দেশের বিভিন্ন স্থানে দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ, মিছিল, দফতর ঘেরাও এবং ভাঙচুরের ঘটনায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যমান বিধিবিধান ও নিয়মকানুন মেনে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তাদের প্রতিনিয়ত নানামুখী রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মাঠ পর্যায়ে সরকারি দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বুধবার ‘ফ্যামিলি কার্ড শুমারি-২০২৬’-এর তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগের ফলাফল প্রকাশকে কেন্দ্র করে নাটোরের বাগাতিপাড়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর চালিয়েছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সোহেল রানার নেতৃত্বে একটি মিছিল উপজেলা পরিষদ চত্বরে গিয়ে ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা ইউএনওর কক্ষের দরজায় লাথি মারেন এবং অফিসের সামনে রাখা চেয়ার ও ফুলের টব ভাঙচুর করেন। তাদের মূল অভিযোগ ছিল- নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় না রেখে রাজনৈতিক বিবেচনায় আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠদের সুযোগ দেয়া হয়েছে এবং ত্যাগের মূল্যায়ন না করে ছাত্রদল কর্মীদের বাদ দেয়া হয়েছে।
সরকারের বহুল আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি মাঠে গড়ানোর শুরুতেই সারা দেশে কর্মীদের নিয়োগ ঘিরে এমন বৈষম্য ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, অনৈতিক সুপারিশ এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের বাদ দেয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে অনেক স্থানে। একের পর এক উপজেলায় নিয়োগ তালিকা বাতিল, পুনর্নিয়োগের দাবি এবং ইউএনওদের অপসারণ চেয়ে বিক্ষোভে নেমেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ফলে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার চিহ্নিতকরণের এই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের শুরুতেই প্রশ্ন উঠেছে- মাঠকর্মী বাছাইয়ে যোগ্যতা ও নীতিমালা প্রাধান্য পাচ্ছে নাকি রাজনৈতিক পরিচয় ও তদবিরের জোর কাজ করছে?
গাইবান্ধার ফুলছড়িতে গত সোমবার ফ্যামিলি কার্ড শুমারির ফল প্রকাশের পর নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ইউএনও কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়। মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ অকৃতকার্য প্রার্থীরা ফল বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং ইউএনও কার্যালয়ের একটি কক্ষের জানালা, বারান্দার চেয়ার ও ফুলের টব ভাঙচুর করেন। এ প্রসঙ্গে ফুলছড়ি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জয়নাল মিয়া অভিযোগ করেন, আগে দুইবার কাজের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্ত তালিকায় তাকে বাদ দেয়া হয়েছে।
একই অভিযোগে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জেও মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীরা ইউএনও এবং উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং উভয় কর্মকর্তার বদলি দাবি করেন।
অন্য দিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে সোমবার রাতে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আরিয়ান সরকার আরিফ ও সদস্যসচিব সোহেল রশিদ হৃদয়ের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করা হয়। তারা ইউএনও আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লার অপসারণ দাবি করেন। ছাত্রদল নেতা আরিফের অভিযোগ, সরকারকে হেয় করার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং বঞ্চিতদের অধিকার আদায়েই তারা আন্দোলনে নেমেছেন।
সাদুল্লাপুরেও সোমবার রাতে বিক্ষোভ করে ইউএনও কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয় ছাত্রদল। উল্লেখ্য, এই উপজেলায় নিয়োগ পরীক্ষা দুই ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ধাপের পর তৎকালীন ইউএনও মাহমুদুল হাসান বদলি হলে গাইবান্ধা সদর ইউএনও সবুজ কুমার বসাক সাদুল্লাপুরের অতিরিক্ত দায়িত্ব নেন। দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষা শেষে ফল প্রকাশের পর বিতর্ক সৃষ্টি হয়। উপজেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ইসতিয়াক আহমেদ সোহান ও সদস্যসচিব পারভেজ সরকারের দাবি- কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে এই ফল তৈরি হয়েছে। তারা প্রক্রিয়াটি বাতিল করে নতুন নিয়োগের জন্য দুই দিনের সময়সীমা বেঁধে দেন।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ড শুমারিতে ছাত্রদল কর্মীদের নিয়োগ না দেয়ায় ইউএনও ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো: কায়েসুর রহমানকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করার হুমকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে রাজগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি পদপ্রার্থী কামরুল হাসান নিসানের বিরুদ্ধে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়; পরে তিনি অন্য একটি ভিডিও বার্তায় ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে সোমবার নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে বিএনপি, ছাত্রদল ও বঞ্চিত আবেদনকারীরা উপজেলা চত্বরে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভকারীরা ইউএনও প্রিয়াংকা দাস এবং সমাজসেবা কর্মকর্তা সোহেল রানার অপসারণ দাবি করে ইউএনও কার্যালয়, সমাজসেবা, শিক্ষা অফিস ও এলজিইডিসহ প্রধান সরকারি দফতরগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেন। এতে প্রায় দুই ঘণ্টা সব ধরনের দাফতরিক কাজ স্তব্ধ হয়ে পড়ে। তাদের অভিযোগ- আর্থিক লেনদেন এবং আওয়ামী লীগ ও জামায়াত-শিবির কর্মীদের প্রাধান্য দিয়ে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের গৌরীপুরেও অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে জানা যায়, সুপারভাইজার পদে আবেদন করে কেউ তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, আবার অকৃতকার্য হয়েও অনেকে তালিকায় স্থান পেয়েছেন। অনিয়মের প্রতিবাদে এবং একজন ছাত্রলীগ নেতা উত্তীর্ণ হওয়ায় এক ছাত্রদল নেতা পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তবে নিয়োগ কমিটির সভাপতি আফিয়া আমীন পাপ্পা সব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, বিধিমোতাবেক লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে মেধাক্রম অনুযায়ী নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ইউএনও ফারজানা আখতারের বিরুদ্ধে নিয়োগে অনিয়ম ও ‘স্বৈরাচার পুনর্বাসনে’র অভিযোগ তুলে ‘কুমারখালী পতিত স্বৈরাচার বিরোধী নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে উপজেলা ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ ও ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে। আন্দোলনকারীরা ইউএনওর কুশপুতুল দাহ করে এবং কার্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশের সাথে ধস্তাধস্তি হয়। পরে ইউএনও দোতলা থেকে আন্দোলনকারীদের তথ্য পুনরায় যাচাইয়ের আশ্বাস দিলে তারা ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে স্থান ত্যাগ করে।
যশোরের একাধিক উপজেলাতেও নিয়োগ পরীক্ষার ফল নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পরীক্ষা ও ভাইভা না দিয়েও চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাওয়ার মতো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচিত হচ্ছে। গত রোববার কেশবপুর ইউএনও কার্যালয় চত্বরে নিয়োগবঞ্চিতরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে অনিয়ম ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো ৯ আগস্ট বিক্ষোভ মিছিল ও ইউএনও কার্যালয়ে স্মারকলিপি প্রদান করে। এতে পৌর যুবদলের আহ্বায়ক মাহাবুবুর রহমান বিপ্লব, মৎস্যজীবী দলের সভাপতি বেলাল উদ্দিন বুশ এবং ছাত্রদল সভাপতি বেদার উদ্দিন বিদ্যুৎসহ স্থানীয় নেতারা অংশ নেন।
মৌলভীবাজারের রাজনগরে মঙ্গলবার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা চলাকালে ‘সরকারবিরোধীদের’ নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ তুলে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা উপজেলা পরিষদে হট্টগোল ও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। পরে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্বাস আলীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
সার্বিক বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাঠ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা প্রশাসনিক আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার সাথে যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের মনপুত না হলেই তারা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলছেন এবং সরকারি কাজে বাধা দিচ্ছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে মাঠ পর্যায়ে দৈনন্দিন দাফতরিক ও প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা অচিরেই অসম্ভব হয়ে পড়বে।