নতুন সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঘরোয়া ক্রিকেট টুর্নামেন্টগুলোকে আরও পেশাদার, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করে তোলার পাশাপাশি পরিচালনা ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
টুর্নামেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান সিরাজুদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর জানিয়েছেন, পরিকল্পিত সংস্কারের মাধ্যমে বছরে ১৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা সাশ্রয় করবে বিসিবি। সাশ্রয়কৃত অর্থ ক্রিকেটের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করার লক্ষ্য বোর্ডের।
আলমগীরের মতে, বর্তমানে বিসিবি প্রতি বছর ৫০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আয়োজনে ব্যয় করে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, উন্নত পরিকল্পনা ও বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে এই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
বাসস’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আলমগীর বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে, টুর্নামেন্ট পরিচালনার জন্য বিসিবি বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে। সুপরিকল্পিত কিছু উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা ব্যয়গুলো কমাতে পারি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বোর্ড সভাপতির সাথে পরামর্শ করে আমরা আমাদের ঘরোয়া প্রতিযোগিতাগুলোর বিষয়ে বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছি। ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সাথে আমরা পরিকল্পনাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি এবং খুব শিগগিরই এর ফলাফল দৃশ্যমান হবে।’
চট্টগ্রামের অভিজ্ঞ ক্রিকেট সংগঠক আলমগীর জানান, ন্যাশনাল ক্রিকেট লিগ (এনসিএল) টি-টোয়েন্টি এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) চার-দিনের ও একদিনের টুর্নামেন্টগুলোর আর্থিক চাপ শতভাগ বহন করতে আগ্রহী নয় বোর্ড।
প্রস্তাবিত মডেল অনুযায়ী, বিসিবি বিসিএল চার-দিনের টুর্নামেন্ট, বিসিএল একদিনের টুর্নামেন্ট এবং এনসিএল টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টকে একক বাণিজ্যিক প্যাকেজ হিসেবে প্রচার করার পরিকল্পনা করছে। প্রতিটি প্রতিযোগিতায় ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ছয়টি করে দল অংশ নেবে এবং এই সম্মিলিত সূচির জন্য প্রায় ৬০ দিন সময় বরাদ্দ থাকবে।
তবে বিভাগীয় দলগুলোকে নিয়ে আট দলের এনসিএল টুর্নামেন্ট চারদিনের বর্তমান কাঠামোতেই চলবে। পাশাপাশি তিনদিনের এনসিএল ‘সেকেন্ড একাদশ’ বা দ্বিতীয় একাদশ টুর্নামেন্ট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আলমগীর বলেন, ‘আমরা যদি প্রথাগত পদ্ধতিতে এই টুর্নামেন্টগুলো চালিয়ে যাই তবে আমাদের জন্য সেটা আর্থিকভাবে লাভজনক হবে না। এ কারণেই আমরা এগুলোকে বাজারজাত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কার্যকরভাবে খরচ কমিয়ে যে অর্থ সাশ্রয় হবে, তা পরবর্তীতে উন্নয়নমূলক প্রকল্পে বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘরোয়া ক্রিকেটকে কীভাবে আরও কার্যকরভাবে বাজারজাত করা যায়, তা খতিয়ে দেখার জন্য ইতোমধ্যেই বিপণন বিভাগের সাথে আমাদের পরিকল্পনাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি।’
তার মতে, উন্নত বিপণন ব্যবস্থা কেবল বিসিবির আয়ই বাড়াবে না, পাশাপাশি ঘরোয়া প্রতিযোগিতাগুলোকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় করে তুলবে।
প্রস্তাবিত মালিকানা মডেলের আওতায় পারিশ্রমিক বা অর্থ প্রদান সংক্রান্ত জটিলতার আশঙ্কার বিষয়টিও নাকচ করে দেন আলমগীর।
তিনি বলেন, ‘মালিকদের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) মতো কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি দিতে হবে না। তারা শুধুমাত্র বিসিএল ও এনসিএল-এর মতো টুর্নামেন্টে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক প্রদানের ক্ষেত্রে বিসিবি যে কাঠামো অনুসরণ করে সেটিই মেনে চলবে। তাহলে অর্থ প্রদান নিয়ে কোনো জটিলতা সৃষ্টি হবে না এবং একই সাথে বোর্ডের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে।’
আলমগীর বলেন, ‘এই টুর্নামেন্টগুলো বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ার মতো পণ্য। আমার বিশ্বাস হয় না যে ক্রিকেট বোর্ড তাদের নিজস্ব প্রতিযোগিতাগুলো বাজারজাত করতে পারবে না। আমরা যদি স্পনসরদের কাছে বাণিজ্যিক সম্ভাবনাগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারি, তবে আমরা সফলভাবেই এই ইভেন্টগুলোর বাজারজাতকরণ করতে পারব। এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং খুব দ্রুতই এগুলোর ফলাফল দেখা যাবে।’
তিনি আরও জানান, সফল বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে বিসিবি অগ্রিম পারিশ্রমিক প্রদান করতে পারবে খেলোয়াড়দের। এতে দীর্ঘদিনের পারিশ্রমিক বকেয়া থাকার সমস্যার সমাধান হবে।
তিনি বলেন, ‘বিশাল কোনো মালিকানা ফি ধার্য করার প্রয়োজন নেই। প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট পারিশ্রমিক কাঠামো বা অন্য প্রচলিত কাঠামো অনুযায়ী খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক অগ্রিম প্রদান করলেই হবে।’
আলমগীর জানান ‘প্লেয়ার এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’ বা খেলোয়াড় আদান-প্রদানের কর্মসূচির মাধ্যমে ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় বিদেশি খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্লেয়ার এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে বিদেশি খেলোয়াড়দের নিয়ে আসার খরচও কমে আসবে। একই সাথে, এটি আমাদের প্রতিযোগিতাগুলোকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় করে তুলবে। বিদেশি ক্রিকেটারদের সাথে ড্রেসিং রুম ভাগ করে নিলে স্থানীয় খেলোয়াড়রা অনেক বেশি উপকৃত হবে। একইভাবে এই কর্মসূচির আওতায় খেলোয়াড়রাও বিদেশের টুর্নামেন্টে অংশ নেবে এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করবে।’
পাশাপাশি দেশের প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে বিসিবি দু’টি নতুন প্রতিযোগিতা চালুর পরিকল্পনা করছে। একটি হলো- অনূর্ধ্ব-২৩ ক্রিকেটারদের জন্য ‘রাইজিং স্টার’ টুর্নামেন্ট এবং অন্যটি- ‘আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট লিগ’।
আলমগীর বলেন, ‘আমরা ঘরোয়া ক্রীড়াসূচিতে ‘রাইজিং স্টার’ প্রতিযোগিতা এবং ‘আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট লিগ’ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছি। আমাদের বিশ্বাস এই টুর্নামেন্টগুলো খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে এবং এগুলো বাস্তবায়নে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তিনি আরও জানান, জেলা পর্যায়ের ক্রিকেট প্রতিযোগিতাগুলো পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হবে এবং বিসিবি থেকে প্রতিটি জেলা ৫ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবে।
আলমগীর বলেন, ‘প্রথম ধাপে ২০টি জেলায় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে। এ বিষয়ে আমরা ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছি। দ্বিতীয় ধাপে আরও ২০টি জেলা তাদের টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে এবং অবশিষ্ট ২৪টি জেলা চূড়ান্ত ধাপে তাদের প্রতিযোগিতা আয়োজন করবে।’