বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি দীর্ঘ দিন ধরেই বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক, সেতু, রেলপথ কিংবা সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচির পেছনে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সহায়তার প্রবাহে স্পষ্ট ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে একসময় বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বিবেচিত ভারত, জাপান ও রাশিয়ার নতুন প্রতিশ্রুতি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এই তিন দেশ থেকে কোনো নতুন ঋণ বা অনুদান প্রতিশ্রুতি আসেনি। শুধু তাই নয়, সামগ্রিকভাবে বিদেশী সহায়তার প্রতিশ্রুতিতেও বড় ধরনের পতন ঘটেছে। একই সময়ে কমেছে অর্থছাড়ের হার; কিন্তু উল্টো বেড়েছে ঋণ পরিশোধের চাপ। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নের ভারসাম্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের চাপা সঙ্কট।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে মোট ৫৭টি চুক্তিতে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি পেয়েছে ২৮০ কোটি ৭৭ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ চুক্তি ২০টি এবং অনুদান চুক্তি ৩৭টি। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৪২৫ কোটি ৯৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রতিশ্রুতি কমেছে ১৪৫ কোটি ১৭ লাখ ২০ হাজার ডলার বা ৩৪ দশমিক ০৮ শতাংশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল পরিসংখ্যানগত পতন নয়; বরং বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়ন কাঠামোয় আস্থার সঙ্কেতও বহন করছে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও আশা নেই : গত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন, নির্বাচনকেন্দ্রিক অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে বিদেশী সহায়তায় কিছুটা ধীরগতি তৈরি হয়েছিল। তবে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে- এমন প্রত্যাশা ছিল নীতিনির্ধারকদের মধ্যে।

কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ভারত, জাপান ও রাশিয়ার মতো বড় অংশীদাররা এখনো নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। অথচ এই তিন দেশই গত এক দশকে বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো উন্নয়নের মূল অর্থদাতা ছিল। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রাশিয়া, মেট্রোরেল ও মাতারবাড়ী প্রকল্পে জাপান এবং রেল, বিদ্যুৎ ও সংযোগ খাতে ভারতের বড় বিনিয়োগ বাংলাদেশের উন্নয়ন কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রতিশ্রুতি না আসার পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ।

প্রতিশ্রুতিতে বড় ভাটা

ইআরডির তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি ১০টি চুক্তির মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ১২৬ কোটি ৯৭ লাখ ১০ হাজার ডলার।

এছাড়া এশীয় বিভিন্ন উৎস ও জেইসিএ মিলে চারটি চুক্তিতে প্রতিশ্রুতি এসেছে ৫৬ কোটি ৫২ লাখ ২০ হাজার ডলার।

বিশ্বব্যাংকের আইডিএ বা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা খাত থেকে পাওয়া গেছে ৪১ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ইউরোপীয় উৎস থেকে এসেছে ৩৯ কোটি ২০ লাখ ৭০ হাজার ডলার। জাতিসঙ্ঘ দিয়েছে চার কোটি ২৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার এবং নরডিক দেশগুলো থেকে এসেছে ১২ কোটি ২১ লাখ ৪০ হাজার ডলার। অন্য দিকে ভারত, জাপান, রাশিয়া ও এআইআইবির মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎস থেকে কোনো নতুন প্রতিশ্রুতি না আসা অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

কারণ, বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন ও চলমান উন্নয়ন কর্মসূচি চালিয়ে যেতে বৈদেশিক অর্থায়নের ধারাবাহিকতা জরুরি।

অর্থছাড়েও ধীরগতি

শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রকৃত অর্থছাড়ের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে মোট অর্থছাড় হয়েছে ৪২৩ কোটি ৬২ লাখ ডলার। এর মধ্যে ঋণ ৩৮৪ কোটি ৬৬ লাখ ১০ হাজার ডলার এবং অনুদান ৩৮ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার ডলার।

আগের অর্থবছরের একই সময়ে অর্থছাড় হয়েছিল ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে অর্থছাড় কমেছে ৯২ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার ডলার বা ১৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

এটি স্পষ্ট করে যে, শুধু নতুন প্রতিশ্রুতিই কমছে না; বরং পুরনো প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নও ধীর হয়ে পড়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা এখানে বড় কারণ। প্রকল্প অনুমোদন হলেও ভূমি অধিগ্রহণ, দরপত্র, প্রশাসনিক জটিলতা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার অভাবে সময়মতো অর্থ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে উন্নয়ন সহযোগীরাও অর্থ ছাড়ে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে।

কে কত ছাড় করল

চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ। সংস্থাটি ছাড় করেছে ৮৩ কোটি ৮১ লাখ ৩০ হাজার ডলার।

মজার বিষয় হলো, নতুন প্রতিশ্রুতি না দিলেও রাশিয়া ছাড় করেছে ৮২ কোটি ৮৩ লাখ ৮০ হাজার ডলার। মূলত চলমান রূপপুর প্রকল্পের অর্থায়নের অংশ হিসেবেই এই অর্থছাড় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এডিবি সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতি দিলেও ছাড় করেছে মাত্র ৭১ কোটি ৬ লাখ ডলার।

জাপান দিয়েছে ৪২ কোটি ২৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার, ভারত দিয়েছে ২৫ কোটি ৪ লাখ ৯০ হাজার ডলার এবং চীন দিয়েছে ৫৩ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিশ্রুতির তুলনায় অর্থছাড় কম হওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিরই প্রতিফলন।

উল্টো বাড়ছে ঋণ পরিশোধের চাপ

বিদেশী সহায়তা কমলেও ঋণ পরিশোধের চাপ কিন্তু কমছে না। বরং ক্রমেই বাড়ছে।

ইআরডির তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বাংলাদেশকে সুদ-আসল মিলিয়ে পরিশোধ করতে হয়েছে ৩৮০ কোটি দুই লাখ ৩০ হাজার ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৩৫০ কোটি ৭১ লাখ ৭০ হাজার ডলার।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরিশোধ বেড়েছে ২৯ কোটি ৫১ লাখ ৩০ হাজার ডলার বা ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ।

এর মধ্যে শুধু সুদ পরিশোধেই গেছে ১৩৩ কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার ডলার। আর আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ২৪৬ কোটি ৭৮ লাখ ১০ হাজার ডলার।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের প্রকৃতি এখন বদলাচ্ছে। আগে কম সুদের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের আধিক্য থাকলেও এখন তুলনামূলক ব্যয়বহুল ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। ফলে ঋণ পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়ছে।

বাজেট বাস্তবায়নেও শঙ্কা

চলতি অর্থবছরে বাজেট সহায়তা হিসেবে ৯২২ কোটি ৬০ লাখ ডলার পাওয়ার পরিকল্পনা ছিল সরকারের। এর মধ্যে এডিবির কাছ থেকেই পাওয়ার কথা ছিল ২২০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এ ছাড়া ইউরোপীয় উৎস থেকে ১৭২ কোটি ৩০ লাখ ডলার এবং এশীয় উৎস থেকে ১৪১ কোটি ৯০ লাখ ডলার পাওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছিল।

কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে- সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে।

সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে গত ফেব্রুয়ারিতে। স্বভাবতই দুই-এক মাসে একেবারে বিরাট কোনো পরিবর্তন আসবে না। এই সরকারের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন বা বিচার করতে হলে আগামী বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন, বর্তমানে একটি বড় সমস্যা হলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের অত্যন্ত ধীরগতি। এডিপি বাস্তবায়ন যখন শ্লথ হয়ে যায়, তখন তহবিল ছাড়ের ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ে। কারণ, অধিকাংশ প্রকল্পের বড় অংশই এডিপির সাথে যুক্ত। এডিপি বাস্তবায়ন না হলে তহবিল ছাড় হওয়ার কোনো সুযোগ নেই; এটি বাড়লে ছাড়ের পরিমাণও বাড়বে।

তিনি জানান, কিছু কারিগরি (টেকনিক্যাল) প্রকল্প ছাড়া অধিকাংশ এডিপি প্রকল্পই যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথমত, তারা অনেকগুলো এডিপি প্রকল্প যাচাই-বাছাই বা স্ক্রুটিনি করছে। দ্বিতীয়ত, যেসব প্রকল্পে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সেগুলোকে অন্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যবহারের (রিপারপাস) জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে আলোচনা বা নেগোশিয়েট করছে। পাশাপাশি, দেশীয় বিভিন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে বর্তমানে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা কিছুটা কম থাকায়, অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব অর্থায়ন জোগাতেও বেগ পেতে হচ্ছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

বাংলাদেশ এখন এক জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। এক দিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, অন্য দিকে বাড়তি আমদানি ব্যয়, ঋণ পরিশোধ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা- সব মিলিয়ে সরকারের জন্য অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে উঠছে।

এই পরিস্থিতিতে বৈদেশিক সহায়তার ধীরগতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। কারণ বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন ব্যাহত হলে সামগ্রিক অর্থনীতির গতিও কমে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়ানো, উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা।

নয়তো আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশকে আরও বেশি ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে হবে, কিন্তু নতুন অর্থায়নের প্রবাহ তুলনামূলক কমে যেতে পারে। আর সেই ভার শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews