ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুজেস্তান প্রদেশের দারখোভিনে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান। ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (এইওআই) এ হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে থাকা একটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সংস্থাটি জানায়, ২০২২ সালে শুরু হওয়া দারখোভিন প্রকল্পে হামলার ঘটনায় তারা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
এদিকে জর্ডানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত এবং একজন নিখোঁজ হওয়ার পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বিমান হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শনিবার সন্ধ্যায় নতুন এ হামলা শুরু হয়। সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের হুমকি কমানো এবং জর্ডানে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার জন্য দায়ী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কে শাস্তি দিতেই এ অভিযান চালানো হচ্ছে। সেন্টকম আরো জানায়, হামলায় আহত চার মার্কিন সেনাকে জর্ডানের হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে এবং তারা আবার দায়িত্বে ফিরেছেন। নিহত দুই সেনার পরিচয় তাদের পরিবারের সদস্যদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো না হওয়া পর্যন্ত প্রকাশ করা হবে না।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিহত সেনাদের প্রতি শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। তারা দেশের সেবায় জীবন দিয়েছেন’।
যুক্তরাষ্ট্রকে এমন শিক্ষা দেয়া হবে, যা ভুলবে না : মোজতবা
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘চুক্তির ক্ষেত্রে মহাশয়তান বারবার অঙ্গীকার ভঙ্গ করে আবারও সবার কাছে প্রমাণ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর এখন সম্পূর্ণ মূল্যহীন ও অবৈধ। আর জুলুম, আধিপত্যবাদ ও বর্বরতা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস ও নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হুঁশিয়ার করে বলেছেন, তেহরান ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের হাতে যুক্তরাষ্ট্র এমন শিক্ষা পাবে, যা তারা কখনো ভুলতে পারবে না। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মোজতবা খামেনির নামে একটি লিখিত বিবৃতি পাঠ করা হয়। সেখানে সর্বোচ্চ নেতা বলেন, গত মাসের সমঝোতা স্মারক যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে লংঘন করেছে, তা প্রমাণ করে যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর ‘সম্পূর্ণ মূল্যহীন ও অবৈধ’। বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘চুক্তির ক্ষেত্রে মহাশয়তান বারবার অঙ্গীকার ভঙ্গ করে আবারও সবার কাছে প্রমাণ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর এখন সম্পূর্ণ মূল্যহীন ও অবৈধ। আর জুলুম, আধিপত্যবাদ ও বর্বরতা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস ও নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।’
মোজতবা খামেনি লিখিত ওই বিবৃতিতে হুঁশিয়ার করে আরো বলেন, ‘এখন যখন মার্কিন শত্রু যুদ্ধ উসকে দিতে চাইছে এবং আরও বড় মূল্য ও অপমানের মুখোমুখি হতে চলেছে, তখন তাদের জানা উচিত যে প্রিয় ইরানি জাতি ও প্রতিরোধ ফ্রন্ট তাদের জন্য এমন শিক্ষা প্রস্তুত রেখেছে, যা তারা কখনো ভুলতে পারবে না।’ যুক্তরাষ্ট্র এ সপ্তাহে ইরানের ওপর তাদের আক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করেছে। তারা ইরানের সেতু, রেলপথ, সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণ কারখানাসহ বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে। জবাবে বাহরাইন, কাতার, কুয়েতসহ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকা প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোয় হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছে তেহরান। সেই সঙ্গে তেহরান ভারত মহাসাগরের উত্তরে অবস্থানরত একটি মার্কিন জাহাজে হামলার দাবি করেছে। বাহরাইনে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে আবারও ড্রোন হামলার দাবি ইরানের
বাহরাইনে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে আবারও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। দেশটির সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার জবাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের দাবি, হামলায় বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তবে হামলায় ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। স্বাধীনভাবেও হামলার দাবি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা ও উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
অষ্টম দিনে ইরানে একের পর এক বিস্ফোরণ
ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত দ্বীপ ও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে লক্ষ্যবস্তু করে টানা অষ্টম দিনের মতো ভয়াবহ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের এই জোরালো আক্রমণের ফলে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলসহ বিভিন্ন স্থানে একের পর এক বিকট বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বারে অবস্থিত ইরানের বৃহত্তম দ্বীপ কেশমের উপকূলবর্তী বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ছয়টি শক্তিশালী মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় সময় ভোর ৩টা ৩৮ মিনিটের দিকে কেশম দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দ্বীপের বেশ কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় এই হামলা চালানো হয়েছে। তবে দ্বীপে অবস্থানরত নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের পরিমাণ সম্পর্কেও কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
এর আগে ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রধান বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের বিভিন্ন অংশে গভীর রাতে বেশ কয়েকটি তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বিস্ফোরণের পর স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছেন। তবে প্রাদেশিক কর্মকর্তাদের বরাতে তাসনিম নিউজ পরে জানায়, বন্দর আব্বাসে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলেও সেখানে সরাসরি কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বা মার্কিন যুদ্ধবিমানের আক্রমণের চূড়ান্ত প্রমাণ তারা এখনো পায়নি।
ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা ইরানের
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ এর আওতায় নিজেদের সব প্রতিশ্রুতি স্থগিত ঘোষণা করেছে ইরান। দুই দেশের চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই শনিবার এ সিদ্ধান্তের কথা জানায় তেহরান। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদি এ ঘোষণা দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া এ সমঝোতার আওতায় থাকা প্রতিশ্রুতিগুলো আর বাস্তবায়ন করবে না তেহরান। গত জুনে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে ১৪ দফার ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ সই হয়। অন্তর্বর্তী এ চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং কয়েক সপ্তাহের সংঘাতের পর ধাপে ধাপে উত্তেজনা কমিয়ে আনা।
এদিকে দুই দেশের সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া নতুন দফার মার্কিন হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের আশ্রয় দেওয়া দেশগুলোকে একই ধরনের পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। গত শুক্রবার রাতে মার্কিন হামলায় ইরানের একটি পানি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বাহরাইনে একাধিকবার বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজানো হয়েছে। কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা তাদের আকাশসীমার দিকে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে। সূত্র : টিআরটি, আল-জাজিরা, ফার্স নিউজ ও ইরনা।