আসন্ন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে আসছে বেশ কিছুু পরিবর্তন। বিশেষ করে মাধ্যমিকের বিভিন্ন ইতিহাসকেন্দ্রিক পাঠ্যসূচিতে আসছে ব্যাপক পরিবর্তন। আর নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের মোট ১৩৫টি বইয়ে ব্যাপকভাবে বানান এবং নানা অসঙ্গতি বা ভুলেরও সংশোধন করা হয়েছে। তবে এসব কিছুুই করা হচ্ছে একবছরের জন্য। কেননা ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন কারিকুলামের আলোকেই সাজানো হবে নতুন পাঠ্যবই। সেখানে নতুনভাবে সবকিছুু সময়ের চাহিদা প্রযুক্তিনির্ভর কন্টেন্ট দিয়ে প্রস্তুত করা হবে।
পাঠ্যবইয়ের কারিকুলাম নিয়ে কাজ করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে বড় পরিসরে পরিমার্জনের কাজ শেষ হয়েছে। এনসিটিবি জানিয়েছে, প্রাথমিকের ৩৬টি এবং মাধ্যমিকের ৯৯টি বইয়ের বিষয়বস্তু বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পর্যালোচনা ও সংশোধন করা হচ্ছে। বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণ মিলিয়ে মোট ৬০১টি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। এ কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, বিষয়-বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ বিদ্যালয়-শিক্ষক, সম্পাদকসহ তিন শতাধিক বিশেষজ্ঞ যুক্ত রয়েছেন। এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, এবারের পরিমার্জনের মূল লক্ষ্য নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন নয়; বরং বিদ্যমান পাঠ্যবইয়ের তথ্যগত ভুল, ভাষাগত দুর্বলতা, বানান, চিত্র, অনুশীলনী এবং বিতর্কিত বা অস্পষ্ট অংশ সংশোধন করে বইগুলোকে আরো নির্ভুল, শিক্ষার্থীবান্ধব ও যুগোপযোগী করা।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়গুলোতে। বিভিন্ন সময় ইতিহাসের তথ্য উপস্থাপন নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা দূর করতে একাধিক বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করছে। মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর, ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঘটনাগুলোর উপস্থাপনা তথ্যনির্ভর ও ভারসাম্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি তথ্যগত অসঙ্গতি, সাল-তারিখ ও ব্যক্তির পরিচয়সংক্রান্ত ভুলও সংশোধন করা হচ্ছে। বাংলা বিষয়ের বইয়ে ভাষা আরো সহজ ও বয়সোপযোগী করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ ও জটিল বাক্য সংক্ষিপ্ত করা, বানান ও যতিচিহ্নের ভুল সংশোধন, কিছুু কবিতা ও গল্পের অনুশীলনী পুনর্বিন্যাস এবং পাঠের উপস্থাপনা উন্নত করার কাজ চলছে। ইংরেজি বইয়ে যোগাযোগভিত্তিক (ঈড়সসঁহরপধঃরাব) শিক্ষা জোরদার করতে জবধফরহম, ডৎরঃরহম, ঝঢ়বধশরহম এবং খরংঃবহরহম দক্ষতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যক্রম যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
গণিত ও বিজ্ঞান বইয়েও পরিবর্তন আসছে। গণিতে বাস্তব জীবনের উদাহরণ বৃদ্ধি, যুক্তিভিত্তিক সমস্যা সমাধানের অনুশীলনী সংযোজন এবং অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি কমানোর কাজ চলছে। বিজ্ঞান বইয়ে হালনাগাদ বৈজ্ঞানিক তথ্য, পরীক্ষণভিত্তিক কার্যক্রম, উন্নত চিত্র ও তথ্যছক সংযোজন করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভর না হয়ে ধারণাভিত্তিক শিক্ষা লাভ করতে পারে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও), ডিজিটাল নিরাপত্তা, রোবোটিক্স এবং নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা ও জীবনদক্ষতার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে।
এনসিটিবি সূত্রে আরো জানা গেছে, চতুর্থ শ্রেণীতে ‘খেলাধুলা ও সংস্কৃতি’ নামে নতুন একটি বই সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দেশের জনপ্রিয় খেলাধুলা, শারীরিক সক্ষমতা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সাথে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পরীক্ষামূলকভাবে ‘খবধৎহরহম রিঃয ঐধঢ়ঢ়রহবংং’ নামে একটি বই এবং কারিগরি শিক্ষার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। পরিমার্জনের পুরো প্রক্রিয়া কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হচ্ছে। প্রথমে লেখক ও বিষয়-বিশেষজ্ঞরা খসড়া প্রস্তুত করছেন। এরপর সম্পাদকীয় পর্যালোচনা, বিশেষজ্ঞ কমিটির মূল্যায়ন, জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির মতামত এবং শেষ পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি মুদ্রণে যাবে। এর মাধ্যমে তথ্যগত ভুল ও সম্পাদনাগত ত্রুটি কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, পাঠ্যবইয়ের মানোন্নয়নের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও শুধু বই সংশোধন করলেই কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না। সেই সাথে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন পদ্ধতির উন্নয়ন এবং শ্রেণীকক্ষে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। তাদের মতে, পাঠ্যবই এমনভাবে প্রস্তুত হওয়া উচিত, যাতে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে বারবার মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন না পড়ে; বরং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, জাতীয় ঐকমত্য ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে বই প্রণয়ন করা হয়।
এনসিটিবির সদস্য (কারিকুলাম) প্রফেসর ফাতিহুল কাদির সম্রাট গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, পাঠ্যবইয়ের পরিমার্জনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আমরা এখন চূড়ান্তভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছি। পাঠ্যবই মুদ্রণের টেন্ডার প্রক্রিয়াও শেষের পথে। হয়তো আগামী সপ্তাহে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত হয়ে যাবে। এর পরেই পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ শুরু হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, প্রাথমিক বইয়ে তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। আর মাধ্যমিকের অধিকাংশ বইয়ে বানান এবং কোনো বড় ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে সেগুলো শুদ্ধ করা হবে। আর ইতিহাস ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে ইতিহাস নির্ভর কোনো বিষয়ে অসঙ্গতি থাকলে সেটা দূর করা হবে। পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক কোনো বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হবে না। ইতিহাসে যার যতটুকু প্রাপ্য তাকে ঠিক সেভাবেই উপস্থাপন করা হবে।