কুলার-১ জারিতে বিলম্ব হলেও কিছু অস্পষ্টতা নিরসনের সুযোগ থাকে। এসব কারণে সঠিক পরিমাণে ন্যায্য কর আদায়ে বিলম্ব বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। সার্কুলারের দীর্ঘসূত্রতা দূর করা না গেলে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিবেশগতভাব পুরো বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এতে যথাযথ কর আদায় প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশে অর্থবছরের শুরু থেকেই ঝড়-প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা সমস্যার কারণে অনেকেই আয়কর দানের সময় বাড়ানোর চেষ্টা করেন। এ পরিস্থিতি থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতে সেবার আইন অনুযায়ী অর্থবছর শেষ হওয়ার পর তিন মাসের পরিবর্তে পাঁচ মাস, অর্থাৎ নভেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত দুই বছর সে সময় বলতে গেলে বারবার বাড়ানো হয়েছে। যেহেতু সবাই সার্কুলার জারির অপেক্ষায় থাকেন, সেহেতু সময়মতো কর দিতে বিলম্বই করতে থাকেন। সবাইকে করজালের আওতায় আনতে চাইলে অর্থবছর শেষে পাঁচ মাস অপেক্ষা করার প্রবণতা বা সময় ক্ষেপণ রোধ করে সময়মতো করদানের সহজ সুযোগ তৈরি করতে হবে।

বাজেটে নতুন করহার ঘোষণার পর অর্থবছরের শুরু থেকেই কীভাবে কর দিতে হবে এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে কী করণীয়-তা স্পষ্টভাবে নিশ্চিত না করলে সমস্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক। আয়কর দানের সময় নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর ফলে মূল করদান ও আদায়ে সময় ক্ষেপণই নিশ্চিত হয়েছে। আগে যেখানে কর দুই মাস আগে আদায় হতো, এখন তা পিছিয়ে যাওয়ায় সামষ্টিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব ও বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ সরকার অর্থবছরের শুরু থেকেই ব্যয় চালিয়ে যায়; কিন্তু কত রাজস্ব আসবে তা জানতে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে ব্যাংক ঋণ বদ্ধি পায়। অনেক সময় প্রত্যাশিত রাজস্বও আসে না। একবারে তিন মাস থেকে পাঁচ মাস সময় বাড়ানোর ফলে সবাই যাতে দেরি করার মানসিকতায় অভ্যস্ত না হয়ে পড়েন এবং রাজস্বের কার্যকারিতা কমে না যায়, সে বিষয়ে সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম ও প্রক্রিয়ায় আইনগত স্বচ্ছতার আলোকে গতিশীলতা আনতে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আইন ও পদ্ধতির যৌক্তিকতা যথাযথভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। বিশেষ করে কর আহরণ প্রক্রিয়ার সব আইনগত জটিলতা যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে দূর করা না গেলে সমস্যা থেকেই যাবে। অন্তত বর্তমান পরিস্থিতিতে যে ব্যাপক রাজস্ব আহরণের কথা ভাবা হচ্ছে, তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্জন করা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে আইন বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে যদি আরও কিছু ত্রুটি ও ফাঁকফোকর থেকে যায়, তবে সেগুলো সংশোধন না করা পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআর কর্তৃপক্ষের নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন যাতে না হয় সেটা বিবেচনায় থাকা উচিত।

♦ লেখক : সাবেক সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের

সাবেক চেয়ারম্যান



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews