দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি আবারও এক নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতকেন্দ্রিক আঞ্চলিক ভারসাম্যের ভেতরে আবদ্ধ থাকা বাংলাদেশ এখন ধীরে ধীরে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকে ঝুঁকছে—এমন ধারণা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছে।
আর সেই প্রেক্ষাপটেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফর, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য চীন সফর এবং শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফরের খবর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি, তবুও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে—ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি নীরব প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যদি এই সফর বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি কূটনৈতিক সফর হবে না; বরং দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কৌশলগত মেরুকরণের বার্তা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে সম্ভাব্য আলোচ্য বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য, শিল্প সহযোগিতা, সমুদ্র যোগাযোগ, নিরাপত্তা সমন্বয়ের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ও সামনে এসেছে। ড্রোন প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো যদি আলোচনায় আসে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে আঞ্চলিক রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করতে পারে।
এদিকে একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের আলোচনা এবং পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের ঘোষণা নতুন সমীকরণকে আরও গভীর করেছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নদী, পানি, সীমান্ত, বন্দর এবং নিরাপত্তা—সবকিছুই কৌশলগত বাস্তবতার অংশ।
ঠিক এই সময়েই ভারতের একটি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সেখানে পলাতক পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। বলেছেন, তিনি দ্রুতই “মাথা উঁচু করে” দেশে ফিরবেন। তার এই বক্তব্য নিছক ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চারণ, নাকি এর পেছনে বৃহত্তর কূটনৈতিক বার্তা রয়েছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে ভারত বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য আওয়ামী লীগ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। শেখ হাসিনার সরকারের সময় ভারত নিরাপত্তা, ট্রানজিট, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সংযোগে ব্যাপক সুবিধা পেয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারত পুরোপুরি নির্লিপ্ত থাকবে—এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন।
বরং প্রশ্ন উঠছে—এই মুহূর্তে শেখ হাসিনার এমন প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা কি শুধুই তাঁর রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস, নাকি এটি ভারতের পক্ষ থেকেও একটি কৌশলগত সংকেত? কারণ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত বাংলাদেশকে শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে দেখে না; বরং এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা, বঙ্গোপসাগরীয় কৌশল এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া জোরদার, অনুমতি ছাড়া গরু জবাই নিষিদ্ধ করার মতো সিদ্ধান্তগুলো শুধুই প্রশাসনিক নয়; বরং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মেরুকরণের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ ধর্মীয় উত্তেজনা ও পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এদিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যে আরটিএ (RTA) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটি নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এই চুক্তি নিছক অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়; বরং এটি বৃহত্তর কৌশলগত হিসাবের অংশ। কারণ বর্তমানে বঙ্গোপসাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত—সবাই এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব নিশ্চিত করতে চাইছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর, বঙ্গোপসাগরীয় প্রবেশাধিকার এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগের কারণে বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ভবিষ্যৎ ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নিরাপত্তা চুক্তি, বাণিজ্যিক সমঝোতা কিংবা কৌশলগত অংশীদারিত্ব—সবকিছুই এখন বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ভেতরে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে চীন বাংলাদেশকে তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আগেই রয়েছে। এখন যদি বাংলাদেশও নতুনভাবে ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের আরও কাছাকাছি যায়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলেও মনে করেন কেউ কেউ।
একদিকে ভারত তার প্রভাব ধরে রাখতে চাইবে, অন্যদিকে চীন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে চাইবে, পাকিস্তান ভারতের প্রভাবকে ভারসাম্য করতে বাংলাদেশকে কাছে টানবে, আর যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করবে।
অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি এই বাস্তবতাকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে?
কারণ ইতিহাস বলছে, ভৌগোলিক অবস্থান যেমন আশীর্বাদ হতে পারে, তেমনি ভুল কূটনীতির কারণে সেটি অভিশাপেও পরিণত হতে পারে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ভেতরে পড়ে অনেক রাষ্ট্র নিজেদের স্বাধীন কৌশলগত অবস্থান হারিয়েছে। এ ধরনের বহু দৃষ্টান্ত আছে।
বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা। আবেগ, দলীয় স্বার্থ কিংবা সাময়িক রাজনৈতিক লাভের ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
তাই,বাংলাদেশকে বুঝতে হবে, কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কখনোই টেকসই নয়। বরং বহুমাত্রিক সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে সবচেয়ে পরিণত কৌশল।
পরিশেষে বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র বদলাচ্ছে। পুরনো জোট দুর্বল হচ্ছে, নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ধর্ম, সীমান্ত, বন্দর, পানি, প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য—সবকিছু এখন ভূরাজনীতির অংশ। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। এখন দেখার বিষয়—বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কতটা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারে, কতটা ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে এবং কতটা দৃঢ়ভাবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। কারণ আগামী দিনের বাংলাদেশকে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়; বরং বৈশ্বিক শক্তির নতুন মেরুকরণও গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। সুতরাং কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করাই হচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক:সাংবাদিক,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]