পাকিস্তানকে চার দিক থেকে চেপে ধরার সব আয়োজন করেছিল ভারত। অর্থনীতি কূটনীতি সমরনীতি সব ক’টি ফ্রন্টে পরাজিত করার অব্যর্থ কৌশল সাজিয়েছিল। গত কয়েক দশকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান জয়ও পেয়েছে ভারত। ক্রিকেটে যেমন তারা পাকিস্তানকে টানা পরাস্ত করছিল অনেকটা তেমনই। একসময় মনে হয়েছে, চিরবৈরী দেশ দু’টির মধ্যে শক্তির ভারসাম্য প্রবলভাবে ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ২০২৫ সাল থেকে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, এবার চাকা যেন উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করেছে। ভারতের মোকাবেলায় বিভিন্ন ফ্রন্ট খুলতে হয়নি পাকিস্তানকে। ভারত তার নিজেরই পাতা ফাঁদে পড়েছে। চালবাজি ও খুচরা চালাকি করতে গিয়ে ভারত ম্রিয়মাণ হয়ে গেল, যখন পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে ক্রমে উজ্জ্বল হচ্ছে। ভারতের সৃষ্ট চর্তুমুখী চাপ থেকে বের হয়ে আসার সব পথ প্রকৃতি যেন পাকিস্তানের জন্য খুলে দিলো।
বাংলাদেশকে তার খাস তালুক বানিয়ে নিয়েছিল ভারত। দিল্লির অঙ্গুলি হেলনে ঢাকায় সব সিদ্ধান্ত হতো। কোন দেশের সাথে সম্পর্ক করা যাবে, কোন দেশের সাথে যাবে না— তা তারাই নির্ধারণ করে দিত। এর মধ্যে পাকিস্তান ছিল বাংলাদেশের জন্য নিষিদ্ধ দেশ। এই দেশের সাথে বাংলাদেশ কোনো সম্পর্কই রাখতে পারত না। নামমাত্র দুই দেশে দূতাবাস ছিল বটে, সব ধরনের যোগাযোগ ছিল বন্ধ। বাণিজ্য অর্থনৈতিক লেনদেন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। নিরাপত্তা প্রতিরক্ষা সম্পর্ক পুরোপুরি কাট-অফ করা হয়। দেড় দশকের শেখ হাসিনার শাসনে একবারও দুই দেশের পরররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক হয়নি। আরো উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের প্রশ্নই আসে না। বিভিন্ন ইস্যুতে পাকিস্তান অনেক সময়ই বাংলাদেশের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে; কিন্তু সেই সাহায্যও নেয়া হয়নি ভারতকে খুশি রাখার জন্য।
এমনকি পাকিস্তান-বিষয়ক আলাপও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়। কাউকে পাকিস্তানি ট্যাগ দেয়া গেলে তার সম্মান-সম্পদ ও জীবন খরচযোগ্য করা হয়েছিল। নাগরিকদের অধিকার হরণের জন্য তার বিরুদ্ধে এ লেবেলটি দাগিয়ে দেয়া হতো। বিরোধীদের দমনের জন্য তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি রাজাকার তকমা দেয়া ছিল সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, হাসিনার পতন ও পালানোর কারণও হয়েছিল পাকিস্তান-বিষয়ক ট্যাগ ‘রাজাকার’। জুলাইতে তরুণরা হাসিনাকে ভারতে তাড়িয়ে দেয়ার পর আপনা হতেই পাকিস্তানের জন্য বাংলাদেশের দুয়ার খুলে গেল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসেন। সূত্রপাত হয় দেশ দু’টির মধ্যে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পর আবার উষ্ণ সম্পর্কের। একই বছরের আগস্টের শেষ সপ্তাহে আসেন দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। চালু হয় দেশ দু’টির মধ্যে বহু বছর বন্ধ হয়ে থাকা সরাসরি আকাশ যোগাযোগ।
পাকিস্তানে ৩০ লক্ষাধিক বাংলাদেশী আছেন। এদের বড় একটি অংশ ১৯৭১ সালে দেশটিতে আটকা পড়েন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবারো বাংলাদেশ থেকে বিহারিসহ বহু মানুষ পাকিস্তানে গেছেন। বিশেষ করে পুরনো মেগাসিটি করাচিতে এদের বসবাস। ওই শহরে ২০ লাখ বাংলাদেশী আছে। এই বিপুল বাংলাদেশীকে নিয়ে পাকিস্তান কখনো অভিযোগ করেনি। বাংলাদেশীরাও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেন না। তাদেরকে দেশটি থেকে তাড়িয়ে দেয়ার হুমকি-ধমকিও পাকিস্তানের নেতারা প্রতিদিন দেয় না।
ভারতের ক্ষমতাসীনরা এক দিকে বাংলাদেশের সাথে উষ্ণ বন্ধুত্বের দাবি করে, অন্য দিকে প্রতিদিন সে দেশ থেকে কথিত বাংলাদেশীদের তাড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। বাংলাদেশীদের ছুচো ইঁদুরসহ অন্যান্য হীন প্রাণীর সাথে তুলনা করে। পাকিস্তানে থাকা বাংলাদেশীদের একটি অংশ নিয়মিত দেশে যাতায়াত করে। হাসিনার পুরো সময়ে তাদের মধ্যপ্রাচ্য হয়ে কয়েক হাজার কিলোমিটার ঘুরে দেশে আসতে হয়েছে। এই যোগাযোগ ছিল বেশ দুঃসাধ্য ও ব্যয়বহুল। এদের সংখ্যা বেশ বড় হলেও সরাসরি ফ্লাইট চলাচল করতে দেয়া হয়নি। পাকিস্তানে থাকার জন্যও এ সময় বাংলাদেশীদের মাশুল দিতে হয়েছে।
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে একটি দৃঢ় গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশীরা যখন পাকিস্তান ট্যুরে যায়, তা অনুভব করা যায়। সেটি ভারতের সম্পূর্ণ বিপরীত। চিকিৎসা গ্রহণ, ভ্রমণ কিংবা পড়তে গিয়ে বাংলাদেশীরা নিয়মিত উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা নিগ্রহের শিকার হন ভারতে। অপমান-লাঞ্ছনা নিত্যকার ঘটনা। পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনাও তারা ঘটিয়েছে। পাকিস্তানে দেখা যায়, তারা বাংলদেশীদের আপ্যায়ন করছে। রেস্টুরেন্টে খাবার বিল নিচ্ছে না। ক্ষেত্রবিশেষে দাম কম রাখছে। এর পরও ভারতের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী পাকিস্তান বাংলাদেশের শত্রুরাষ্ট্র। এটি সবাইকে মানতে হবে। অন্য দিকে সীমান্তে পাখির মতো হত্যা করে, উজানে পানি বঞ্চিত করেও ভারতকে বাংলাদেশের বন্ধু বলতে হবে। জোর করে বন্ধুত্বের এই তকমা বাংলাদেশকে দীর্ঘকাল বহন করতে হয়েছে। প্রতিটি ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তারই পরিণাম এখন ভোগ করতে শুরু করেছে ভারত। এখন তাদের পূর্ব-পশ্চিমে থাকা দেশ দু’টি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক এখন আরো গভীর হচ্ছে। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান ও দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি দুই দেশের মধ্যে চলা টেস্ট ক্রিকেট উপলক্ষে বাংলাদেশ সফর করেছেন। খেলা দেখতে এসে তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সাথে বৈঠক করেছেন। দেখা গেল, বেশ কয়েকটি বিষয়ে তাদের মধ্যে একসাথে কাজ করার ক্ষেত্র চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে ব্যবসায়-বাণিজ্য, ক্রীড়া, সংস্কৃতি, নারী উদ্যোক্তা, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি রয়েছে। মাদক চোরাচালান, মানবপাচারসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন নিয়ে নিজেদের তথ্য আদান-প্রদান বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে ১০ বছর মেয়াদি গোয়েন্দা চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। একচেটিয়া নয়াদিল্লি যেভাবে বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে বসেছিল, তা এখন আপনা থেকে খসে পড়ছে।
ভারতের নিজের নিরাপত্তার ইস্যুর অজুহাত দেখিয়ে শেখ হাসিনার সময় বাংলাদেশের ওপর একধরনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। এ ব্যাপারে দেশটির বরাবর এক যুক্তি, তা হচ্ছে— তাদের সেভেন সিস্টার্সে বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন। বাস্তবে দেখা গেল, আমাদের নিরাপত্তাবাহিনীগুলোকে তারা একধরনের হেজিমনি চাপিয়ে দিলো। হাসিনার দেড় দশক সময়ে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা মানবাধিকার ও বাঁচার অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে। সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর সদর দফতরে যেখানে ‘র’-এর অফিস স্থাপিত হয়েছিল, সেখানে আয়নাঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এই গোপন কারাগারে বন্দীদের ওপর নির্মম নির্যাতন করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের প্রতিটি বাহিনীর ভেতর আরেকটি পেশাদার খুনে বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল। দেখা গেল, সেভেন সিস্টার্সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে আমাদের নিজেদের নিরাপত্তা বলি দিয়ে দেয়া হলো। পাকিস্তানের সাথে নিরাপত্তা প্রশ্নে আদান-প্রদান বাংলাদেশের মানুষের নিরাপত্তাকে জোরদার করবে। একই সাথে এ অঞ্চলে ভারতের আধিপত্য বিস্তারের অপচেষ্টা বাধার মুখে পড়বে। দেশ দু’টির মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতা বাংলাদেশের নড়বড়ে নিরাপত্তা অবস্থাকে সংহত করবে; পাকিস্তানও এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় তার কোণঠাসা অবস্থা থেকে বেরিয়ে ভারতের একচেটিয়া অবস্থার অবসান ঘটাতে পারবে।
পাকিস্তানকে চেপে ধরার নীতিতে ভারতের অন্যতম কৌশল হচ্ছে— দেশটিকে সন্ত্রাসবাদী বলে দাগিয়ে দেয়া। এটি তাদের এমন নীতি তারা উঠতে-বসতে পকিস্তানকে সন্ত্রাসের লালনকারী হিসেবে গালি দেয়। সম্প্রতি দিল্লিতে বাংলাদেশী সাংবাদিকদের সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রকের এক বৈঠকে অপ্রাসঙ্গিক পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ টেনে আনা হয়েছে। ভারতের মুখপাত্র বলেন, ‘একটি দেশ এ অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটানোয় সার্ক স্থবির হয়ে পড়েছে।’ আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা-সার্ক দাঁড়াতে পরেনি ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার কারণে। ব্যাপারটি সবার জানা। এর জন্য বরং ইসলামাবাদের চেয়ে দায় ঢের বেশি নয়াদিল্লির। ভারত চায়নি দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলোর দেশের সমান মর্যাদার ভিত্তিতে এ অঞ্চল এগিয়ে যাক। মূলত সে কারণেই পেছন থেকে সার্ককে টেনে ধরা হয়েছে। বার বার চক্রান্ত করে সার্কের কার্যক্রমকে থামিয়ে দেয়া হয়েছে।
সন্ত্রাসের যেই অভিযোগ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আনা হচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার সবচেয়ে বড় শিকার পাকিস্তান নিজেই। ২০২৫ সালে পাকিস্তান ৬৯৯টি সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে। সম্ভবত এটি বিশ্বের সর্বাধিক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ ওই সব হামলায় সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান নিশানা করা হয়েছে। তেহরিক-ই-তালিবান টিটিপি এর পুরোভাগে রয়েছে। আফগানিস্তানকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী সংগঠন হলেও এর মূল পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে ভারত। এ তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ হয়ে গেছে। এ সময়ে ভারতে উল্লেখযোগ্য কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেনি। ব্যতিক্রম জম্মু-কাশ্মিরের পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলা ঘটনা। তাতে ২৬ পর্যটক প্রাণ হারায়।
এই সন্ত্রাসী হামলাকে ভারত নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। ঘটনার পরপরই এর দায় পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। ওই হামলার ১৫ দিন পর অপারেশন সিঁদুর নামে পাকিস্তানে হামলা চালায়। পহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় কারা জড়িত, সেই ব্যাপারে স্বচ্ছ তদন্ত করতে পারেনি নয়াদিল্লি। এর দায় একচেটিয়া পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেয়। এ ব্যাপারে ভারতীয় বয়ান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গ্রহণ করেনি। এটি ভারতকে অত্যন্ত হতাশা করেছে। একই ধরনের প্রোপাগান্ডা চালিয়ে তারা আগে সফল হয়েছিল। ওই হামলা করে তারা পাকিস্তানের কাছে পরাজয়ের পাশাপাশি বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে তাদের সন্ত্রাসের বয়ানের কার্যকারিতা পুরোপুরি হারায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোকে এ অঞ্চলের সন্ত্রাসের যে বিস্তার তা ভারতীয় বয়ানকে শুধু ভুল প্রমাণ করেনি; এটি যে দেশটি একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করছে— তাও প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ওপর তাদের একই ধরনের টুল ছিল জঙ্গিবাদের। এ প্রচারণায়ও তারা ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। এ বিষয়েও এখন সবার কাছে পরিষ্কার— এগুলো এ অঞ্চলে ভারতের হেজিমনি প্রতিষ্ঠার কূটকৌশল।
অপারেশন সিঁদুর চালিয়ে পাকিস্তানকে দমাতে গিয়ে উল্টো দেশটির জন্য সম্ভাবনার এক দরজা খুলে দিয়েছে ভারত। এতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্তি ক্ষমতা পারদর্শিতা বিশ্বসম্প্রদায়ের দৃষ্টি কেড়েছে। সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে তার ফিল্ড মার্শাল উপাধি দিয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আমন্ত্রিত হয়ে ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছেন। ইসলামাবাদের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের প্রজ্ঞা বিশ্বব্যাপী প্রচার হয় অপারেশন সিঁদুরের পর। দেশটির বৈশ্বিক ভাবমর্যাদা এক লাফে অনেক ওপরে ওঠে। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে তাদের আস্থা বেড়ে যায়। আমেরিকা-ইরান দ্বন্দ্বে সেই কারণে তারা মুখ্য মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এ ধরনের ঘোরতর দুটো শত্রু দেশের ওপর একসাথে বিশ্বাস অর্জন দুর্লভ। এটি এমন একসময় ঘটল, যখন আমেরিকা কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশে অবৈধ গোয়েন্দা কার্যক্রম চালানোর জন্য ভারত নিন্দিত হচ্ছে। নিজের দেশের মানুষকে বিদেশে হত্যা এবং বিদেশে গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়ে ভারতীয় নেতৃত্ব দুর্নাম কুড়িয়েছে।
বাংলাদেশে অবৈধ হস্তক্ষেপের বিষয়টিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে পড়েছে। শেখ হাসিনা উপর্যুপরি যখন দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছিল। মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসঙ্ঘসহ গণতান্ত্রিক বিশ্ব যখন এর সমালোচনামুখর, তখন হাসিনা সরকারের মাথায় ছাতা ধরেছে ভারত। একইভাবে পরপর তিনটি নির্বাচন জালিয়াতি করেও হাসিনা পার পেয়ে যায় তার পক্ষে ভারতের শক্ত অবস্থান নেয়ার কারণে। এভাবে দেড় দশক ধরে নয়াদিল্লি বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে জঘন্য অবস্থান নিয়েছিল। জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পালিয়ে হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেয়ার পর নয়াদিল্লির মর্যাদায় আরেক দফা কালিমা লেপন হয়েছে। তার চেয়েও বড় আকারে এটি জাহির হয়ে গেছে, দেশটি ফ্যাসিস্টের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।
চিরশত্রু পাকিস্তানকে পরাস্ত করার সব কৌশল প্রয়োগ করে ভারত ব্যর্থ হয়েছে। বৈশ্বিক পরিসরে উজ্জ্বল পাকিস্তানের বিপরীতে এখন ম্রিয়মাণ ভারত। এ দিকে ছাত্র-জনতা অভূতপূর্ব এক অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ওপর থেকে ভারতের কালো ছায়াকে ছুড়ে ফেলেছে। এ অঞ্চলের খাস তালুকও তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। আঞ্চলিক রাজনীতিতে এটি তাদের বড় পরাজয়। এ অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য বড়দাগে বদলে যাবে। ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু’ এই নীতিতে বাংলাদেশ পাকিস্তানের বন্ধু। ভূরাজনৈতিক কারণে দেশ দু’টি একে অপরের শত্রু হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মাঝখানে অবিশ্বস্ত ভারতকে রেখে দেশ দু’টির কাছাকাছি আসা এক অনিবার্য বাস্তবতা। এখানে পছন্দ-অপছন্দের কোনো বিষয় নেই। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং বিকাশের স্বার্থে সম্পর্ক গভীর হবে; যা এ অঞ্চলে ভারতের অনাহূত দাদাগিরিকে প্রতিহত করবে। বাংলাদেশ, পাকিস্তানের উভয়ের স্বাধীন ইচ্ছায় পথচলা মসৃণ করবে।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত