ক্যাফেইন বা কফি আজকের ব্যস্ত জীবনে যেন এক ধরনের নীরব শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের শুরুতে ঘুম কাটাতে, অফিসের দীর্ঘ সময় কাজ করতে কিংবা রাত জেগে কোনো জরুরি কাজ শেষ করতে অসংখ্য মানুষ কফি, শক্তিশালী চা বা এনার্জি ড্রিংকের ওপর নির্ভর করেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মনোযোগ ও মানসিক সতর্কতা শুধু উদ্দীপক পানীয়ের ওপর নির্ভর করে না। বরং মস্তিষ্ক কতটা বিশ্রাম পাচ্ছে, শরীর কতটা সুস্থ আছে এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন কতটা সুষম—এসব বিষয়ই দীর্ঘমেয়াদে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।

অনেকেই অনুভব করেন যে, ক্যাফেইন দ্রুত শক্তি ও সতর্কতা এনে দিলেও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কিছু সময় পর আবার ক্লান্তি ফিরে আসে। কারও কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্যাফেইন অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া কিংবা ঘুমের সমস্যা তৈরি করতে পারে।

এমনকি দিনের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ শক্তি কমে যাওয়ার অনুভূতিও দেখা দেয়। এ কারণেই বর্তমানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মানুষকে এমন কিছু প্রাকৃতিক অভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহিত করছেন, যা শরীর ও মস্তিষ্ককে স্বাভাবিকভাবে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে এবং উদ্দীপক পানীয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ মনোযোগের জন্য সবসময় কফির কাপের প্রয়োজন হয় না। বরং সাধারণ কিছু দৈনন্দিন অভ্যাস—যেমন ভালো ঘুম, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত শরীরচর্চা, সূর্যের আলোতে সময় কাটানো এবং নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাস—প্রাকৃতিকভাবেই মস্তিষ্ককে আরও সতেজ ও মনোযোগী রাখতে সাহায্য করতে পারে।

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্যে খেজুর কতটা সহায়ক

হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্যে খেজুর কতটা সহায়ক

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ছোট ছোট অভ্যাস মানুষের জ্ঞানীয় দক্ষতা, স্মৃতিশক্তি এবং মানসিক স্থিরতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথের প্রকাশিত গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব মানুষের মানসিক কর্মক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। ঘুম কম হলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়, প্রতিক্রিয়া দেওয়ার গতি ধীর হয়ে পড়ে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

একইভাবে অল্প পরিমাণ পানিশূন্যতাও মানুষের মেজাজ, স্মৃতিশক্তি এবং মনোযোগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মনোযোগ বাড়ানোর জন্য সবসময় বড় ধরনের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের দরকার হয় না। বরং ছোট কিন্তু নিয়মিত কিছু অভ্যাস ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করতে পারে।

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার মতো সহজ অভ্যাসও শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়িকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে শরীর সহজে বুঝতে পারে কখন বিশ্রাম নেওয়া দরকার এবং কখন সতর্ক ও সক্রিয় থাকতে হবে।

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

জেনে নিন বৃষ্টিতে ভিজলে কীভাবে জ্বর-সর্দি-কাশি এড়াবেন

জেনে নিন বৃষ্টিতে ভিজলে কীভাবে জ্বর-সর্দি-কাশি এড়াবেন

ঘুমকে এখনও বিশেষজ্ঞরা মস্তিষ্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করেন। অনেক মানুষ উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর নানা কৌশল খুঁজলেও পর্যাপ্ত ঘুমের গুরুত্বকে অবহেলা করেন। অথচ বিশ্রামপ্রাপ্ত মস্তিষ্ক তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারে, দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম হয় এবং নতুন তথ্য সহজে মনে রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুমের সময় মস্তিষ্ক শুধু বিশ্রাম নেয় না, বরং দিনের বিভিন্ন তথ্যকে সংগঠিত করে, স্মৃতি গুছিয়ে রাখে এবং মানসিক ক্লান্তি দূর করে। যখন ঘুম অনিয়মিত হয়ে যায়, তখন মানুষ ধীরে ধীরে মনোযোগ হারাতে শুরু করে। ছোটখাটো ভুল বেড়ে যায়, কাজ সম্পন্ন করতে বেশি সময় লাগে এবং দিনের শুরুতেই ক্লান্তি অনুভূত হয়।

বিশেষজ্ঞরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা বলেন, যা অনেক সময় মানুষ গুরুত্ব দেয় না—সকালের সূর্যের আলো। ঘুম থেকে ওঠার পর কিছু সময় প্রাকৃতিক আলোতে থাকলে শরীরের জৈবিক ঘড়ি আরও ভালোভাবে কাজ করে। এটি রাতে ভালো ঘুম নিশ্চিত করতে সাহায্য করে এবং দিনের বেলায় সতর্কতা বাড়ায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা সূর্যের আলোতে সময় কাটানো মনোযোগ ও মানসিক স্বচ্ছতার জন্য উপকারী হতে পারে।

ডাক্তারদের মতে, নিয়মিত ঘুম, পর্যাপ্ত পানি পান, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, ছোট ছোট বিরতি নেওয়া এবং মনোযোগ নষ্ট করে এমন বিষয় কমিয়ে আনা—এসব অভ্যাস স্বাভাবিকভাবেই একাগ্রতা বাড়াতে সাহায্য করে।

শরীর সচল থাকলে মস্তিষ্কও আরও কার্যকরভাবে কাজ করে। সাধারণভাবে অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে থাকলেই বেশি মনোযোগ দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে শরীরের নড়াচড়া মস্তিষ্ককে আরও সক্রিয় করে তোলে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, হাঁটা, স্ট্রেচিং বা হালকা ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, যার ফলে মস্তিষ্কে বেশি অক্সিজেন পৌঁছায় এবং মানসিক সতর্কতা বৃদ্ধি পায়।

ব্যায়াম শরীরে এন্ডোরফিন নামের হরমোন নিঃসরণ করে, যা মানুষের মেজাজ ভালো রাখতে সাহায্য করে।

ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন-এর গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত পরিমিত ব্যায়াম স্মৃতিশক্তি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং মনোযোগ উন্নত করতে সহায়ক। এমনকি কাজের মাঝখানে অল্প সময় হাঁটা বা হালকা স্ট্রেচিংও মানসিক ক্লান্তি কমাতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, দীর্ঘ সময় একটানা কাজ করা সবসময় উৎপাদনশীলতার লক্ষণ নয়। মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবে নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। তাই কাজের মাঝখানে ছোট ছোট বিরতি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকেই বর্তমানে পোমোডোরো টেকনিক অনুসরণ করেন, যেখানে সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ মিনিট মনোযোগ দিয়ে কাজ করার পর কয়েক মিনিটের বিরতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এই পদ্ধতি মস্তিষ্কের অতিরিক্ত চাপ কমায় এবং দীর্ঘ সময় কাজ করার পরও মানসিক সতেজতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews