খনিজ সম্পদ আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য অন্যতম একটি নিয়ামত। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের জন্য অসংখ্য নিয়ামত সৃষ্টি করেছেন। তিনি করুণাময়, অসীম দয়ালু ও ক্ষমাশীল। পবিত্র কোরআনের সুরা নাহলের ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যদি আল্লাহর নিয়ামত গণনা কর, শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।’ খনিজ সম্পদ ব্যবহার ছাড়া আমাদের জীবন পরিচালনা অসম্ভব। এজন্যই খনিজ সম্পদ আল্লাহর পক্ষ থকে বড় নিয়ামত। মহান আল্লাহ খনিজ সম্পদের মতো নিয়ামতসহ সব নিয়ামতই মানুষের জীবন ধারণ ও উপকারের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। এ বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তা সবই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৯)।’
খনিজ সম্পদের মধ্যে অন্যতম হলো তেল, গ্যাস, কয়লা, সিসা, তামা, স্বর্ণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য ও আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয়। আমাদের দেশে খনিজ সম্পদ চাহিদা অনুযায়ী তুলনামূলক খুবই কম ও উত্তোলনে বেশ ব্যয়বহুল হওয়ায় অন্য দেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। খনিজ সম্পদ দেশের মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে আমদানি করে থাকে। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মতো খনিজ সম্পদ আমদানি করতে গিয়ে পথে সমস্যা দেখা দিলে কিংবা একটু সংকটের সংবাদ পেলেই না পাওয়ার ভয়ে আমরা অতিরিক্ত ক্রয় করে আরও সংকট তৈরি করে থাকি। সেই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী স্বার্থ হাসিলের চেষ্টায় ব্যস্ত থাকেন। তারা অতিরিক্ত লাভের আশায় সিন্ডিকেট তৈরি করে সেই খনিজ সম্পদ যেমন তেল, গ্যাস, মজুত করে পরবর্তী সময়ে বেশি দামে দেশের মানুষের কাছেই বিক্রি করেন। সংকটের মুহূর্তে মজুত করে আরও সংকট তৈরি করে বেশি দামে বিক্রি করা কোনো ইমানদারের পক্ষে সম্ভব নয়। যারা মজুত করবে নিঃসন্দেহে তারাও অভিশপ্ত ব্যক্তি। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমদানি পণ্য সরবরাহকারী ব্যবসায়ী রিজিকপ্রাপ্ত হয় এবং মজুতদার অভিশপ্ত (ইবনে মাজাহ)।’
খনিজ সম্পদের সংকটময় সময়েই আমরা বুঝতে পারি আমাদের এই জনজীবনে এর কতটা প্রয়োজন। গ্যাস জ্বালানি তেলের মতো খনিজ সম্পদের সংকটে বাসাবাড়িতে রান্নায় কষ্ট, বিদ্যুতের লোডশেডিং, মিলকারখানা বন্ধ, হাসপাতেলের সেবা ব্যাহত, পরিবহনব্যবস্থা অচল হয়ে যায়। মুহূর্তেই থুবড়ে পড়ে দেশের অর্থনীতির চাকা। সংকটময় সময়ে তেল-গ্যাস ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। আয় বুঝে ব্যয় করতে হবে। টাকা দিয়েই কিনব আবার ব্যবহার নিজের ইচ্ছামতোই করব, এমনটি ভাবা মোটেই উচিত নয়। সম্পদ থাকলেই অহংকারী হয়ে নিজের মতো করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা অহংকারই পতনের মূল। সম্পদ ব্যয়ে সচেতনতা অবলম্বন না করলেই নিঃস্ব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিমিত ব্যয়ে কখনোই নিঃস্ব করে না। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেছেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পরিমিত ব্যয় করে সে নিঃস্ব হয় না (মুসনাদে আহমাদ শরীফ)।’
খনিজ সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই দেশের প্রত্যেক নাগরিক সফলতা বয়ে আনবে। আমরা দেখেছি, যে দেশে খনিজ সম্পদ বেশি সেই দেশ ততই উন্নত। একজন দেশপ্রেমিক কখনোই খনিজ সম্পদ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার করে না। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। আমি চাকরি করি, বিল দিলে মালিক কিংবা সরকার দেবে তাই তেল-গ্যাস যেভাবে খুশি সেভাবে ব্যবহার করব, এ ধরনের মানসিকতা দূর করতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি পৃথিবীর সবকিছু পৃথিবীর জন্য শোভা করেছি, এতে লোকদের পরীক্ষা করি, তাদের মধ্যে কে ভালো কাজ করে (সুরা কাহাফ : ০৭)।’
খনিজ সম্পদ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহারের হিসাবও কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহর দরবারে দিতে হবে। এজন্য রুমে কেউ নেই তবু ফ্যান কিংবা এসি ব্যবহার, বাইরে সৌন্দর্যের জন্য হরেকরকমের অতরিক্ত বাতি জ্বালানো, যানবাহনে প্রয়োজন ছাড়া চলাচল করাসহ সব ক্ষেত্রে অপচয় বন্ধ করে অর্থনৈতিক অপচয় রোধ করতে হবে। অর্থনৈতিকসহ সব ধরনের অপচয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। অপচয়-অপব্যয় আল্লাহও নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা আহার কর ও পান কর, কিন্তু অপচয় করবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না (সুরা আরাফ, আয়াত ৩১)।’
দুনিয়া ও আখেরাতে শান্তি কামনার জন্য অবশ্যই কৃপণতা ও অপচয় দূর করে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে হবে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তারা যখন ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না। বরং মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে (সুরা ফুরকান, আয়াত ৬৭)।’
♦ লেখক : গবেষক : আল ফুরকান রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা