মধ্যপ্রাচ্যের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই এখন আর কোনো নির্দিষ্ট সীমায় আটকে নেই। একদিকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাবেক শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা উরি হালপেরিন যখন যুদ্ধের কৌশলগত ভুল নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য দিচ্ছেন, ঠিক তখনই ইরানের 'অপারেশন সাদেক প্রমিজ-৪'-এর সাঁড়াশি আক্রমণে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে ইসরাইলের নিরাপত্তা বলয়।
ইরানের সংবাদ মাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানায়, এই দ্বিমুখী সঙ্কটে পড়ে বর্তমানে ২০ লাখেরও বেশি ইসরাইলি নাগরিক দীর্ঘ সময়ের জন্য মাটির তলের পরিখা বা আন্ডারগ্রাউন্ড বাঙ্কারে বন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।
ইসরাইলের ৫ বড় ভুল
নেতানিয়াহুর সাবেক গোয়েন্দা সহকারী উরি হালপেরিন, যাকে কার্যত ইসরাইলের গোয়েন্দা কাঠামোর সর্বোচ্চ স্তরের ব্যক্তি মনে করা হয়, তিনি বর্তমান যুদ্ধ নিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। তার মতে, মোসাদ, আমান বা শিন বেত-এর প্রধানরা তার অধীনেই কাজ করেন। ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি ৫ গুরুতর ভুলের কথা উল্লেখ করেছেন, কোনো সুনির্দিষ্ট অপারেশনাল প্ল্যান ছাড়াই ইসরাইল এই যুদ্ধে জড়িয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং তাদের মানসিক শক্তিকে তেল আবিব চরমভাবে অবমূল্যায়ন করেছে। পাশাপাশি, ইরানের সামরিক অবকাঠামো এমনভাবে গোটা দেশের ভৌগোলিক অবস্থানে ছড়িয়ে আছে যে কেবল সীমিত হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
এদিকে, ইসরাইলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে এবং যুদ্ধের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। তিনি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা না বুঝে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন বা হরমুজ প্রণালী ও বিশ্বের জ্বালানি ব্যবস্থা দখলের মতো কথাবার্তা বা হামবড়াই ভাবকে নেহাৎ 'রাজনৈতিক ফ্যান্টাসি' বা কল্পনায় ডুবে থাকা বলে অভিহিত করেন।

'সাদেক প্রমিজ-৪': আকাশপথের লড়াই
হালপেরিনের এই সতর্কবার্তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেছে গত কয়েক ঘণ্টার সমরচিত্রে। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় খতম আল-আম্বিয়া সদরদপ্তরের মুখপাত্র 'অপারেশন সাদেক প্রমিজ-৪'-এর আওতায় পরিচালিত ৭৮ ও ৭৯তম ঢেউয়ের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। ইরানের সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি-র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এরই মধ্যে দেশের আকাশসীমায় দুশমনের কয়েকটি টমাহক ও জাসিম ক্রুজ মিসাইল এবং শত্রু ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ইরানের বীর যোদ্ধারা হাইফার রাফায়েল অস্ত্র কারখানা এবং বেন-গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এমনকি বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা রিফুয়েলিং প্লেনগুলোকেও হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের বৃষ্টি ও টার্গেট তেল আবিব
সোমবার (২৪ মার্চ) রাতে 'সালাহশূর' বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টিতে লণ্ডভণ্ড হয়েছে আমেরিকান ও ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুগুলো। অভিযানের ৭৮তম ঢেউয়ে ইলাত, ডিমোনা এবং উত্তর তেল আবিবে ইমাদ ও কদর মাল্টি-ওয়ারহেড পিনপয়েন্ট সিস্টেম ব্যবহার করে নিখুঁত হামলা চালানো হয়েছে। একইসাথে এই অঞ্চলে থাকা আমেরিকার সন্ত্রাসী বাহিনীর বেশ কিছু ঘাঁটিতেও আঘাত হানা হয়েছে।
এরপর ৭৯তম ঢেউয়ে 'ইয়া খায়ের আল-ফাতিহিন' সাংকেতিক নামে শক্তিশালী সাজ্জিল, ইমাদ এবং খায়বার-শেকান ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে ইসরাইলের বহুবিন্যস্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করা হয়। এতে তেল আবিবের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর 'নিরাপদ' আস্তানা, রামাত গান ও নেগেভের সামরিক সহায়তা কেন্দ্র এবং বীরশেবার প্রধান সামরিক লজিস্টিক সেন্টার ধ্বংস হয়েছে।
তথ্য গোপন ও সেন্সরশিপের অভিযোগ
দখলকৃত ফিলিস্তিনি এলাকাগুলো জুড়ে আগুনের কুণ্ডলী, ঘন ধোঁয়া এবং ২০ লাখ ইহুদির বাঙ্কারে দীর্ঘমেয়াদি বন্দিত্বই প্রমাণ করে যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি এখন অপ্রতিরোধ্য। পরিস্থিতি সামলাতে পেন্টাগন এবং ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা 'আমান' যুদ্ধের খবরাখবর ও ক্ষয়ক্ষতির ছবির ওপর বাধ্যতামূলক সেন্সরশিপ আরোপ করেছে। তবে এই তথ্য লুকানোর চেষ্টা আবারো প্রমাণ করছে যে তারা ময়দানে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
সূত্র: তাসনিম নিউজ।