১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে নিহত হন। সে সময় আমি খুলনায় চাকরিরত। সকাল ১০টায় সরকারি কাজে বের হয়ে বসুপাড়া অতিক্রমের সময় রাস্তায় একটি চা-দোকানের সামনে প্রচুর লোকসমাগমে আমার জিপগাড়িটি আটকে যায়। দেখতে পাই, উৎসুক জনতা রেডিওর খবর শুনতে সেখানে জটলা পাকিয়েছে। সে অবস্থায় আমিও কৌতূহলী হয়ে গাড়ি থেকে নেমে জানতে পারি, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর একটি দল হত্যা করেছে! সংবাদটি শুনে আমার মন খারাপ হয়ে যাওয়ায় আমি অফিসে ফিরে দেখি ততক্ষণে সবাই সংবাদটি জেনে গিয়েছে এবং আমার অফিসের কেউ কেউ বিলাপ শুরু করে দিয়েছে! এ অবস্থায় পরদিন খুলনার হাদিস পার্কে তাঁর গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং সেদিন রবিবার অফিস ছুটি থাকায় আমিও জানাজায় অংশ নিই। উল্লেখ্য আমি জীবনে যত জানাজায় অংশ নিয়েছি তার মধ্যে শহীদ জিয়ার জানাজা ছিল একটি অনন্য ঘটনা। অসাধারণ সে ঘটনায় আমি এতটা অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম যে সেদিনের সে ঘটনা বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার জানা নেই। কোথা থেকে যে এত মানুষের আগমন ঘটল তা-ও আমি অনুমান করতে পারলাম না। খুলনা শহরের হাদিস পার্কে অনুষ্ঠিত সে জানাজা হাদিস পার্ক ছাড়িয়ে একদিকে সাউথ সেন্ট্রাল রোড, নতুন বাজার, অন্যদিকে পিকচার প্যালেসের মোড় পেরিয়ে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এবং খানজাহান আলী রোডসহ হাসপাতাল রোড, সার্কিট হাউস, রূপসা নদীর তীর- সবদিকেই লোকেলোকারণ্য হয়ে ওঠার পাশাপাশি সারা খুলনা শহরের চারদিকের মানুষ সেদিন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল! জানাজা শেষ হওয়ার পরও মানুষের মুখে ক্রন্দনরোল অব্যাহত ছিল! আর সেসব দৃশ্য দেখেশুনে মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু গ্রন্থে বর্ণিত, হোসেন (রা.)-কে হত্যার পর আকাশে বাতাসে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ ধ্বনি ওঠার যে বর্ণনা লেখক বিধৃত করেছেন, সেই কথাটিই আমার মনে পড়ে গেল; আমার মনে হলো, আকাশে বাতাসে যেন, ‘হায় জিয়া, হায় জিয়া’ রব উঠেছে! শহীদ জিয়ার সততা এবং ন্যায়নিষ্ঠতা নিয়ে কিছু বলাও এখানে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তাঁর কোনো আত্মীয়স্বজনের নাম আমরা জানতাম না। কারণ কেউ রাষ্ট্রপতির আত্মীয় পরিচয়ে কোনো অফিস আদালতে সুযোগসুবিধা নেবেন এমন সাহস কারও ছিল না। ফলে দেশের মানুষের পক্ষে তাঁর আত্মীয়স্বজনের নাম-পরিচয় জানারও সুযোগ ছিল না! এ বিষয়ে আমার জানা একটি ঘটনা উল্লেখ করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। জিয়াউর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন আত্মীয় তাঁর বাড়িতে এসে পরপর তিন দিন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে না পারায় অবশেষে রাত জেগে অপেক্ষার পর চতুর্থ দিন রাত ১টায় সাক্ষাৎ পেয়ে রাষ্ট্রপতিকে তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে আনীত একটি মামলার কথা উল্লেখ করে বলেন, একটি মিথ্যা মামলায় তাঁর ছেলেটিকে ফাঁসানো হয়েছে বিধায় মামলা হতে তাঁকে যেন অব্যাহতি দেওয়া হয়! অতঃপর জিয়াউর রহমান তাঁকে বলেন, ‘দেখুন আমি বললে সঙ্গে সঙ্গে আপনার ছেলের মামলা প্রত্যাহার করা হবে, কিন্তু আমার সঙ্গে আপনার আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না, এখানেই আত্মীয়তার সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে!’ এ কথা শোনার পর ভদ্রমহিলা তাঁর ছেলের জন্য যে সুপারিশ নিয়ে এসেছিলেন সেই সুপারিশ তিনি প্রত্যাহার করে নেন! জিয়াউর রহমানের ন্যায়নিষ্ঠতার আরও অনেক ঘটনা আমাদের জানা আছে, সুতরাং এসব নিয়ে বাগাড়ম্বর করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। আর তাঁর সততার কথা যে এখনো মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় সে কথাটিও আমরা সবাই জানি। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সততা এবং ন্যায়নিষ্ঠতার বিষয়টিও এখানে উল্লেখ করার কারণ হলো, তাঁর সততা এবং ন্যায়নিষ্ঠতার ওপর ভিত্তি করেই বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটি আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কারণ আমরা জানি, কোনো দল বা প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি মজবুত না হলে তা বেশি দিন টিকতে পারে না। ঠিক তেমনি বিএনপির ভিত্তিই হলো শহীদ জিয়া।

এখন প্রশ্ন হলো, শহীদ জিয়ার সততা এবং ন্যায়নিষ্ঠতা তাঁর অনুসারীদের কে কতটা ধারণ করেছে বা ধরে রাখতে পেরেছে! তাঁর মৃত্যুর পর বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিয়ে যতটুকু আলোচনা করেছি তাতে করে বোঝা যাবে বেগম জিয়াও রাষ্ট্রপতি জিয়ার আদর্শে দল এবং দেশ পরিচালনা করে সাধারণ মানুষের প্রশংসা অর্জন করাসহ একজন জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর ওপর দিয়ে অনেক ঝড়ঝাপটা বয়ে গেলেও তিনি নুয়ে পড়েননি; এমনকি জীবনের ওপর হুমকি আসার পরও তিনি মাথানত করেননি! আবার তারেক রহমানের কথা বলতে গেলেও সে ক্ষেত্রে একই কথা বলতে হয়। তিনি নিজেও অনেক বিপদ-আপদ মোকাবিলা করে শহীদ জিয়া প্রতিষ্ঠিত দলটিকে বিপদমুক্ত রেখেছেন!

লেখক : কলামিস্ট, বীর মুক্তিযোদ্ধা



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews