হামের পাশাপাশি এবার মৌসুমি জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। বিশেষ করে ঋতু পরিবর্তনজনিত কারণে ঘরে ঘরে জ্বরের রোগী বাড়ছে। হাম ও ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ জ্বর হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বর মূলত কোনো রোগের প্রাথমিক উপসর্গ। ফলে কেউ জ্বরে আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে। এদিকে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে ২৪ ঘণ্টায় আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মেডিসিন অনুষদের ডিন ও রিউমাটোলজি (বাতরোগ) বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, এখন শিশুর জ্বর হলেই অভিভাবকরা হাম বলে সন্দেহ করছেন। কারণ, হাম শিশুদেরই হয়। বড়দের খুব কম হয়। তিনি বলেন, এখন বড়দের ভাইরাস জ্বর হচ্ছে। পরিবারে একজনের জ্বর হলে অন্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। এটিকে ভাইরাস ফিভার ইনফেকশন বলা যেতে পারে। যে কোনো ধরনের ভাইরাস মিউট্যান্ট (জিনগত বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন) হয়ে যে কেউ যে কোনো সময় জ্বরে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে ভয়ের কারণ নেই। কারও জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া যাবে না। দেশে ইতোমধ্যে ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হলেও মারাত্মক আকারে ছড়ায়নি।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা ২০ বছর বয়সি সুমাইয়ার তিনদিন আগে হঠাৎ কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। জ্বরের সঙ্গে সারা শরীর, মাথা ও চোখ ব্যথা এবং বমি ভাব। শুরুতে গুরুত্ব না দিলেও শারীরিক পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হতে থাকে। বুধবার সকালে স্বজনরা তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসকরা ষষ্ঠতলায় মেডিসিন বিভাগে ৬৩১ নম্বর ওয়ার্ডের ৫১ নম্বর শয্যায় ভর্তি নেন। সুমাইয়ার জ্বর শুরুর পরদিন তার দেড় বছর বয়সি মেয়ে সানজিদা জ্বরে আক্রান্ত হয়। মায়ের সঙ্গে তাকেও হাসপাতালের তৃতীয় তলার ৩১৪ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।
সুমাইয়ার বোন লামিয়া আক্তার বুধবার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, সুমাইয়ার জ্বরকে প্রথমে ডেঙ্গু মনে করেছিলাম। হাসপাতালে নেওয়ার পর জানতে পারি ডেঙ্গু হয়নি। সানজিদার জ্বরকে হামজনিত জ্বর ভেবেছিলাম। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তারও হাম বা ডেঙ্গু নয়, বরং মৌসুমি জ্বর বলেই তাদের ধারণা।
লামিয়া আক্তার আরও বলেন, চিকিৎসকরা সুমাইয়ার জ্বরের কারণ শনাক্তে ১০ ধরনের পরীক্ষা দিয়েছে। এখনো করাতে পারিনি। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে স্যালাইন, নাপা ইঞ্জেকশন, সাপোজিটরি ব্যবহার করা হচ্ছে। সানজিদারও কিছু পরীক্ষা দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চলছে। পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর বোঝা যাবে কী হয়েছে।
এদিকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত হাম ও হামের লক্ষণ নিয়ে আরও সাত শিশু মারা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, তাদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে হামে। বাকিদের হামের উপসর্গ ছিল। এ নিয়ে সারা দেশে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ২৬৮ জন। এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ১২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। ৭৬ জন মারা গেছেন রাজশাহী বিভাগে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে আরও জানা যায়, ২৪ ঘণ্টায় ৩৭৩ জন হামে আক্রান্ত হয়েছেন; এই সময়ে ১ হাজার ২৮১ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন, যাদের মধ্যে ১ হাজার ৫৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ৪৫০ জন ভর্তি হয়েছেন ঢাকার হাসপাতালগুলোয়। আর সবচেয়ে কম ৪ জন ভর্তি হয়েছেন রংপুরে।
রামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গে এক শিশুর মৃত্যু : রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন ১৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। আর ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৩ জন। এখন হাম আইসোলেশন সেন্টারে ১১১ জন রোগী ভর্তি আছেন।