বর্তমান যুগে রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখল বা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিযোগিতা নয়; এটি ভাষা, প্রতীক, আবেগ, মনস্তত্ত্ব এবং কৌশলগত যোগাযোগের এক বহুমাত্রিক ক্ষেত্র। দৃশ্যমান বক্তব্যের আড়ালে প্রায়শ কাজ করে অদৃশ্য বয়ান-নির্মাণের প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য থাকে গণমানুষের চিন্তা, অনুভূতি, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করা। রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই ভাষা কখনো নিছক যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং তা হয়ে ওঠে প্রভাব বিস্তার, বৈধতা নির্মাণ, প্রতিপক্ষকে অবমাননা এবং জনমত নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্ম অস্ত্র।  এই জটিল বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ‘উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত’ ধারণাটি তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণী কাঠামো হিসেবে সামনে আনা যেতে পারে, যা রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা, তার মনস্তত্ত্ব এবং এর অন্তর্নিহিত অনৈতিক কৌশলকে উন্মোচন ও ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে। এ শব্দবন্ধটিকে কেবল ভাষার একটি অলংকারিক রূপক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি রাজনৈতিক যোগাযোগ (পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন), প্রোপাগান্ডা স্টাডিজ, মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবতত্ত্ব এবং সমালোচনামূলক বচন-বিশ্লেষণের (ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স অ্যানালাইসিস) আলোকে বিশ্লেষণযোগ্য একটি কাঠামো, যেখানে ভাষা কেবল বাস্তবতাকে বর্ণনা করে না, বরং বাস্তবতাকে নির্মাণও করে। ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক নরম্যান ফেয়ারক্লাফ (১৯৪১-) দেখিয়েছেন, ক্ষমতা ও ভাষার সম্পর্ক কখনো নির্দোষ নয়; রাজনৈতিক ভাষা প্রায়ই এমনভাবে নির্মিত হয়, যাতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বৈধ এবং অন্য গোষ্ঠীকে অগ্রহণযোগ্য বা ‘অপর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। ফলে রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষায় ধীরে ধীরে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের জায়গা দখল করে আবেগ, ভয়, সন্দেহ ও ঘৃণার রাজনীতি ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস।

এই প্রেক্ষাপটে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর (১৯২৬-১৯৮৪) ‘ক্ষমতা ও জ্ঞান’ (পাওয়ার অ্যান্ড নলেজ) ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, জ্ঞান ও সত্য কখনো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়; বরং ক্ষমতার বিন্যাসের মধ্য দিয়েই ‘সত্য’ গঠিত, প্রচারিত এবং পুনর্গঠিত হয়। অর্থাৎ যে গোষ্ঠী ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করে, তারা অনেক সময় ভাষা ও বয়ানের মাধ্যমেই ঠিক করে দেয় কোনটি গ্রহণযোগ্য সত্য এবং কোনটি অগ্রহণযোগ্য। একইভাবে ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ (কালচারাল হেজিমনি) তত্ত্ব দেখায়, শাসকগোষ্ঠী কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমেও নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখে। গণমাধ্যম, রাজনৈতিক ভাষণ, সামাজিক প্রচারণা কিংবা সাংস্কৃতিক বয়ানের মাধ্যমে এমন এক মানসিক পরিবেশ তৈরি করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ নিজেদের অজান্তেই অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘অপরিহার্য’ বলে মেনে নিতে শুরু করে। রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা তাই কেবল প্রতিপক্ষকে সমালোচনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষকে ‘অপরায়ণ’ (আদারিং) প্রক্রিয়ায় কোণঠাসা করে ফেলে। এই অপরায়ণের লক্ষ্য হয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে যুক্তির ময়দান থেকে সরিয়ে নৈতিক, সামাজিক কিংবা মানসিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হলো, ঘৃণা, অপবাদ, গুজব কিংবা মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণের ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত রাজনৈতিক বয়ান সাময়িকভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা টেকসই সামাজিক আস্থা গড়ে তুলতে পারে না। কারণ মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম প্রচারণার সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেই ফেলে।

সাধারণ জনগণের কাছে রাজনৈতিক সম্মতি আদায়ের কূটকৌশলী প্রক্রিয়াটি প্রায়শই শুরু হয় ‘উপ্ত’ স্তরের মধ্য দিয়ে। এই স্তরে মূলত গণমানুষের চেতনায় একটি নির্দিষ্ট ধারণা, ভয় কিংবা সন্দেহের বীজ বপন করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘিরে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করার লক্ষ্যে সচেতনভাবে কিছু শব্দ, প্রতীক, অভিযোগ ও ইঙ্গিত ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণটি সাধারণত প্রত্যক্ষ নয়; বরং এটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে মানুষের মনে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে অবিশ্বাস, আশঙ্কা কিংবা নৈতিক অস্বস্তি গড়ে তোলা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বপনকৃত ধারণাগুলো সামাজিক আলোচনায়, গণমাধ্যমে, রাজনৈতিক বক্তৃতায় এবং দৈনন্দিন কথোপকথনে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে একসময় তা অনেকের কাছেই ‘স্বাভাবিক সত্য’ বলে মনে হতে শুরু করে। সামাজিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটি ‘কাঠামোবদ্ধতার প্রভাব’ (ফ্রেইমিং ইফেক্ট) এবং ‘উদ্দেশ্য নির্ধারণ’ (এজেন্ডা সেটিং) কৌশলের একটি সম্মিলিত প্রয়োগ, যেখানে একটি নির্দিষ্ট বয়ানকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে মানুষের উপলব্ধি ও বিচারবোধ সেই কাঠামোর ভিতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অর্থাৎ মানুষ কী ভাববে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষকে কী নিয়ে ভাবানো হবে। মার্কিন অর্থনীতিবিদ এডওয়ার্ড স্যামুয়েল হারম্যান (১৯২৫-২০১৭) এবং ভাষাতাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কির (১৯২৮-) ‘প্রোপাগান্ডা মডেল’ এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে। তাঁদের মতে, গণমাধ্যম প্রায়ই নিরপেক্ষ তথ্যবাহক হিসেবে নয়, বরং একটি ‘ছাকনি পদ্ধতি’ (ফিল্টারিং সিস্টেম) হিসেবে কাজ করে, যা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে কোনো ধারণা বারবার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে তা প্রশ্নাতীত সত্যের মর্যাদা পেয়ে যায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অপরায়ণ প্রক্রিয়ায় এই ‘উপ্ত’ ধাপের বহুমাত্রিক প্রয়োগ বারবার দৃশ্যমান হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বা ট্যাগকে পরিকল্পিতভাবে প্রচার করা হয়েছে। কখনো ‘রাজাকার’, কখনো ‘স্বৈরাচার’, কখনো ‘দেশবিরোধী’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি’, আবার কখনো ‘পাকিস্তানি দালাল’ বা ‘ভারতীয় দালাল’- এই ধরনের ভাষাগত লেভেলিং কেবল রাজনৈতিক মতভেদের পরিচায়ক নয়; বরং এটি একটি নৈতিক বিচারের রায় আরোপের কৌশলও বটে। এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে যুক্তি কিংবা তথ্য-উপাত্তনির্ভর প্রমাণের ক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়। ফলে রাজনীতি আর কেবল নীতিগত মতবিনিময়ের ক্ষেত্র থাকে না; তা পরিণত হয় ‘নৈতিক বৈধতা বনাম নৈতিক অযোগ্যতা’র এক সংঘাতে। এখানেই ভাষা প্রতিপক্ষকে আক্রমণের অস্ত্র হয়ে ওঠে, আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ধীরে ধীরে ‘অপর’-এ রূপান্তরিত হয়। এরপর আসে ‘সুপ্ত’ স্তর, যেখানে সম্ভাব্য পরিবর্তন, নতুন চিন্তা কিংবা সংস্কারের আকাক্সক্ষাকে নিঃশব্দে নিস্তেজ করে দেওয়া হয়। এটি সরাসরি দমন নয়; বরং জনমনে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ক্লান্তি উৎপাদনের কৌশল। যখন কোনো সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের দাবি জোরালো হতে শুরু করে, তখন সেই দাবিকে প্রকাশ্যে অস্বীকার না করে বরং সময়ক্ষেপণ, আংশিক স্বীকৃতি, বিভ্রান্তিকর আশ্বাস কিংবা অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ‘ঘুম পাড়িয়ে’ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে তার প্রতিবাদী শক্তি ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। এখানে ওয়াল্টার লিপম্যানের (১৮৮৯-১৯৭৪) ‘সম্মতি তৈরি’ (ম্যানুফেকচারিং কনসেন্ট) ধারণা এবং উল্লেখিত হারম্যান-চমস্কির বিশ্লেষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ক্ষমতাসীন বয়ান এমনভাবে পরিবেশিত হয় যে মানুষ নিজের অজান্তেই সেই বয়ানের সঙ্গে আপস করে ফেলে, কিংবা অন্তত বিরোধিতা করার নৈতিক তাগিদ হারিয়ে ফেলে। মনোবিজ্ঞানে একে অনেক সময় ‘চেনাজানা অসহায়ত্ব’ (লার্ন্ড হেল্পলেসনেস)-এর সঙ্গেও তুলনা করা যায়, যেখানে মানুষ বারবার ব্যর্থতা বা প্রতিরোধহীনতার অভিজ্ঞতায় একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করে যে পরিবর্তন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শিক্ষার্থী আন্দোলন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আন্দোলন কিংবা নাগরিক সমাজের বিভিন্ন দাবিকে প্রায়ই এই সুপ্ত কৌশলের মুখোমুখি হতে দেখা গেছে। আন্দোলনকে সরাসরি দমন না করে কখনো সংলাপের আশ্বাস, কখনো বিভক্তি সৃষ্টি, কখনো আংশিক দাবি মেনে নেওয়ার অভিনয়, এসবের মাধ্যমে তার গতি মন্থর করে দেওয়া হয়েছে। ফলে জনমনে জন্ম নেয় ক্লান্তি, হতাশা ও দীর্ঘস্থায়ী অনীহা; যা শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাকেই শক্তিশালী করে।

তৃতীয় ধাপ গুপ্ত; এটি হলো অন্তরাল থেকে পরিচালিত মনস্তাত্ত্বিক ও তথ্যগত কৌশলের স্তর। এখানে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে থেকে গোপনে প্রচারণা, অপপ্রচার, বিভ্রান্তি কিংবা চরিত্রহননের কাজ পরিচালিত হয়। এই পর্যায়ে তথ্যবিকৃতি, গুজব ছড়ানো, আংশিক সত্যকে পূর্ণ সত্য হিসেবে উপস্থাপন, কিংবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করা হয়। ফলে জনগণ অনেক সময় বুঝতেই পারে না কোনটি বাস্তব, আর কোনটি নির্মিত বয়ান। সত্য ও মিথ্যার সীমানা ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাপসা করে দেওয়া হয়। ডিজিটাল যুগে এই গুপ্ত প্রক্রিয়া আরও জটিল ও বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। অ্যালগরিদমিক বায়াস, ইকো-চেম্বার, বটনিয়ন্ত্রিত প্রচারণা, মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষের মনোজগতকে প্রভাবিত করার নতুন নতুন কৌশল তৈরি হয়েছে। মার্কিন সমাজ-মনোবিজ্ঞানী সোসানা জুবফের (১৯৫১-) ‘নজরদারি পুঁজিবাদ’ (সার্ভাইল্যান্স ক্যাপিটালিজম) ধারণা এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের আচরণগত তথ্য (বিহেভিয়ারাল ডেটা) সংগ্রহ করে তাদের সিদ্ধান্ত, পছন্দ ও রাজনৈতিক প্রবণতাকে প্রভাবিত করার এক নতুন অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই গুপ্ত কৌশল আরও সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী হয়েছে। নামবিহীন প্রচারণা, সংগঠিত ট্রল-সংস্কৃতি, বিভ্রান্তিমূলক ভিডিও, বিকৃত তথ্য কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফটোকার্ড গুজবের মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সরাসরি মোকাবিলা না করেও তাকে ঘিরে একধরনের নেতিবাচক আবহ তৈরি করা সম্ভব হয়, যা ধীরে ধীরে সামাজিক উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে।

সবশেষে আসে ‘লুপ্ত’ স্তর, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কার্যত জনপরিসর থেকেই মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এটি কেবল প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে না; বরং সামাজিক বা সামষ্টিক স্মৃতি, নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জন-আলোচনার পরিসর থেকেও তাকে অদৃশ্য করে দেওয়ার প্রয়াস চালানো হয়। কোনো ব্যক্তি, দল বা মতাদর্শকে যদি দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়, তবে একসময় তার বক্তব্য, উপস্থিতি ও রাজনৈতিক বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন তার মতামতকে গুরুত্বহীন, অপ্রাসঙ্গিক কিংবা বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ হয়ে যায়। যোগাযোগতত্ত্বে এই প্রক্রিয়াকে ‘প্রতীকী নিশ্চিহ্নকরণ’ (সিম্বলিক অ্যানাইহিলেশন) বলা হয়। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বুর্দিয়োর (১৯৩০-২০০২) ‘প্রতীকী ক্ষমতা’ (সিম্বলিক পাওয়ার) ধারণাটিও এখানে গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি দেখিয়েছেন, ভাষা, প্রতীক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মাধ্যমে এমন এক ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়, যা অনেক সময় প্রত্যক্ষ সহিংসতার চেয়েও কার্যকর। কারণ দৃশ্যমান দমন প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু প্রতীকী দমন মানুষের চেতনাকেই পরিবর্তন করে দেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরোধী কণ্ঠকে প্রান্তিক করে দেওয়া, তাদের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত করা, কিংবা তাদের বক্তব্যকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা এই লুপ্ত প্রক্রিয়ারই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি গভীর  সত্য হলো, কোনো মত, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তিকে ভাষাগত ও প্রতীকীভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা সাময়িক সাফল্য আনতে পারলেও তা স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতি বা সামাজিক আস্থা তৈরি করতে পারে না। কারণ দমন করা বাস্তবতা প্রায়শই নতুন রূপে, নতুন ভাষায় এবং নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে আবার ফিরে আসে।

♦ লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews