আজকের কলামের শুরুতেই আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে। তার নেতৃত্বে পরিচালিত সরকার, বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শেখ হাসিনার দিল্লিতে অনুষ্ঠিত লাইভ প্রেস কনফারেন্সের ওপরে যে বিবৃতি দিয়েছে তার জন্য ধন্যবাদ জানাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং তার মন্ত্রণালয়কে। কথায় আছে, যেমন কুকুর, তেমন মুগুর। ১৬টি বছর ধরে ভারত বাংলাদেশে পেয়েছিলো হাসিনার ‘জি হুজুর’ সরকার। চাকর-নফরের ওপর মনিবরা যে আচরণ করে সেই আচরণ ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট পর্যন্ত দিল্লি আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর করেছে। কিন্তু এবার তারা দাঁত ভাঙা জবাব পেয়েছে। এমন কঠোর ভাষা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাম্প্রতিককালে আমি দেখিনি। কোনো কোনো আঁতেল ভ্রুকুঞ্চন এবং নাসিকাকুঞ্চন করে বলতে চেয়েছেন যে, বিবৃতিটা নাকি Diplomatic Niceties বা কূটনৈতিক ভাষা ছাড়িয়ে গেছে।

ভারতীয়রা কূটনীতির ক্ষেত্রে চানক্য বা কৌটিল্যকে গুরু বলে মানে। তার জন্ম হয়েছিলো ৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। আর ম্যাকিয়াভেলির জন্ম হয়েছিলো ১৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে। অর্থাৎ নিকোলা ম্যাকিয়াভেলি চানক্যের ১৮১৯ বছর পরে জন্ম নিয়েছিলেন। বুড়ো হলে নাকি মানুষ সেকেলে হয়ে যায়। তেমনি চানক্য ম্যাকিয়াভেলির ১৮১৯ বছর আগে জন্ম নিয়েছিলেন। দুই জনই কুবুদ্ধি এবং কুমন্ত্রণার জন্য বহুল পরিচিত। চানক্যের আরেক নাম কৌটিল্য। তার যে গ্রন্থটি শাসক গোষ্ঠিকে কুমন্ত্রণা দেওয়ার জন্য কুখ্যাত হয়েছে তার নাম, ‘অর্থশ^াস্ত্র’। আর ম্যাকিয়াভেলির যে গ্রন্থটি একই কারণে পরিচিতি পেয়েছে তার নাম, ‘দি প্রিন্স’।

ভারতের রাষ্ট্র নায়ক বা হালের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর বুদ্ধিকে বলা হয় চানক্য বুদ্ধি। এই সূক্ষ্ম বুদ্ধির জন্য তারা নাকি অন্য দেশের পলিটিশিয়ানকে টেক্কা মেরে থাকেন। কিন্তু এবার ভারতের ঐ চানক্য বুদ্ধি বাংলাদেশের সোজা-সরল বুদ্ধির কাছে চরম মার খেয়েছে। তাই বাংলাদেশের ঐ Hard hitting বিবৃতির পর ভারতকে লেজ গুটিয়ে পালাতে হয়েছে। গত ৮ অগাস্ট শনিবার ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রনধীর জয়সওয়াল বলেছেন যে, প্রেস কনফারেন্সে হাসিনা যা বলেছেন সেটিকে ভারত সমর্থন করে না। তো সমর্থন যদি নাই করেন তাহলে তাকে প্রেস কনফারেন্স করতে দিলেন কেনো? এখন আপনারা (ভারত) যতোই গাঁই গুঁই করেন না কেনো, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা বর্তমান সরকারের ঐ বিবৃতি ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্কের মাঝে একটি লাল রেখা বা রেড লাইন টেনে দিয়েছে। আসুন, বিষয়টা একটু খোলাসা করা যাক।

সকলেই জানেন যে, কিছুদিন পূর্বে ভারতে পালিয়ে থাকা শেখ হাসিনা ভারতের মাটিতে বসে ঘোষণা করেছিলেন যে, ৫ আগস্ট তিনি প্রেস কনফারেন্স করে জানাবেন যে, কবে তিনি বাংলাদেশে আসছেন। এর আগে তিনি বলেন যে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি সদলবলে বাংলাদেশে প্রবেশ করবেন। তার এই বাংলাদেশে প্রবেশের ঘোষণাকে বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণ তেমন পাত্তা দেয়নি। কিন্তু দেখা গেলো, ভারতের মেইন স্ট্রিম গণমাধ্যমগুলো শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে প্রবেশের ঘোষণা নিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছে।
পাঠক, খেয়াল করুন, ৫ আগস্ট বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় দিন। ২০২৪ সালের এই দিনে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। হাসিনা জনতার ঢলকে গুলি করে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাঁধ সাধলো সেনাবাহিনী। ৩ আগস্ট সর্ব শ্রেণির সেনা সমাবেশে জুনিয়র অফিসার থেকে সিনিয়র অফিসাররা পর্যন্ত সাফ জানিয়ে দেন যে, তারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য নিরস্ত্র জনতার বুকে গুলি চালাবেন না। ৩ আগস্টেই আসলে শেখ হাসিনার তখতে তাউসের মৃত্যু ঘণ্টা বেজে যায়। জনগণের কাছে এমন একটি পবিত্র দিনকে কলুষিত করার জন্যই শেখ হাসিনা ঐ রকম ঘোষণা দিয়েছিলেন।

॥দুই॥
বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারকে অনুরোধ করেছিলেন, শেখ হাসিনাকে এমন কাজ করা থেকে ভারত সরকার যেনো তাকে নিবৃত্ত করে। কারণ, শেখ হাসিনা জনরোষের ভয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন এবং বাংলাদেশের আইন মাফিক গঠিত আদালত তাকে গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদ- দিয়েছেন। এমন একজন ব্যক্তিকে ভারতের উচিত, প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী দ্রুত বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়া। উত্তরে ভারত সেই চানক্য বুদ্ধি খাটায়। বলে, ভারতে বাক স্বাধীনতা আছে। হাসিনার ঐ প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন হলো বেসরকারি পর্যায়ে। এখানে সরকারের কোনো হাত নাই।

ভারতের এই ধরনের ছেলে ভুলানো কূটনীতির দিন অনেক আগেই শেষ হয়েছে। বাংলাদেশে তো অনুপচেটিয়া প্রায় ১৭ বছর ছিলেন। তিনি তো এই সুদীর্ঘ সময়ে রাজনীতি নিয়ে একটি কথাও বলেননি। তার পরেও ভারত বারবার বলতো, বাংলাদেশের মাটি যেনো কোনো প্রকার ভারত বিরোধী কাজে ব্যবহৃত না হয়। সেই কথাটিই ভারতকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের মাটিতে বসে শুধু শেখ হাসিনা নন, তার কয়েক হাজার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে তিনি বাংলাদেশ তথা বাংলদেশের জনগণের বিরুদ্ধে রাজনীতি করা শুরু করেছেন। যে মহিলা ভারতের আশ্রিতা, তিনি ভারতের পারমিশন ছাড়া কি ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পলিটিক্স করতে পারেন?

বাংলাদেশের অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত সরকার হাসিনাকে প্রেস কনফারেন্স করার অনুমতি দেয়। বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে বলেছে যে, শেখ হাসিনার বক্তব্য যেনো প্রচার করা না হয়। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ঐ প্রেস কনফারেন্সের পুরো ভিডিও ক্লিপ আমাদের হাতে থাকা সত্ত্বেও আমরা এব্যাপারে কোনো কথা বলা থেকে বিরত থাকছি। তবে এটুকু না বললেই নয় যে, শেখ হাসিনা জুলাইয়ের এই ঐতিহাসিক বিপ্লবকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলেছেন। এটা তিনি বিগত দু’ বছর থেকেই ভারতের মাটিতে বসে বলে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ সরকারকে উপেক্ষা করে ভারত হাসিনাকে প্রেস কনফারেন্স করার অনুমতি দানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে বিবৃতি দিয়েছে সেটিকে এক কথায় বলা যেতে পারে দুঃসাহসিক। এই বিবৃতির কিছু অংশ আমি নিচে ইংরেজিতে উদ্ধৃত করছি। সাথে বাংলা অনুবাদও দিচ্ছি। ইংরেজি পড়লে বোঝা যাবে, কত কঠোর ছিলো তার ভাষা।

॥তিন॥
বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, হাসিনার এই প্রেস কনফারেন্স যে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে সে সম্পর্কে সরকার আগেই ভারত সরকারকে জানিয়েছিলো। তদ্বসত্ত্বেও ভারত সরকার ওই প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, Bangladesh
is outraged that the absconding convicted genocider Sheikh Hasina was allowed this evening to engage in live interaction with the media in New Delhi where she and her henchmen launched venomous vitriol against the State of Bangladesh and her people. অনুবাদ: বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ যে পলাতক দ্ব-প্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই তথাকথিত প্রেস কনফারেন্সে হাসিনা এবং তার অনুসারীরা বাংলাদেশ এবং তার জনগণের বিরুদ্ধে বিষ বাষ্প উদগীরণ করেছেন।

এবারই সর্ব প্রথম ৫ আগস্টকে সরকারিভাবে ‘জুলাই বিপ্লব’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, On a day when the people of
Bangladesh are observing the second anniversary of the July Revolution, this interaction by Sheikh Hasina on the Indian soil stands as an affront to the sovereignty of Bangladesh and a grievous insult to the martyrs of the July Revolution.
অনুবাদ: যেদিন বাংলাদেশের মানুষ জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছেন, সেদিন ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনার এই ইনটারেকশন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি মারাত্মক অবমাননা।
বিবৃতিতে শেখ হাসিনাকে বলা হয়েছে, absconding convicted mass murderer Hasina and her criminal cohort to reverse the tide of history. অর্থাৎ শেখ হাসিনা হলেন একজন শাস্তি প্রাপ্ত পলাতক গণহত্যাকারী। তিনি এবং তার ক্রিমিনাল সাংগাতরা ইতিহাসের গতিকে উল্টা দিকে ফেরাতে চায়।

এর পরের প্যারাগ্রাফে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, Upholding the spirit of the July Revolution, our people have firmly resolved that our nation will never again go back to the dark days of fascism and that Bangladesh will never be a client State. Convicted mass murderer Hasina and her mafia enterprise will never have a place in the polity of Bangladesh.
অনুবাদ: জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে সমুন্নত করে আমাদের জনগণ কঠিন সংকল্প গ্রহণ করেছেন যে, আমাদের জাতি আর কোনো দিন ফ্যাসিবাদের অন্ধকার দিনগুলিতে ফিরে যাবেন না এবং বাংলাদেশ আর কোনো দিন একটি তাবেদার রাষ্ট্র হবে না। দ্ব-প্রাপ্ত গণহত্যাকারী হাসিনা এবং তার মাফিয়া সংগঠন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর কোনো দিন ঠাঁই পাবে না।

বিবৃতির এক অংশে বলা হয়েছে, allowing her the opportunity to openly interact with the media under any pretext is deeply hurtful to our people’s sentiment and detrimental to the development of harmonious bilateral relations between Bangladesh and India.
অনুবাদ: যে কোনো অজুহাতেই হোক না কেনো, গণমাধ্যমের সাথে তাকে কথা বলতে দেওয়া আমাদের জনগণের অনুভূতির প্রতি বিরাট আঘাত এবং বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রতিও ক্ষতিকর।

ভারত তারেক রহমান সরকার সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করছিলো এবং ভুল হিসাব করেছিলো। অবশ্য তাদের এমন ভ্রান্ত ধারণার অবসান দু’ বছর আগেই হওয়া উচিত ছিলো। তারা ভুলে গেছে যে, জুলাই বিপ্লবের অন্যতম গগন বিদারী স্লোগান ছিলো, ‘দিল্লি না ঢাকা/ ঢাকা ঢাকা’। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার হাসিনার ১৫ বছর ৭ মাসের তাবেদারি শাসনের পর সর্ব প্রথম ভারতের চোখে চোখ রেখে কথা বলেছিলেন।
ভারত যদি মনে করে থাকে যে, সার্জিও গোরদের মতো মার্কিন কূটনীতিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে নতজানু করতে পারবে তাহলে তারা মারাত্মক ভুল করছে। এদেশের ১৮ কোটি মানুষ আর যাই করুক, ভারতীয় প্রভুত্ব আর মেনে নেবে না। তারেক রহমানের সরকার একটি নির্বাচিত সরকার। তারা জনগণের অনুক্ত অনুভূতি শুনতে পেয়েছেন। সুতরাং তারাও জনগণের ইচ্ছে অনুযায়ীই এগিয়ে চলেছেন।

Email: [email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews